
সাজ্জাদ আকবর
চৌদ্দশ বছরের ইতিহাসে যেসব ভয়াবহ মহামারী মুসলিম সভ্যতাকে বিপর্যস্ত করেছে, তন্মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর মহামারীটি ছিল তাউনে জারিফ। সময়টা ছিল হিজরি ৬৯ সনের। মুসলিম সভ্যতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র বসরা শহর তখন আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. এর শাসনাধীন। অসংখ্য সাহাবি ও তাবেয়ীনের এই শহরে হঠাৎ করেই যেন নিরব কেয়ামত নেমে এসেছিল।
মাত্র চারদিনের মাথায় আক্ষরিক অর্থেই মৃতপুরীতে পরিণত হয়েছিল শহরটি। এ স্বল্প সময়ের মধ্যে ভয়ংকর এক মহামারীতে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় আড়াই লাখ মুসলমান। মাত্র চারদিন স্থায়ী হয়েছিল এ মহামারী। যার প্রথম দিনে প্রাণ হারান প্রায় সত্তর হাজার বসরাবাসী। দ্বিতীয় দিনে মারা যান আরও একাত্তর হাজার। তৃতীয় দিনে সেই সংখ্যার সাথে যোগ হয় আরও তেহাত্তর হাজার। এভাবে চারদিনে পুরো বসরা পরিণত হয় উন্মুক্ত গোরস্থানে।
‘সর্ববিধ্বংসী’ মহামারী
এত অল্প সময়ে এত বিশাল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে ছিল একেবারেই বিরল। ভয়াবহ এই মহামারী বসরা শহরকে এমনই উজাড় করেছিল যে, জুমার দিন নামাজের জন্য সাত জন পুরুষ ও একজন মহিলার বেশি কেউ ছিল না। এমনকি বসরার গভর্নরের মায়ের কাফন দাফনের জন্য কোথাও একজন মহিলা খুঁজে পাওয়া যায় নি। এজন্যই মুসলিম সভ্যতায় ভয়াবহতম এই মহামারী ইতিহাসে ‘তাউনে জারিফ’ নামে পরিচিত। আর জারিফ মানে হল ‘সর্ববিধ্বংসী’।
প্রাণ হারান বহু সাহাবি ও তাবেয়ি
খলিফায়ে রাশেদ হযরত ওমর রা. এর সময়কালেও একবার মহামারী হয়েছিল শামে। যাতে শামের গভর্নর হযরত ওবায়দাহ ইবনুল জাররাহ সহ অনেক সাহাবি রা. ইন্তেকাল করেন। ইতিহাসে ওই মহামারী ‘তাউনে আমওয়াস’ নামে পরিচিত। সেটা ছিল হিজরী ১৮ সনের ঘটনা। কিন্তু ৬৯ হিজরি সনে যে মহামারী নেমে এসেছিল বসরায়, মুসলিম জাহানে তার নজির দ্বিতীয়টি নেই। ভয়ংকর এ মহামারীতে যারা প্রাণ হারান তাদের বড় অংশই ছিলেন নবীজির সাহাবি ও তাবেয়ি। ছিলেন সে যুগের বিখ্যাত অনেক মুহাদ্দিস, ফকিহ ও ইমাম। বিখ্যাত আরবি ব্যাকরণবিদ ইমাম আবুল আসাদ দুয়ালি মারা যান এ মহামারীতে আক্রান্ত হয়েই।
আলবিদায়া ওয়ান্নিহায়া ও তাবারীর বর্ণনা :
আলবিদায়া ওয়ান্নিহায়ায় তাউনে জারিফ সংক্রান্ত একটি বর্ণনা হল, আবু তোফায়েল নামের এক ব্যক্তি যিনি ওই মহামারীর সময় সেখানে ছিলেন তার থেকে বর্ণনা করেন মাআদী–
তিনি বলেন, আমরা শহরের প্রতিটি গোত্রে গোত্রে হন্যে হয়ে ঘুরছিলাম আর মৃতদের জানাযা সম্পন্ন করছিলাম। কিন্তু একপর্যায়ে মৃতের সংখ্যা এতটাই বেড়ে যায় যে, আমাদের পক্ষে দাফনকাজ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন আমরা প্রত্যেক ঘরে ঘরে গিয়ে দেখতাম সব মানুষ মরে আছে, কেউ জীবিত নেই। ফলে বাধ্য হয়ে ঘরের দরজায় খিল লাগিয়ে দিয়ে আসতাম। তারপর মহামারী শেষ হয়ে গেলে ঘরে ঘরে গিয়ে দরজা খুলতে লাগলাম।
হঠাৎ একটি ঘরের দরজা খুলে দেখতে পেলাম একেবারে নবজাতক একটি শিশু। যেন মাত্র কিছুক্ষণ আগে মায়ের কোল থেকে তাকে নিয়ে আসা হয়েছে। শিশুটিকে দেখে আমরা যখন বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম এমন সময় একটি কুকুর এসে হাজির হল ঘরের সামনে। যেন বাচ্চাটিক উদ্ধার করতে চায় সে। আর সাথে সাথে বাচ্চাটিও ওই কুকুরের ওলান থেকে দুধ খাওয়া শুরু করে দিল। মাআদী বলেন, ওই বাচ্চাটিকে আমি বসরার মসজিদে দেখেছি, যখন সে তার দাড়ি হাতড়াচ্ছিল।
শেষ কথা :
চৌদ্দশ বছরের মুসলিম সভ্যতায় ইতিহাসে দেখা দিয়েছিল আরও বেশ কিছু মহামারী। হিজরি ৮৭ সনে বসরাতেই হয়েছিল আরেক মহামারী। যার নাম ‘তাউনে ফাতায়াত’। ১৮ হিজরীতে হয়েছিল তাউনে আমওয়াস। কিন্তু এসবের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর মহামারী ছিল তাউনে জারিফ।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম জাহানকে সব ধরনের বিপদ ও আজাব থেকে হেফাজত করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বোত্তম সাহায্যকারী।
