আবু বকর রাযী ও চিকিৎসা নীতিশাস্ত্র

আবদুল্লাহিল বাকি

১.

চিকিৎসা কেন নীতিশাস্ত্র ও দর্শনের মুখাপেক্ষী হবে? এ প্রশ্নটা উঠাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা সবাই জানি যে, চিকিৎসা মানে যে কোন রোগ অথবা ব্যাধির একটা বস্তুগত প্রতিকারের প্রচেষ্টা। আর রোগ তো রোগ‌ই। ক্যান্সার একটি রোগ। ডায়াবেটিকস একটি রোগ। গ্যাস্ট্রিক, এ্যাজমা প্রভৃতি আলাদা আলাদা রোগ। এসব রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের কাছে যায়। উপযোগী প্রেসক্রিপশন নিয়ে আসে। এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা চালাতে থাকে। রোগ ও সুস্থতার মাঝে একটা স্বাভাবিক সীমারেখা আছে। যার মাধ্যমে সাধারণ যে কেউই বুঝতে পারে, কোনটা রোগ আর কোনটা স্বাভাবিক সুস্থতার অবস্থা। তো এখানে নীতিশাস্ত্রকে টেনে আনার কি দরকার?

প্রশ্নটা ওঠা স্বাভাবিক। তবে বিষয়টা যতটা সরল ভাবা হচ্ছে, ততটা নয়। চিকিৎসার ক্ষেত্রে নৈতিক দৃষ্টিকোণের প্রয়োজনীয়তা আছে কি নেই, এ নিয়ে বিপরীত দুইটা দর্শন দাঁড়িয়ে আছে। একটা হল বস্তুতান্ত্রিক (Naturalistic), যাকে আমরা বৈষয়িক‌ও বলতে পারি। এই দর্শনের মতামত হলো, রোগ ব্যাধি নিছকই জীববিজ্ঞানগত (biological) বিষয়। এখানে নৈতিক বিধি-বিধানের (Value-Free) কোন প্রবেশাধিকার নেই। এই মতের বিশেষ প্রবক্তা হলেন University of Delaware -এর বায়োলজি ও মেডিকেল সাইন্সের অধ্যাপক ড. ক্রিস্টোফার বোর্সেস।

এর বিপরীতে যে দার্শনিক মত বিদ্যমান, তাকে বলা হয় ভিত্তিতত্ত্ব (Constructivism)। যার মূলকথা হলো, চিকিৎসার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র জীববিজ্ঞানগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ যথেষ্ট নয়। বরং এখানে বেশকিছু নৈতিক মানদণ্ড রয়েছে, যা চিকিৎসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

চিকিৎসায় নৈতিকতার হস্তক্ষেপ থাকবে কি থাকবে না?— এ প্রশ্নকে ঘিরে প্রাচীনকাল থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রের অধীনে আরেকটি শাস্ত্রের চর্চা অব্যাহতভাবে বিদ্যমান ছিল। এর নাম চিকিৎসা নীতিশাস্ত্র (Medical Ethics)। ‘প্রিন্সিপালস অফ বায়োমেডিকেল এথিকস’ গ্রন্থে জে. বিউচাম্প এর সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘Medical ethics is a system of moral principles that apply values to the practice of clinical medicine and in scientific research. Medical ethics is based on a set of values that professionals can refer to in the case of any confusion or conflict. These values include the respect for autonomy, non-maleficence, beneficence, and justice.’ (চিকিৎসা নীতিশাস্ত্র একটি নৈতিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল মেডিসিন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মূল্যবোধ প্রয়োগ করা হয়। চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রের ভিত্তি একগুচ্ছ নীতিমালার ওপর, পেশাদার চিকিৎসকগণ কোন দ্বন্দ্ব অথবা সংকটে পড়লে যেগুলোর আশ্রয় নিতে পারেন। এই নীতিগুলির অধীনে রয়েছে ব্যক্তি স্বাধীনতা, সম্মান প্রদান, সদাচার ও ন্যায়পরায়নতা।)

এই শাস্ত্রে আলোচনা করা হয়, চিকিৎসক ও নার্সদের সাথে রোগীদের অথবা তাদের অভিভাবকদের নৈতিক সম্পর্ক নিয়ে। নৈতিকতা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সামাজিকতা, ধর্ম ও নীতিশাস্ত্রের প্রতি নির্ভর করা হয়।

আধুনিক যুগে মেডিকেল ইথিকস শব্দটি প্রথম ১৮০৩ সাল থেকে শুরু হয়েছে, যখন ইংরেজ লেখক এবং চিকিৎসক ‘টমাস পারসিভাল’ চিকিৎসকদের গুরুত্ব, দায়িত্ব ও মর্যাদা বর্ণনা করার জন্য একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন। এরপরে পারসিভালের সেই বইটির উপর ভিত্তি করে ১৮৪৭ সালে চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রের আইনসমূহ ও ধারাগুলো প্রণয়ন করা হয়। ১৯০৩, ১৯১২ এবং ১৯৪৭ সালে বেশ কয়েক বছর ধরে, মূল নথিতে সংশোধন করা হয়েছে। এভাবেই মেডিকেল এথিক্সের অনুশীলন ও চর্চা বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে আরম্ভ হয়।

