
মুনশী নাঈম :
২৩ ফেব্রুয়ারি, কড়কড়ে দুপুর। বিজেপি নেতা কপিল মিশ্রের টুইটার হ্যান্ডেলে প্রকাশিত হলো একটি বার্তা। বার্তা নয়, একটি রক্তক্ষয়ী গণহত্যার বীজ বলা যেতে পারে। বার্তাটি এমন—’বিকেলে সিএএ সমর্থনে বিজেপি কর্মীরা মৌজপুরে সমাবেশে উপস্থিত হও।’ এর আগে, গত ডিসেম্বরে, রাজ্যসভায় সিএএ বিল পাস হওয়ার পর থেকেই এর বিরুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতব্যাপী আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত দু’মাস ধরে দিল্লির শাহিনবাগে মহিলাদের অবস্থান বিক্ষোভ চলে আসছিল। এ অবস্থান বিক্ষোভ গতকাল ২২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে জাফরাবাদ ও চাঁদবাগ অবধি এসে পৌঁছেছে।
এ অবস্থান বিক্ষোভকে বিজেপি তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে। কাজেই এখনই তাদের ছত্রভঙ্গ করা না গেলে রাজনৈতিক ভরাডুবি হবে বলে মনে করে। শাহিনবাগের বিক্ষোভ নিয়ে অনেক বিজেপি নেতা সহিংস মন্তব্য করলেও জাফরাদের বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে একপায়ে দাঁড়িয়ে যান কপিল মিশ্র। কপিল মিশ্রের টুইটের পরই বিজেপি সমর্থকরা সমবেত হতে শুরু করে। জাফরাবাদ থেকে মৌজপুরের দীর্ঘ দেড় কিলোমিটার রাস্তা তারা বন্ধ করে দেয়। বিকেলের সমাবেশে বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্মুখেই হুমকি দেন, তিন দিনের মধ্যে জাফরাবাদ এবং চাঁদবাগ থেকে বিক্ষোভকারীরা না সরে গেলে রাস্তা খালি করতে তারাই রাস্তায় নামবেন। এই বিক্ষোভ তারা যেকোনোভাবেই হোক, থামাবেন।
মৌজপুরে বিজেপি সমর্থকদের উপস্থিতির পরেই সেখানে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে বলে গোয়েন্দারা খবর পান। সঙ্গে সঙ্গে গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা রেডিও মেসেজের মাধ্যমে ন্যূনতম ছ’বার দিল্লি পুলিশকে সতর্ক করে দেয় এবং এ সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। এমনকি সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পরামর্শও তারা দিয়েছিলেন; কিন্তু দিল্লি পুলিশ গোয়েন্দা বিভাগের এ আগাম সতর্কবার্তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। অনেকে মনে করেন, শুধু বিজেপিই নয়, পরিকল্পনায় শরীক ছিল অনেকেই।
২
জাফরাবাদ থেকে মৌজপুর পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার রাস্তা বন্ধ করে দেবার পর কবির নগর, কর্দমপুরীতে দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল শুরু হয়ে যায়, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যে মৌজপুর ও জাফরাবাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যার মধ্যে উল্লিখিত এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ধীরে ধীরে ভজনপুর, করাবলনগর, মুস্তফাবাদ এবং গোকুলপুরীতেও দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। দোকানপাট, পেট্রল পাম্প, গুদামঘর ও গাড়ির টায়ার কারখানায় অগ্নিসংযোগ করা হয়।
কট্টরপন্থী হিন্দু সমর্থকরা মুসলিমদের ঘরে ঘরে প্রবেশ করে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাইকেল, মোটরবাইক, প্রাইভেট কার থেকে আরোহীদের নামিয়ে বুকের ওপর পিস্তল ঠেকিয়ে ধর্ম পরিচয় জানতে চায়। এমনকি কাপড় খুলে দেখতেও চায় খতনা করানো হয়েছে কিনা।
