ইবনুন নাফিস : বিস্মৃত মুসলিম চিকিৎসক

যায়েদ মুহাম্মদ 

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়াটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। আমাদের শরীরের রক্ত প্রথমত হৃৎপিন্ড থেকে ধমনীর মাধ্যমে ফুসফুসে যায়। এবং শিরার মাধ্যমে আবার হৃৎপিন্ডে ফিরে আসে। পরবর্তীতে তা আবার ধমনী, উপধমনী, শিরা উপশিরার মাধ্যমে সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ে৷ রক্ত সংবহন তন্ত্রের কাজের বিশদ বিবরণ আমাদের কাছে বিরক্তিকর মনে হলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্রিয় সূত্র হিশেবে বিবেচনা করেন। নানা ধরনের আধুনিক অস্ত্রোপচার এমনকি আমাদের শরীরের ঠিক কোন জায়গায় কোন রক্তবাহে ইঞ্জেকশন দিতে হবে সেটিও এই প্রক্রিয়া যথার্থভাবে জানার উপর নির্ভর করে।

এই তত্ত্বের প্রধান আবিষ্কারক হিশেবে ধরা হয় বিখ্যাত চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী উইলিয়াম হার্ভেকে। ইংল্যান্ডের ফোকস্টোন শহরে ১৫৭৮ সালে জন্মগ্রহন করেন উইলিয়াম হার্ভে। এর আগে রক্ত সঞ্চালনের ভিন্ন ধারণা প্রচলিত ছিল চিকিৎসকদের কাছে। হার্ভের চোদ্দ শো বছর পূর্বে বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী গ্যালেন রক্ত সঞ্চালনের ব্যাপারে বলেছিলেন, খাদ্য যখন আমাদের শরীরে প্রবেশ করে তখন তা রক্ত উৎপাদন করে। এই রক্ত যকৃত বা লিভার থেকে হৃৎপিন্ডে পৌঁছায়। হৃৎপিন্ড রক্তকে গরম করে এবং অবশেষে কেবলমাত্র শিরার মাধ্যমে রক্ত সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ে। গ্যালেনের এই ভুল মতবাদ অনুযায়ী দীর্ঘকাল ধরেই চিকিৎসা চলে আসছিল।

গ্যালেনের এই মতটি চিকিৎসকদের কাছে মহাসত্যের মত সুস্পষ্ট ছিল। উইলিয়াম হার্ভে এই মতবাদ খন্ডন করে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করলেও সেটি প্রতিষ্ঠিত হতে দুইশো বছরের মত সময় লেগে যায়। গ্যালেনের সুপ্রতিষ্ঠিত তত্ত্বের বিরোধিতার জন্য উইলিয়াম হার্ভে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হোন। হার্ভের আগে ১৫৫০ খ্রীস্টাব্দে ইতিহাসবিদ মাইকেল সারভেদো গ্যালেনের অকাট্য তত্ত্বের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। ১৬১৬ সালে সারভেদো প্রকাশ্যে গ্যালেনের মতবাদের বিরোধিতা করেন। সারভেদোর কাছে সুস্পষ্ট কোন ব্যাখ্যা ছিল না। ফলে এর ফলাফল হলো ভয়াবহ। গ্যালেনের মতবাদের অনুসারীরা নিষ্ঠুরভাবে সারভেদোকে পুড়িয়ে মেরে ফেলে।