ঐতিহাসিকভাবে বলা যায়, পাশ্চাত্যে চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রের নীতিমালা প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়েছে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ও চিকিৎসক হিপোক্রেটিস ও জালিনুসের শিক্ষা হতে। এছাড়া ইসলাম, খ্রিষ্টান, ইহুদিসহ অন্যান্য প্রাচীন ধর্ম যে নীতি নৈতিকতার পাঠ দিয়েছে মানুষকে, সেটাও এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

মধ্যযুগের প্রথম পর্বে চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রের আইনসমূহ প্রথম যে বইয়ে সংকলিত করা হয়েছিল, তার লাতিন নাম ‘Formula Comitis Archiatrorum’, ৫ম শতাব্দীতে ইতালির অস্ট্রোগোথিক রাজা থিওডোরিক দ্য গ্রেটের রাজত্বকালে এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। আধুনিক কাল সংলগ্ন মধ্যযুগে মুসলিম চিকিৎসক ও দার্শনিকদের মাধ্যমে মেডিকেল ইথিকসের বিস্তার ঘটে। মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম চিকিৎসা নৈতিকতা নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেন ইসহাক বিন আলী আর-রাহাভী, ‘আদাবুত তাবিব’ নামে। আবু আলী ইবনে সিনা লিখেছেন ‘কানুন ফিত-তিব’। আবু বকর রাযী লিখেছেন ‘আখলাকুত তাবিব’ নামে একটি গ্রন্থ।

সে যুগে ইহুদী চিন্তাবিদদের মধ্য হতে এই বিষয়ে গ্রন্থনা করেছেন মূসা বিন মাইমুন আল-কুরতুবী। ক্যাথলিক দার্শনিকদের মধ্য হতেও কয়েকজন এ বিষয়ে লেখালেখি করেছেন; এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ফাদার টমাস একুইনাস। বর্তমানেও ইসলামী ও ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতিতে তাদের চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রের নিয়মমালাগুলো গুরুত্বের সাথে অনুসৃত হচ্ছে। পাশাপাশি পাশ্চাত্যের চিকিৎসা নৈতিকতায় তাদের ধারাগুলো হুবহু অনুসরণ করা না হলেও, অনেক কিছুর মৌলিক ধারণা তাদের গ্রন্থাবলী থেকেই নেয়া হয়েছে।

আধুনিক কাল সংলগ্ন মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিজ্ঞানী আবু বকর রাযী রচিত ‘আখলাকুত তাবিব’ নিয়ে এখানে কিছু কথা লিখব। কিন্তু এর পূর্বে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আবু বকর রাযীর চিকিৎসাগত অবস্থান বুঝার জন্য তার সম্পর্কে কিছু কথা উল্লেখ করা জরুরি।

২.

হিজরী তৃতীয় ও নবম ঈসায়ীর শেষভাগে, ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম চার যুগের মধ‍্যে শ্রেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসক আবু বকর মোহাম্মদ বিন জাকারিয়া রাযী দুনিয়ার আলো দেখেন। তিনি ২৫০ হি. মোতাবেক ৮৬৪ ঈ. সালে তেহরানের অন্তর্গত রাই শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইন্তেকাল করেছেন অবশ্য বাগদাদে ৯২৫ ঈ. মোতাবেক ৩১৩ হি.এর শাবান মাসে।

রাযী এলমের আকুল পিপাসায় ও ভালোবাসায় শৈশব থেকে বেড়ে উঠেছেন। প্রসিদ্ধ ছিলেন মেধার তীক্ষ্ণতা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের দরুন। অনেক প্রাচ্যবিদই তার কর্মের সৃজনশীলতা ও মননশীলতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাকে অবশ্য তারা ডাকেন Rhazes নামে। তার সম্পর্কে ইংরেজ গবেষক স্টেপল্যাটন বলেছেন, ‘ইউরোপে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের বিপ্লবের আগ পর্যন্ত রাযী দর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন, অনন্য ছিলেন।’ প্যারিসের চিকিৎসা ফ্যাকাল্টি, ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদের পাশে রাযীর‌ও একটা চিত্রিত ছবি টানিয়ে রেখেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাযীর আবিষ্কার ও অবদানগুলো প্রদর্শন করার জন্য আলাদা একটি ভবন‌ই রয়েছে।