এক প্রতিবেদনে বিবিসি হিন্দির সংবাদদাতা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, ‘সহিংসতা হয়েছে মূলত উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। এসব এলাকার সড়কগুলো এখন অনেকটা ধ্বংসস্তুপের মতো রূপ নিয়েছে, রাস্তায় পুড়ছে যানবাহন, উড়ছে ধোঁয়া। তিনি আংশিক পুড়ে যাওয়া মসজিদ দেখেছেন, যেখানে মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কুরআনের পাতা। আরেকটি মসজিদেও হামলা হয়েছে মঙ্গলবার বিকেলে। ব্যাপক প্রচার হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে একদল লোক মসজিদের মিনারে উঠছেন। সংঘর্ষ হওয়া এলাকাগুলো দিল্লি-উত্তর প্রদেশ সীমান্তের কাছে। সাংবাদিকসহ অনেকেই টুইট করেছেন এই বলে যে হামলাকারীরা তাদের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। একজন ফটো সাংবাদিক বলেছেন, তাকে তার প্যান্ট খুলে ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করতে বলা হয়েছিল।’
বেছে বেছে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করা হয়। জ্বালিয়ে দেয়া হয় তাদের দোকান, বাড়ি, খামার, ফার্মেসি। আক্রমণ করা হয় জয় শ্রীরাম স্লোগান তুলে।
৩
পুলিশের চোখের সামনে চলেছে এ নৈরাজ্য। প্রতিটি মৃত্যু, প্রতিটি আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ, ধ্বংসলীলা ইত্যাদি সন্ত্রাসীরা পুলিশের উপস্থিতিকে তোয়াক্কা না করে চালিয়েছে নির্দ্বিধায়। যে দ্রুততার সাথে দিল্লির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সহিংসতা ছড়িয়েছে, আর তার যে সব ভিডিও এবং প্রতিবেদন সামাজিক ও গণমাধ্যমগুলোতে দেখা গেছে, তাতে প্রথমদিকে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই প্রশ্ন তুলেছে দিল্লি হাইকোর্টও।
অপরদিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে একজন বিক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনের ভিত্তিতে হাইকোর্ট ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যরাতেই জরুরি শুনানির নির্দেশ দেন। অতঃপর রাত সাড়ে ১২টায় হাইকোর্টের বিচারপতি এস মুরলিধরের বাসভবনেই শুনানি শুরু হয়। দিল্লির এ সহিংসতার ঘটনায় পুলিশের প্রশ্নবিদ্ধ আচরণের জন্য আদালত তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এ ছাড়াও বিজেপির উগ্রবাদী তিন নেতা কপিল মিশ্র, অনুরাগ ঠাকুর ও প্রবেশ ভার্মার বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কেন এফআইআর দায়ের হয়নি, দিল্লি পুলিশের কাছে তা জানতে চান তিনি। একদিনের মধ্যে এফআইআর দায়ের করার সিদ্ধান্ত নিতে তিনি কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
এফআইআর দায়ের করার নির্দেশ দেবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বিচারপতি এস মুরলিধনকে বদলি করে দেয়া হয়। ফলে দিল্লি পুলিশকে আর এফআইআরও করতে হয়নি।
৪
হাই প্রোফাইল নেতাদের উপস্থিতিতেই রাজধানী দিল্লির বুকে শহরের একটা অংশে মুসলিমদের ওপর এমন হিংসাত্মক ঘটনা চলেছে, অথচ পুলিশ তা নিয়ন্ত্রণে কার্যত ব্যর্থ। তবে কি পুলিশের এই ‘অপারগতা’ পরিকল্পিত? ঠিক যেমন অভিযোগ উঠেছিল ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার সময়?