ইতিহাসে দেখা যাচ্ছে, রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ১৫০ খ্রীস্টাব্দের সময়কার চিকিৎসাবিজ্ঞানী গ্যালেনের মতামতের বিরোধী তত্ত্ব দাঁড় করান পনেরো শতকের উইলিয়াম হার্ভে। ফলে উইলিয়াম হার্ভেই আজকের আধুনিক রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতির প্রথম আবিষ্কারক। এর আগে মাইকেল সারভেদোকে কোন যুক্তিব্যাখ্যা ছাড়া গ্যালেনের বিরোধিতা করতে দেখা যায়। কিন্তু সর্বপ্রথম যুক্তিযুক্তভাবে গ্যালেনের বক্তব্যের বিরোধিতা করেন হার্ভে। পাঠকদের জানা দরকার, এই ইতিহাসে খানিকটা ফাঁক রয়ে গেছে। উইলিয়াম হার্ভের তিনশ বছর আগে তেরো শতাব্দিতে ইবনুন নাফিস নামের একজন প্রতিভাবান মুসলিম বিজ্ঞানী প্রচণ্ড দৃঢ়তার সাথে গ্যালেনের একচ্ছত্র তত্ত্বের বিরোধিতা করেন।

ইবনুন নাফিসের বিস্মৃত আবিষ্কার 

বলাবাহুল্য, ইবনুন নাফিসের আগে সমস্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানীই খুব দৃঢ়ভাবে গ্যালেনের বক্তব্য সমর্থন  করেন। এমনকি বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসক ইবনে সিনা এই মতবাদকে সমর্থন করে তার আল কানুন গ্রন্থে সম্পৃক্ত বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ইবনুন নাফিস আল কানুন গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখতে গিয়ে গ্যালেনের মতবাদের ক্ষেত্রে ইবনে সিনার সঙ্গে একমত হন নি। বরং নানাভাবে সাহসের সঙ্গে এই মতবাদের ভ্রান্তি প্রমাণ করেছেন।

দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ইবনুন নাফিসের এই অভিনব ও একক আবিষ্কারের ব্যাপারে বিস্মৃত ছিল। হঠাৎ করেই ১৯২৪ সালে বার্লিনের একটি লাইব্রেরীতে শারহু তাশরিহিল কানুনের একটা পান্ডুলিপি পাওয়া যায়। এই ব্যাখ্যা গ্রন্থে ইবনুন নাফিস রক্ত সঞ্চালনের ব্যাপারে বিস্তারিত লিখেছিলেন। তিনি কয়েক জায়গায় বেশ শক্তভাবে ইবনে সীনা ও গ্যালেনের বিরোধিতা করেছেন। মিশরের চিকিৎসা বিজ্ঞানী মুহিউদ্দিন এই পান্ডুলিপির উপর থিসিস করে বেশ একটা ধাক্কা দিয়েছেন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানী সমাজকে। ডক্টর মুহিউদ্দিন যখন এই থিসিস তৈরি করে বোর্ডের কাছে পেশ করে তখন ইবনুন নাফিসের সাথে সম্পৃক্ত করে এই ধরনের অভিনব দাবী দেখে তারা হতবুদ্ধি হয়ে যায়। ব্যাপারটা ঠিক তারা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে না।

সে সময় বিখ্যাত জার্মান প্রাচ্যবিদ মাইরহোফ কায়রোতে থাকতেন৷ শিক্ষকবোর্ড এই থিসিস সম্পর্কে তাঁর মতামত জানতে চায়। তিনি বেশ দৃঢ়ভাবেই ডক্টর মুহিউদ্দিনকে সমর্থন করেন। জার্মান প্রাচ্যবিদ ব্যাপারটা বিখ্যাত ইতিহাসবিদ জর্জ সার্টনকে জানিয়ে দেন। ফলে তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ তারিখুল ইলমের শেষে এই বিষয়টাও যুক্ত করে দেন। ডক্টর মুহিউদ্দিন তাঁর গুরুত্বপূর্ণ থিসিসের মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এমন একজন আবিষ্কারককে স্বীকৃতি দেয় নি বলে তাদের বিরুদ্ধে নানা বিতর্ক তৈরি হতে থাকে। এই থিসিসের ফলে আধুনিক বিশ্ব নতুন ইবনুন নাফিসকে চিনতে পারে।

রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়াটির প্রথম আবিষ্কারক ইবনুন নাফিস, এটি একটি চূড়ান্ত সত্য। পনেরো শতকের ইতালিয়ান চিকিৎসা বিজ্ঞানী আলবাজু ল্যাটিন ভাষায় ইবনুন নাফিসের তাশরিহু শরহি কানুন গ্রন্থটি অনুবাদ করেন। আলবাজু প্রায় তিরিশবছরের মত রুহায় ছিলেন। এবং বেশ ভাল আরবি শিখে ফেলেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে আলবাজুর কাছ থেকে এই গ্রন্থের ‘রক্ত সঞ্চালনের প্রক্রিয়া’ নিয়ে আলোচনার অংশটুকু হারিয়ে যায়। অন্যদিকে মাইকেল সারভেদো তখন ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতেন। আলবাজুর করা এই অনুবাদ একসময় তার হস্তগত হয়। এভাবে মাইকেল সারভেদো রক্ত সঞ্চালনের এই আবিষ্কার সম্পর্কে জানতে পারেন। ইতোমধ্যে সারভেদো বিশ্বাসগত কোন কারণে ইউনিভার্সিটি থেকে বহিষ্কৃত হোন। পরবর্তীতে বিভিন্ন শহরে ঘুরে ঘুরেও স্থির হতে পারেন নি। নানা জায়গা থেকে তাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। শেষপর্যন্ত তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়।

তার সমস্ত বই আগুনে পুড়িয়ে জ্বালিয়ে দেয় ক্ষুব্ধ মানুষেরা। ঘটনাক্রমে আলবাজুর করা অনুবাদটুকু অক্ষত থাকে। গবেষকরা মনে করেন, মূলত এই অনুবাদের মাধ্যমেই মাইকেল সারভেদো নিজের মত বলে প্রচার করতে থাকেন। এরপরই উইলিয়াম হার্ভে জানতে পারেন। এবং তাঁর পক্ষে  পূর্ণাঙ্গভাবে আবিষ্কার সম্ভব হয়। ডক্টর মুহিউদ্দিনের থিসিস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে গবেষকদের কাছে৷ জার্মান প্রাচ্যবিদ মাইর হোফ ইবনুন নাফিসের বক্তব্য পড়ে বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি যখন ইবনুন নাফিসের বক্তব্য পড়লাম তখন একধরনের দ্বিধা সন্দেহে পড়ে গেলাম। কারণ হুবহু একইরকম কথা মাইকেল সারভেদোও বলেছেন। অথচ মাইকেল সারভেদো আদতে চিকিৎসাবিজ্ঞানী ছিলেন না। আবার ইবনুন নাফিস তার থেকে বেশ আগের মানুষ।’ কাজেই প্রথম আবিষ্কার যে ইবনুন নাফিসের হবে এত কোন সন্দেহ নেই। আলদু মিলী বলেন, ইবনুন নাফিস আর মাইকেল সারভেদোর বক্তব্য হুবহু এক। কাজেই এখান থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, প্রথম চিন্তা ও আবিষ্কার ইবনুন নাফিসের। মাইকেল সারভেদো বা উইলিমায় হার্ভে প্রথম আবিষ্কারক নয়।

ইবনুন নাফিস : ফিরে দেখা জীবন 

১২১০ খ্রিস্টাব্দে / ৬০৭ হিজরীতে সিরিয়ার দামেশক শহরে ইবনুন নাফিস জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরোনাম, আবুল হাসান আলাউদ্দিন আলি ইবনে আবিল হাজাম। খুব অল্প বয়সেই কুরআন হিফজ করেন। বাইশ বছর বয়স পর্যন্ত ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় অধ্যয়ন করে চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়েন ইবনুন নাফিস। মুসলিম সভ্যতার অন্যতম চিকিৎসাবিজ্ঞানী চক্ষুবিশেষজ্ঞ মুহাযযাবুদ্দিনের কাছে প্রাথমিক তালিম নেন। নুরুদ্দিন যিনকির প্রতিষ্ঠিত আননুরি হসপিটালেও তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র চর্চা করেন। ইবনুন নাফিস ৬৩৩ হিজরীতে মিশরের কায়রো চলে আসেন। আন নাসিরি হসপিটালে চিকিৎসক হিশেবে নিযুক্ত হোন।