এর‌ও অনেক পূর্বে তার সম্পর্কে আল কাফাতি ‘তারিখুল হুকামা’ গ্রন্থে লিখে গিয়েছেন, ‘মোহাম্মদ বিন জাকারিয়া আবু বকর রাযী কোন বিতর্ক ছাড়াই মুসলমানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক। তর্কশাস্ত্র, প্রকৌশলসহ দর্শনের অন্তর্গত অন্যান্য শাখায়‌ও তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।’ চিকিৎসাক্ষেত্রে তিনি গভীর অবদান রেখেছেন যার কারণে এখনও প্রায় হাজার খানেক বছর ধরে তার নাম স্মরণ করা হয়। রাযী পৌঢ়ত্বে পৌঁছে চিকিৎসাশাস্ত্র শেখা শুরু করেন। যখন তিনি বাগদাদে প্রবেশ করেন, সেখানের একটি প্রাচীন চিকিৎসালয় ‘বিমারিস্তান আল-আদুদী’ নির্মাণকার্য পরিদর্শন করেছিলেন এবং সেখানে কিছুদিন থেকেছিলেন। হিজরী তৃতীয় শতকে এই চিকিৎসালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আদুদ-উদ্দৌলা আল বুহাইয়ী। সেখানে তিনি রোগব্যাধির প্রকার ও স্বরূপ, সাথে সাথে সেগুলোর প্রতিকার ও প্রতিষেধক সম্পর্কে বিস্তর গবেষণা করেছিলেন। এখানে এসে তিনি ভিন্ন রকম কিছু রোগ সম্পর্কে জ্ঞাত হোন, যে সম্পর্কে তার পূর্ব ধারণা ছিল না। তাছাড়া অন‍্যান‍্য চিকিৎসকদের আলোচনা ও পরামর্শ দ্বারাও তিনি বেশ উপকৃত হয়েছেন।

বাগদাদে আসার পূর্বে রাযী তার আপন দেশ রাই-এর মধ্যেই একটি বিমারিস্তানে চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে পড়ালেখা করেছেন এবং পাশাপাশি মেডিকেল কাজকর্ম‌ও করেছেন। এরপর তিনি বাগদাদে আসেন। তিনি আসার পরই ‘বিমারিস্তান আল-আদুদী’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই চিকিৎসালয় নির্মাণের সাথে রাযীর এমন একটি ঘটনা সংযুক্ত রয়েছে, যা তার মেধার প্রমাণ বহন করে। রাযীর কাছে বাদশা আদুদ-উদদৌলা আল-বুহাইয়ী চিকিৎসালয় নির্মাণের জন্য সর্বোত্তম স্থান কোনটা হবে, সে সম্পর্কে জানতে চাইলেন। রাযী কিছু বালককে পাঠিয়ে দিলেন বাগদাদের বিভিন্ন স্থানে, কিছু গোশতের অংশ দিয়ে। বেশ কয়েকদিন যাবত তিনি সেসব স্থান পর্যবেক্ষণে রাখলেন। যে স্থানে গোশত শুকাতে অধিক বিলম্ব হলো সেখানেই তিনি বিমারিস্তান বানানোর জন্য পরামর্শ দিলেন বাদশাকে। পরবর্তীতে এই স্থানটি বাগদাদের সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল, কারণ, স্বচ্ছ বায়ু, স্বাস্থ্যকর ও পরিমিত আবহাওয়া বাগদাদের অন্যান্য স্থানের চেয়ে সেখানেই বেশি ছিল। আর দুর্বল, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম– এমন রোগীদের জন্য উক্ত স্থানটিই অধিক উপযোগী।

আদুদ-উদদৌলা এখানেই ক্ষান্ত হলেন না। বরং বিমারিস্তান নির্মাণ শেষ হবার পরে এই চিকিৎসালয়ের একজন প্রধান কর্ণধার নিযুক্ত করার কথা ভাববেন। যিনি হবেন চিকিৎসা ও তার যাবতীয় জ্ঞান বিজ্ঞান সম্পর্কে দক্ষ জ্ঞানী। যার বিস্তৃত জ্ঞান থাকবে চিকিৎসা সংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয়ে। বাগদাদের সকল চিকিৎসক একত্রিত হলেন। তাদের সকলের মধ্য হতে ১০০ জন চিকিৎসক নির্ধারণ করা হলো। এই ১০০ জনের মধ্যে রাযীও ছিলেন। তাদের সকলের পরীক্ষা করার পর তাদের মধ্য হতে আবার ৫০ জন মানুষ নির্ধারণ করা হলো‌। তাদের মধ্যেও রাযী ছিলেন। তাদের মধ্য থেকে বাছাই করে ১০ জনকে আলাদা করা হলো। এদের মধ্যেও রাযী বাদ পড়লেন না। তাদের মধ্য হতে চূড়ান্ত বাছাইপর্ব শেষ করার পর তিনজনের নাম উঠলো। এদের মধ্যেও রাযী ছিলেন। এই তিন জনের মাঝে আবার জ্ঞানের প্রতিযোগিতা হলো। সেখানে রাযীই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হলেন। তাই তাকে বিমারিস্তানের ‘সাউর’ অর্থাৎ সকল চিকিৎসকদের প্রধান দায়িত্বশীল হিসেবে নির্বাচন করা হলো।