২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গুজরাটের গোধরায় সবরমতি এক্সপ্রেসে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ওই ট্রেনে অযোধ্যা থেকে ফিরছিলেন করসেবকরা। জলন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান ৫৮ জন করসেবক। কোনো প্রমাণ ছাড়াই ট্রেন জ্বালানোর দোষ চাপানো হয় মুসলিমদের ওপর।গুজরাট জুড়ে শুরু হয় হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ। প্রায় তিন মাস ধরে চলে হামলা, অগ্নি সংযোগ, হত্যালীলা। সরকারি হিসেবেই মৃত্যু হয়েছিল ১০৪৪ জনের, নিখোঁজ ছিলেন ২২৩ জন। আহত প্রায় আড়াই হাজার। নিহতদের মধ্যে ৭৯০ জন ছিলেন মুসলমান। হিন্দু সম্প্রদায়ের ২৫৪ জন। অবশ্য নিরপেক্ষ সূত্রের দাবী হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশী।
সেনাবাহিনীর সাবেক উপপ্রধান জমিরউদ্দিন শাহ গুজরাট দাঙ্গার মোকাবিলায় মোতায়েন করা সেনাদের নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি তার ‘দ্য সরকারি মুসলমান’ বইয়ে দাঙ্গা ঠেকানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন। ভারতের সাবেক উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারিও দাঙ্গার সময় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ওই ভয়াবহ দাঙ্গার সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ভারতের এখনকার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জমিরুদ্দিন জানান, ‘গুজরাটে দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর পরই আমি যোধপুরে তখনকার সেনাপ্রধান পদ্মনাভনের ফোন পেলাম। একটু অবাকই হয়েছিলাম, কারণ সেনাপ্রধান সরাসরি ডিভিশন কমান্ডারকে ফোন করে নির্দেশ দিতেন না। কিন্তু পাঞ্জাবে একসঙ্গে কাজ করার পুরনো পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি আমাকে ভাল করে চিনতেন, ডাকতেন ‘জুম’ বলে। আর্মি চিফ আমাকে বললেন, জুম – তোমার ট্রুপস নিয়ে এক্ষুনি গুজরাটে চলে যাও, দাঙ্গা ঠেকাও।’
আকাশপথে ২০০২-র ২৮ শে ফেব্রুয়ারি আর ১লা মার্চের মধ্যবর্তী রাতেই যোধপুর থেকে গুজরাটের রাজধানী আহমেদাবাদে পৌঁছে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক সেনা। পুরো রাজ্য জুড়ে তখন চলছে ভয়াবহ দাঙ্গা, কিন্তু তাদের পুরো একটা দিনেরও বেশি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হয়েছিল। আমাকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল গুজরাটে পৌঁছানোর পর বাহিনীকে গাড়ি, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ এসকর্ট, কমিউনিকেশন সিস্টেম আর শহরের নকশা দেওয়া হবে। কিন্তু পৌঁছে দেখলাম ওসব কিছুই নেই। একজন ব্রিগেডিয়ার শুধু এসেছিলেন দেখা করতে, তারও কোনও ধারণা ছিল না কেন কিছুই নেই। শুনলাম রাজ্যের মুখ্যসচিব বিদেশে। যিনি দায়িত্বে ছিলেন তাকে যোগাযোগ করার বহু চেষ্টা করলাম – তিনি ফোনই ধরলেন না।’
এভাবে মূল্যবান সময়ের অপচয়ে সেনাবাহিনী নিষ্ক্রিয় থাকতে বাধ্য হয়েছিল – আর তাতেই দাঙ্গায় প্রাণহানি অনেক বেড়ে যায় বলে বইতে লিখেছেন জমিরউদ্দিন শাহ।
ঠিক গুজরাটের আদলে এবারও হামলা চালিয়েছে গেরুয়াধারী সন্ত্রাসেরা। পুলিশ এবারও নিষ্ক্রিয় থেকেছে। এমনকি কোথাও কোথাও হামলাকারীদের সাহায্য করতে দেখা গেছে পুলিশদের। পর্যবেক্ষকগণ বলছেন, যথাসময়ে পুলিশ মাঠে নামলে হিন্দুদের সহিংসতা এত বাড় বাড়তো না। কিন্তু সহিংসতা এবং সন্ত্রাস না থামিয়ে বরং তাদের ছায়ায় আরও নিরাপদে ধংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
৫
এনসিপি নেতা নবাব মালিক সরাসরিই গুজরাত দাঙ্গার প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। তার বক্তব্য, ‘দিল্লিতে সংঘর্ষ চলছে, পুলিশ সেখানে নীরব দর্শক। রাজধানী শহরে কেন এটা হবে? দিল্লিতেও ২০০২ সালে গুজরাত দাঙ্গার মডেল চলছে।’ অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ও বলেছেন, ‘দিল্লিতে যা হয়েছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। দিল্লিতে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গণহত্যা হয়েছে। বিজেপি সারাদেশে দাঙ্গার গুজরাট মডেল প্রয়োগ করার চেষ্টা করছে। আমি কেন গণহত্যা বলছি? কারণ পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে।’
সবশেষে বলা যায়, ২০০২ এর গুজরাট গণহত্যারই আরেকটি পুনরাবৃত্তি দেখলাম দিল্লিতে, এই ২০২০ সালে।