পরবর্তীতে সুলতান কালাউনের প্রতিষ্ঠিত আল মানসুরি হসপিটালেও নিযুক্ত হোন। একসময় এই হসপিটালে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের প্রধান হয়ে উঠেন। তাঁর মজলিসে প্রতিভাবান চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের পাশাপাশি শহরের আমির উমারা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকতেন। ইবনুন নাফিসের যোগ্যতা দেখে সুলতান বাইবার্স তাঁকে ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিশেবে নিযুক্ত করেন। খুব অল্প সময়েই ইবনুন নাফিস সমস্ত মিশরের প্রধান চিকিৎসাবিজ্ঞানী হয়ে উঠেন। ইবনুন নাফিস  ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একইসঙ্গে চিকিৎসক, সাহিত্যিক, হাদিস বিশারদ ও ফিকহবিদ ছিলেন। হাদিস বিষয়ে তাঁর মৌলিক গ্রন্থ রয়েছে। তিনি কায়রোর আল মাসরুরি মাদরাসায় ফিকহে শাফেয়ির দরস দিতেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে তার অবদান 

ইবনুন নাফিস এনাটমি ও ফিজিওলজি কেন্দ্রিক বহু প্রাচীন ধারণার বিরোধিতা করেন। তিনি চিন্তার উদারতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। যা তাঁর কাছে ভুল মনে হতো তিনি সেটা অকপটে বলে দিতেন। এক্ষেত্রে কোন কুসংস্কার বা মানুষের বিরূপ প্রতিক্রিয়াকে ভয় করতেন না। মানবদেহের রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি, শ্বাসনালী, হৃৎপিন্ড, শরীরে শিরা উপশিরা,  বায়ু ও রক্তের প্রবাহ সম্পর্কে  নানা ধরনের নতুন তথ্য তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে যুক্ত করেন। চোখ সম্পর্কেও তিনি বিভিন্ন নতুন নতুন বিষয় মানবজাতিকে অবহিত করেন৷ তিনি বলতেন, চোখ হলো একটা যন্ত্রবিশেষ। চোখের নিজস্ব শক্তি দিয়ে দেখার ক্ষমতা নেই। যদি নিজের ক্ষমতা থাকত তাহলে দুচোখ দিয়ে আমরা প্রতিটি জিনিশকে দুটি করে দেখতে পেতাম। কিন্তু বাস্তবে তো তেমন হয় না।বরং চোখের সঙ্গে মস্তিষ্কের যোগাযোগ আছে।

অতিমাত্রার লবণ কেন ক্ষতিকর বা এর মন্দ প্রভাব কিভাবে পড়ে এই সম্পর্কেও সতর্ক করেন ইবনুন নাফিস। লবণের সুক্ষ্ণ সুক্ষ্ণ বেশকিছু বিষয় তিনি উল্লেখ করেন তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে। অতিমাত্রার লবণ ব্লাড প্রেশারের কারণ হতে পারে, চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি ইবনুন নাফিসই সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেছিলেন। কোন ওষুধ প্রয়োগ না করে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চিকিৎসা করার ব্যাপারে ইবনুন নাফিস বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। এবং কিছু ক্ষেত্রে এর সফল প্রয়োগ করতে তিনি সক্ষমও হয়েছিলেন।