চিকিৎসাশাস্ত্রে তার তীক্ষ্ণ মেধার প্রমাণ করে, এমন আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করছি, যা ইবনে খাল্লিকান ‘ওয়াফায়াতুল আয়ান’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এক বালক বাগদাদ থেকে রাই শহরে আসলেন। কিন্তু আসার পর থেকে তার গলা থেকে অনবরত রক্ত পড়ছিল। অথচ এই আকস্মিক রক্তক্ষরণের কারণ তার জানা ছিল না। তার চিকিৎসার জন্য আবু বকর রাযীর ডাক পড়ল। বালকটির গলা থেকে যে রক্ত পড়ছে ও প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে, এ কথাটা সে খুলে বলল রাযীর নিকট। রাযী তার মাইক্রোসেন্সর নিয়ে রোগীর গলার ভিতরে ভালোভাবে দেখতে থাকলেন এবং বাগদাদ থেকে এতদূর পথ কিভাবে আসলো বালকটি, সে সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানতে চাইলেন। কোন ঘা অথবা চাপ খেয়ে ছিলে যাওয়া– দেখলেন না। এজন‍্য কারণটা তিনি নির্ধারণ করতে পারছিলেন না। বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন এবং ভাবছিলেন। একটু পরে রোগী প্রচন্ড রেগে উঠলেন। বললেন, আমি মরে গেলেও এত হতাশ লাগত না, যতটা হতাশ লাগে চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করতে না পারলে।’ রাগে ফুসলাতে ফুসলাতে তার গলার ব্যথা আরো বেড়ে গেল। পায়চারি করতে করতে হঠাৎ রাজি ফিরে এসে রোগীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘রাস্তায় কি কোন কিছু পান করেছিলে?’ তখন সে বলল, ‘জি, আসার সময় স্বচ্ছ পানি না পাওয়ার দরুন, জলাশয়ের অবশিষ্ট নোনতা পানি পান করেছি। তখন মেধার তীক্ষ্ণতার দরুন রাযী বুঝে ফেললেন, সেই ময়লা পানিতে হয়তো কোন ক্ষুদ্র প্রাণীর গর্ভাশয়ের জমাট রক্ত ছিল। পানির সাথে যা তার পেটে প্রবেশ করেছে। এবং সেটার আঘাতেই উদর থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

রোগের কারণ নির্ণয় করতে পারার পর রাজি সেই বালককে বলল, ‘আমি কাল এসে তোমার চিকিৎসা করব। এবং সুস্থ হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত আমি এখান থেকে এক পাও নড়ব না। তবে একটা শর্ত আছে। তুমি তোমার সেবাকারীদেরকে বলে রাখবে, আমি যা বলি সেক্ষেত্রে তারা যেন আমাকে পূর্ণ অনুসরণ করে।’ বালক বলল, ‘অবশ্যই’। পরের দিন রাজি দুই জগ শ্যাওলা নিয়ে আসলো। সেগুলো রোগীর সামনে দিয়ে বলল, ‘এগুলো গিলো।’ সে বলল, আমি পারব না।’ তখন রাজি আশেপাশের সেবাকারীদেরকে বলল, ওকে শক্ত করে ধরে জোর করে খাইয়ে দাও।’ তারা তার কথামত‌ই কাজ করলো। তাকে খাটের উপর চাপ দিয়ে ধরল। এবং মুখ খুলে দিল। রাজি গিয়ে তার মুখের মধ্যে শ্যাওলা ঢালতে লাগলেন এবং তাকে কঠিন ভাবে চাপ দিতে লাগলেন। বললেন, শেওলা না গিললে লাঠি দিয়ে পেটাবো। এভাবে জোর করে এক জগ শ্যাওলা তাকে খাওয়ানো শেষ হল। বালকটা এটা থেকে বাঁচার জন্য চিৎকার চেঁচামেচি করতে লাগলো। কিন্তু রাযী ছাড়ার পাত্র নয়। বালক বলল, ‘থামুন, আমার প্রচন্ড বমি আসছে।’ তখন সে বমি করতে করতে পুরো পেট খালি করে ফেলল। সেই বমির মধ্যে ভালোভাবে লক্ষ্য করে, রাজি দেখতে পেল, পেটের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা কৃমির গর্ভাশয়ের রক্তপিণ্ড। সেই বালকটি উঠে বসলো। দেখল, তার জন্য আরেক জগ শ্যাওলা অপেক্ষা করছে। এটার ভয়ে সে দৌড়ে পালাতে লাগল। রাজি তখন তাকে অভয় দিয়ে ডাকতে লাগল। কিন্তু সেই ভীতু বালকটির পিছনে ফিরে তাকাবার আর অবকাশ হল না।’

আরব দর্শনের অন্যতম ইতিহাস লেখক ও প্রাচ্যবিদ ‘রিচার্ড ওয়ালজার’ রাযী সম্পর্কে লিখেছেন, ‘রাযীর গ্রন্থ পড়ার সময় প্রত্যেক লাইনে লাইনে অনুভব করি, আমরা একটা উঁচু মহান চিন্তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছি। আমরা এমন একজন লোককে অবলোকন করছি, যিনি আপন মহত্ত্ব সম্পর্কে সচেতন তবে আত্মম্ভরিতায় লিপ্ত নন। দর্শন ও চিকিৎসা উভয় ক্ষেত্রেই যিনি নিজেকে উচ্চস্তরের মনে করেন। এবং তার চিন্তা অনুযায়ীই— সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হিপোক্রেটিস অথবা জালিনুসকে ক্ষমতা ও মহত্বের দিক থেকে ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যদিও তিনি তাদের বেশ কিছু দর্শন ও চিকিৎসাগত মতামত ও আবিষ্কারের পরিবর্তনের কথা স্বীকার করেন। যুগের পরিবর্তনে যেগুলো অচল হয়ে গিয়েছে। সাথে সাথে বিশ্বের বিশাল চিকিৎসাগত উপলব্ধির সাথে তিনি নিজ আবিষ্কার ও মতামতকে যুক্ত করতে মোটেও দ্বিধাগ্রস্ত নন।

প্রত্যেকবার যখন তিনি বিশেষ কোন রোগ নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করতেন তখন সে সম্পর্কে লেখা ইউনানী, হিন্দি, ফার্সি অথবা অন্যান্য ভাষার যেসব গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হয়েছে— সব‌ই অধ্যায়ন করার চেষ্টা করতেন। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তার নিজস্ব কোন না কোন মত থাকত‌ই। কোন ব্যক্তির প্রসিদ্ধির উপর ভিত্তি করে বিচার-বিশ্লেষণহীন তার কোন কথাকে তিনি গ্রহণ করে নিতেন না। আরব চিকিৎসকদের মধ্য হতে এটি ছিল তার একটি বিশেষ গুণ।’

৩.

আবু বকর রাযী লিখিত ‘আখলাকুত তাবিব’ গ্রন্থের বিস্তারিত নাম হল ‘রিসালাতুন লি আবি বকর মোহাম্মদ বিন জাকারিয়া আর রাযী ইলা বা’দি তালামিযাতিহ’। আবু বকর রাযীর অন্যান্য গ্রন্থের মত এই গ্রন্থেও খুব সহজবোধ্য ভাষায়, সংক্ষিপ্ততা ও গভীরতায়, সুক্ষ্ম ও বিশ্লেষণমূলকভাবে বিষয়গুলো তুলে আনা হয়েছে। যেই ছাত্রের কাছে এই গ্রন্থটি পাঠিয়েছিলেন মহান দার্শনিক ও চিকিৎসক আবু বকর রাযি তার নাম ‘আবু বকর বিন কারেব আর রাযী’। গ্রন্থটি লেখার প্রেক্ষাপট ছিল, খোরাসানের এক আমির তার সেই ছাত্রকে ব্যক্তিগত চিকিৎসক বানানোর জন্য প্রস্তাব করেছিলেন। সেই আমিরের নাম স্পষ্ট করে রাজি বলেননি, এভাবে ইঙ্গিত করে কথা বলাই তার অভ্যাস।

চিকিৎসার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এর উদ্দেশ্য রোগীর সেবা, তার যাবতীয় হক লক্ষ্য রাখা ও তার সুস্থতার সুরক্ষা দেয়া।’ মুহাম্মদ আলী থানবী রহ. তার ‘কাশশাফু ইস্তিলাহাতিল ফুনুন’ গ্রন্থে চিকিৎসাশাস্ত্রের উদ্দেশ্য হিসেবে এই তিনটিই উল্লেখ করেছেন।

তার ছাত্র যেহেতু খোরাসানের একজন আমিরের নিকট ব্যক্তিগত ডাক্তার হিসেবে যাচ্ছিলেন, তাই তাকে এই বিষয়ে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘জেনে রাখ, একজন চিকিৎসকের জন্য সবচেয়ে জটিল ও কষ্টকর হলো, বিত্তশীল, আমির‌-উমারা ও নারীদের চিকিৎসা প্রদান করা। কারণ, একজন স্বাধীনচেতা চিকিৎসক মাত্রই পছন্দ করেন ধনী-গরীব, সাধারণ-বিশেষ– নির্বিশেষে সকলকে সেবা প্রদান করতে। এই অবস্থাতেই তিনি সুখে থাকেন। কিন্তু আমির-উমারা ও রাজা বাদশাহরা যদি মূর্খ হয় তাহলে তাদের চিকিৎসা করতে থাকলে, শিক্ষার দরুন সে ভবিষ্যৎ রাজা হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।’ অর্থাৎ তিনি দুটি দিকেই ইতিবাচক প্রভাব খোঁজার চেষ্টা করেছেন।