লেখালেখি ও কল্পবিজ্ঞান 

লেখালেখির ক্ষেত্রে ইবনুন নাফিস উদ্ধৃতির চেয়ে নিজের বক্তব্য, চিন্তাকে উপস্থাপনের প্রতি গুরুত্ব দিতেন। তিনি আর রিসালাতুল কামিল ফি সিরাতিন নাবি নামে একটা কাল্পনিক উপন্যাস লিখেছেন। এটিকে আরবি সাহিত্যের প্রথম দিকের মৌলিক উপন্যাস হিশেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর নিজের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক মতবাদ প্রকাশ করার জন্যই তিনি এই গ্রন্থটি রচনা করেন। ইবনুন নাফিস শরীরবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত বিভিন্ন মতাদর্শ এই বইয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেন। এই বইটি সায়েন্স ফিকশনের অন্যতম একটি উদাহরণ। তিনিই মুসলিমদের মধ্যে সর্বপ্রথম সায়েন্স ফিকশন রচনা করেন। এছাড়া ইবনুন নাফিসের প্রচুর লিখিত গ্রন্থ আছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে। যেগুলো এখনও পর্যন্ত আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।

ইবনুন নাফিস রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার প্রথম আবিষ্কারক ছিলেন। এর বাইরেও নানা ধরনের শক্তিশালী উদ্ভাবন তাঁর রয়েছে। এরপরও তাঁর কাজ অতোটা বিস্তৃতভাবে ছড়ায় নি কেন? ইতিহাসবিদদের কাছে এই প্রশ্নটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসবিদরা বিজ্ঞানকে আলাদা করে দেখতে রাজি না। তারা মনে করেন, বিজ্ঞানের জন্য রাজনীতি এবং অর্থনীতি দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কেবল বিজ্ঞানের আবিষ্কার দিয়েই পৃথিবী চলতে পারে না। বিজ্ঞানের বাস্তবায়নের জন্য দরকার রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও সমর্থন এবং একইসঙ্গে  বিপুল অর্থ।

ইবনুন নাফিস যেই সময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের জন্য নিজের সবটুকু প্রতিভা ব্যয় করেছিলেন তখনকার পৃথিবী ছিল খুব দুর্যোগপূর্ণ। নানা ধরনের অনৈতিকতা ভোগ বিলাসসহ সমস্ত রাষ্ট্র নীতিহীন নগরে পরিণত হয়েছিল। মানুষের কাছে ভোগ বিলাসই প্রধান হয়ে উঠেছিল। গৃহযুদ্ধসহ বিভিন্ন রকমের পারিবারিক সামাজিক কলহে মানুষ ব্যস্ত ছিল। ফলে ইবনুন নাফিস ও তাঁর বিপুল কর্ম এতসব অনৈতিকতার ভীড়ে আড়ালেই পড়ে গেছে। রাষ্ট্রপক্ষ বা সমাজপক্ষ কোন বৈজ্ঞানিক সফলতার প্রতি দৃষ্টি ফেরাবার সুযোগ পায় নি।

সাধকের মৃত্যু 

১২৮৮ খ্রিস্টাব্দে ইবনুন নাফিস বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। চিকিৎসকরা কোনভাবে রোগ সারাতে পারছিলেন না। শেষে প্রতিষেধক হিশেবে মদপানের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনভাবেই মদপান করেন নি। “আমার পেটে সামান্য পরিমাণ মদ নিয়ে আমি কি করে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করব? ” এই বাক্য বলে তিনি মদপান থেকে বিরত ছিলেন। ১৮ ডিসেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। ইবনুন নাফিস অবিবাহিত ছিলেন। তিনি বাড়ি, লাইব্রেরীসহ সমস্ত সম্পত্তি আল মানসুরি হাসপাতালে দান করেন।

সূত্র: কিসসাতুল উলুমিত তিব্বিয়্যাহ ফিল হাজারাতিল ইসলামিয়্যাহ। রাগেব সারজানী।

আগের সংবাদইসলামি সভ্যতায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা
পরবর্তি সংবাদক্যাপ্টেন মাজেদের ফাঁসি কার্যকরে প্রস্তুত ১০ জল্লাদ