যে ব্যক্তি চিকিৎসক হবে, তার ব্যক্তি-প্রকৃতি কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘সর্বপ্রথম তোমার উপর আবশ্যক, নিজেকে ফুর্তি, মজা ও অনর্থক কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখা। সর্বদা বইপত্র অধ্যয়ন করা। রোগীকেও এসব বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা উচিত।’ চিকিৎসকের সর্বদা অধ্যয়ন করা উচিত’ যে বললাম তার কারণ, আমির-উমারা, রাজা-বাদশাদের মধ্য হতে অনেকেই আছেন মূর্খ। তাদের মূর্খতার একটি দিক হলো, তারা মনে করেন, জগতের যারা জ্ঞানী আছেন তারা সকল জ্ঞানের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে অবগত থাকবেন। এজন্য তারা কোন জ্ঞানী মানুষ পেলে, তাকে সকল বিষয়েই প্রশ্ন করে থাকে। যদি এর উত্তর তিনি দিতে না পারেন, তাহলে তারা মনে করে, তিনিও তাদের মত মূর্খ। অথচ মানুষের ক্ষেত্রে এটা স্বাভাবিক‌ই যে, অনেক অজ্ঞ মানুষ মাঝে মাঝে সূক্ষ্ম বিষয়ের সঠিক সমাধান দিয়ে দেয়। কিন্তু মাঝে মাঝে জগদ্বিখ্যাত জ্ঞানীরাও শিশুদের বোধগম্য ছোটখাটো প্রশ্নের উত্তর‌ও দিতে পারেন না। সুতরাং তাদের মূর্খতার যদিও কোনো চিকিৎসা নেই, তবুও প্রচুর অধ্যয়নের মাধ্যমে এর সামান্য প্রতিকার হতে পারে।’

আবু বকর রাযী রোগীর প্রকার বর্ণনা করতে গিয়ে সেগুলোকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন। ১. এমন রোগ যা স্বাভাবিকভাবে সেরে যায়। যেমন স্বাভাবিক তাপমাত্রার জ্বর অথবা সূর্যের তাপজনিত মাথাব্যথা। ২. এমন রোগ যা স্বাভাবিকভাবে সেরে যায় না তবে দীর্ঘ চিকিৎসা গ্রহণ করলে সাধারণত সেরে যাবে। এরমধ্যে রয়েছে حمى عقديه বা Erythema nodosum। ৩. এমন রোগ, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া যারা আরোগ্যতা সম্ভব নয়। এরমধ্যে রয়েছে কুষ্ঠরোগ, শ্বেতরোগ প্রভৃতি। এই রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসককে গা-ছাড়া হলে চলবে না। তাকে মনে করতে হবে, এই রোগের সমস্ত দায়ভার কার উপর ন্যস্ত করা হয়েছে, তাকে এক্ষেত্রে বিশ্বস্ত মনে করা হয়েছে। এক্ষেত্রে চিকিৎসা পরবর্তী সময়ে রোগী যদি সুস্থ হয়ে যায়, তাহলে চিকিৎসক ভাববেন, দীর্ঘ চিকিৎসার কারণে সুস্থ হয়েছে রোগী। আর যদি কেউ সুস্থতা লাভ না করে, বরং অসুস্থতার ক্ষেত্রে তার অবনতি হতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে তার নিজের কোন কমতি অথবা দায়িত্বের ঘাটতি ছিল এই ক্ষেত্রে।’ এভাবেই আবু বকর রাযী চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে, চিকিৎসকের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত– তার বর্ণনা দিলেন।

রোগীর রোগ গোপন করা সম্পর্কে চিকিৎসককে উপদেশ দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘চিকিৎসকের উচিত মানুষের সাথে কোমল আচরণ করা এবং তাদের গোপন বিষয়কে ঢেকে রাখা। কেননা হতে পারে, রোগী ব্যক্তি তার রোগের বর্ণনা তার নিকটতম স্বজন তথা মা-বাবার কাছ থেকেও লুকিয়ে রেখেছে অথচ প্রয়োজনের কারণে চিকিৎসককে খুলে বলেছে। আর নারী অথবা সুশ্রী বালকদের সেবা করার সময়, দৃষ্টির সংরক্ষণ করা উচিত। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় স্থানের বাইরে দৃষ্টি অতিক্রম করা উচিত নয়। এ সম্পর্কে চিকিৎসকদের মহান শিক্ষক জালিনুস তার ছাত্রদেরকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘চিকিৎসকের উচিত আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠভাবে চিকিৎসা করা। সুন্দর সুশ্রী মেয়েদের থেকে দৃষ্টিকে সংরক্ষণ করা উচিত। তাদের দেহের কোন অংশ স্পর্শ করা মহা অন্যায়। কেবলমাত্র চিকিৎসার প্রয়োজনে চিকিৎসার স্থানে স্পর্শ করতে পারবে। আর চোখ দুটো দিয়ে তার দেহ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বারবার দেখতে থাকবে না। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হল, যারা এসব বদভ্যাস থেকে বিরত থাকে, মানুষের চোখে তার মর্যাদা বেড়ে যায়। আর যারা এসব বদভ্যাসের চর্চা করে, তাদেরকে সম্মান করা তো দূরে থাক, মানুষ চিকিৎসাও নিতে আসে না তাদের কাছ থেকে।’ জালিনুস যা বলেছেন, খুবই সত্য বলেছেন।’

ব্যক্তিবিশেষের জন্য নির্ধারিত বেতনভুক্ত চিকিৎসকের ক্ষেত্রে রোগীর কর্তব্য কি— এ সম্পর্কে রাযী বলছেন, ‘যেসকল রাজা-বাদশা অথবা সাধারণ প্রজা নিজেদের জন্য বেতনভুক্ত বিশেষ চিকিৎসক নিয়োগ দিবেন, তাদের উচিত তাদের চিকিৎসকদের সঙ্গে কোমল ও উত্তম আচরণ করা। তার মজলিসের অথবা বাড়ির সকল চাকুরীজীবীর চাইতে একজন চিকিৎসককে উচ্চ মর্যাদার স্থান প্রদান করা উচিত। কারণ, অন্যান্য চাকুরীজীবীরা তো শুধুমাত্রই দেহের সেবা করে। আর চিকিৎসক দেহের পাশাপাশি মনের প্রফুল্লতাও বজায় রাখতে সাহায্য করেন।’

চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করার পর মনে যাতে কোনো ধরণের অহংকার ও গর্ব জন্ম না নেয় এজন্য রাযী বলেছেন, ‘যারা চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে পড়ালেখা করে তারপর আমির উমারার দরবারে কোনমতে একটা চাকরি পেয়ে যায়, তাদের অহংকারের কোনো শেষ থাকে না। ধনীদের পাশাপাশি দরিদ্ররাও চিকিৎসকের চিকিৎসা পাবার অধিকার রাখে। আবার কিছু চিকিৎসককে দেখা যায় কোন রোগীর কঠিন কোন রোগ সারিয়ে ফেললে, মনে আত্মম্ভরিতা জেগে ওঠে। সেখান থেকে জনগণের সাথে তারা অহংকারমূলক আচরণ করে। এ সবকিছু চিকিৎসকের জন্য একটা কলঙ্ক ও নৈতিকতা বিবর্জিত কাজ। চিকিৎসক তো আপন চিকিৎসার ক্ষেত্রে আল্লাহর উপরেই ভরসা করবে। তার কাছেই কামনা করবে রোগীর আরোগ্যতা। তার নিজের কাজ অথবা সক্ষমতার ওপর ভরসা করবে না।’

ব্যক্তিগত চিকিৎসকের ক্ষেত্রে তিনি পরামর্শ দিয়ে আরো বলেছেন, ‘প্রতিদিন তাকে গিয়ে দেখে আসা উচিত। তার কাছে বসে তার দেহের তাপমাত্রাটা মেপে নেয়া ভালো। যাতে করে অসুস্থতা আসার পূর্বেই এর নিরাময় করা যায়। অথবা অসুস্থতা প্রাথমিক অবস্থায় থাকতেই এর একটা সুরাহা হয়ে যায়। তার সামনে কম কম কথা বলা উচিত। সে কি ধরর খাবার খাচ্ছে— সেদিকে বিশেষ নজর রাখা উচিত। তবে খাবারের দস্তরখানায় বসে তার সামনে খাদ্যের গুণাগুণ বর্ণনা করতে যাবে না। বরং পরবর্তী সময়ে তার সামনে বিভিন্ন খাদ্যের গুনাগুন ও উপযোগিতা নিয়ে পরামর্শ দিবে।’

এই বইয়ে তিনি বিশেষভাবে তার ছাত্রকে ও ব্যাপকভাবে সকল চিকিৎসককে আরো অনেক উপদেশ দিয়েছেন, যেগুলো পরবর্তীতে চিকিৎসার নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যেমন, ওষুধ সেবন অথবা প্রেসক্রিপশন প্রদানের সময় রোগীর সামনে বসে তাকে লক্ষ্য করা। ইতিবাচকভাবে রোগীর সামনে আলোচনা করা। তার সামনে বিষসহ অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থের কথা না তোলা। মদ পান অথবা এজাতীয় অন্যান্য নেশাজাতীয় খাদ্য ও পানীয় হতে বেঁচে থাকা। কারণ, এটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। আর চিকিৎসকের স্বভাবের প্রভাব সাধারণত রোগীর উপরে পড়ে। ওষুধ ও প্রেসক্রিপশন রোগীকে বুঝিয়ে দেওয়ার পরও তার খোঁজ খবর নেয়া। তাকে সময় দেয়া। চিকিৎসকের জন্য একজন রোগীর কি কর্তব্য সেটাও তিনি সেখানে তুলে ধরেছেন। যেমন, চিকিৎসককে শিক্ষকের মত সম্মান করা ও তার প্রতি সুধারণা রাখা। তার ব্যবস্থাপত্র পুরোপুরিভাবে মেনে চলা। চিকিৎসকের কাছে রোগ সংক্রান্ত কোন বিষয় না লুকানো।

আবু বকর রাযী রোগীর উপরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অথবা এক্সপেরিমেন্ট প্রয়োগ করার ঘোর বিরোধী ছিলেন। বর্তমানের মেডিকেল ইথিকসেও বিষয়টি অপরাধ বলে বিবেচিত। এসম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘বিভিন্ন রোগের প্রতিকার নিয়ে মূর্খ ফকির কবিরাজরা যেসব বেসাতি খুলে বসে, সেগুলোর দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করা যাবেনা। মাঝে মাঝে শোনা যায় অমুকের কাছে অমুক রোগের অব্যর্থ প্রতিষেধক রয়েছে। এসব ভুয়া কথা। মানুষ যত বয়স্কই হোক না কেন চিকিৎসার বিষয়ে কারো কাছে বিশেষ কোনো জ্ঞান থাকবে, অন্য চিকিৎসকদের যে সম্পর্কে কোন জ্ঞাতি থাকবে না— এটা হতেই পারে না। যদি কোন কবিরাজের এরকম ভিন্ন ব্যবস্থাপত্রের মাধ্যমে কারো রোগ ভালো হয়, তাহলে সেটা কাকতালীয়; স্বাভাবিক ঘটনা নয়।

যারা চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম-নীতিমালার ধার ধারে নেই, এর খুটিনাটি বিষয় যাদের একাডেমিক জ্ঞান নেই, তারা শুধুমাত্র কিছু পুথিপুস্তক ঘাটাঘাটি করে, ওষুধ তৈরি করার কসরত করে। অথচ তারা বিভিন্ন ওষুধের মাঝে বিদ্যমান উপাদানের নাম, পরিচয় ও প্রকৃতি জানে না। সুতরাং রোগীর উপরে নিজের ব্যক্তিগত গবেষণা, অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করা খোদ রোগীর জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। হাকিম জালিনুস বলেছেন, ‘চিকিৎসার পেশায় যারা জড়াতে চায় তাদের সকলকে আমি এই পরামর্শ দিব যে, তারা যেন নিছকই অভিজ্ঞতার আলোকে এ পথে আগে না বাড়ে।’ গ্রিক দার্শনিক, নীতিশাস্ত্রবিদ ও চিকিৎসক হিপোক্রেটিসও এ নিয়ে লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘জীবন সংক্ষিপ্ত। পেশা দীর্ঘমেয়াদি। কিন্তু সময় স্বল্প। আর এসবের মধ্যে রোগীর উপর ব্যক্তিগত এক্সপেরিমেন্টের প্রয়োগ অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিপদজনক।

গ্রন্থের শেষের দিকে রাযী চিকিৎসকদের বিশেষ পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন যা অন্যদের মাঝে নেই। ১. সকল ধর্ম ও মাজহাবের মানুষ চিকিৎসা পেশার শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়ে একমত। ২. রাজা বাদশারা পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে মুখাপেক্ষী। ৩. চিকিৎসকদের কষ্ট, সাধনা, ত্যাগ। ৪. অন্যদের মুখে হাসি ফোটানোর প্রচেষ্টা। ৫. আল্লাহতালার একটি নামের আংশিক প্রয়োগ লাভ করা।

আবু বকর রাযী তার গ্রন্থের একেবারে শেষে চিকিৎসককে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তার কর্মপদ্ধতি যেন গণকদের পদ্ধতির মতো লোকভুলানো না হয়। এগুলো ছাড়াও এই গ্রন্থের মধ্যে একজন চিকিৎসকের জন্য পরামর্শমূলক ও দিকনির্দেশনামূলক অনেক নিয়ম-নীতি বর্ণনা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পাশাপাশি সাধারণ দায়িত্বশীল মানুষরাও যদি এই গ্রন্থটি পাঠ করে, তাহলে তারা নিজ নিজ ক্ষেত্র হতে উপকৃত হবে— আশা করি। আল্লাহ মহান চিকিৎসক আবু বকর রাযীকে অনন্ত শান্তির আলয় দান করুন, এই কামনা করি।

আগের সংবাদনববী চিকিৎসা : কিছু প্রয়োজনীয় আলোকপাত
পরবর্তি সংবাদমুসলিম সভ্যতায় চিকিৎসা বিদ্যার ক্রমবিকাশ