ঢাকা অবরোধ : ক্ষোভ ও সুখস্মৃতির সাত বছর

মাহবুব ওয়াসেল:

২০১৩-এর ৫ মে ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এবং নৃশংসতাপূর্ণ একটি দিন। নাস্তিক্যবাদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা হেফাজতে ইসলামের গণজাগরণ চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল এ দিনে। ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে লাখ লাখ মুসল্লির সরব উপস্থিতিতে রাজধানীর রাস্তা-ঘাট, অলিগলি কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা মুসলিমদের অন্তরে কতটা প্রগাঢ়ভাবে থাকতে হয়, তার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধে অংশগ্রহণকারী তৌহিদি জনতা।

অবরোধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সুখের স্মৃতি যেমন কাজ করে, তেমনি কারো কারো মাঝে কাজ করে ক্ষোভের স্মৃতিও। ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর থেকে আমরা কথা বলেছিলাম কয়েকজনের সঙ্গে। শুনেছিলাম তাদের সুখস্মৃতি এবং ক্ষোভের গল্প।

৫ মে হেফাজতের অবরোধে মৌলভীবাজার থেকে এসে শাপলা চত্বরে শরিক হয়েছিলেন মাওলানা জিয়া উদ্দীন। শাপলার ভয়াবহ কালো রাতে তিনি গুলিবিদ্ধও হয়েছিলেন। তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ‘নবিজির যে শান ও মান আল্লাহ তাআলা দান করেছেন দুনিয়া ও আখেরাতে, কোনো ধর্মবিদ্বেষী বা নাস্তিক-মুরতাদ কটূক্তি করে তার বিন্দুমাত্রও কমাতে পারবে না। কিন্তু নবিজির প্রতি প্রকৃত প্রতিটা মুসলমানের হৃদয়ে অন্যরকম এক ভালোবাসা প্রোথিত, তাই নবিজির শান নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে তাদের শরীরে আগুন ধরে যায়। নবিজির শানে নূন্যতম বেয়াদবিও কোনো মুসলমান সহ্য করতে পারে না। আর সহ্য করতে না পারাটাই ঈমানের দাবি। হেফাজতে ইসলামের আহ্বানে আমরা এ কারণেই জেগে উঠেছিলাম।’

নিজের গুলিবিদ্ধ হবার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে মাওলানা জিয়া বলেন, ‘এটা আমার জীবনের পরম সৌভাগ্য হিসেবেই আমি জ্ঞান করি। নবিজির শত্রুদের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে গুলিবিদ্ধ হয়েছি, রক্ত ঝরাতে পেরেছি, এটা ভাবলে আমি তৃপ্তি বোধ করি। নবিজির জন্য ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে যদি জীবনটাও যদি চলে যেত, কোনো পরোয়া ছিল না। বরং এ আমার আরও বড় সৌভাগ্য এবং নাজাতের ওসিলা হতো।’

৫ মে ঢাকা অবরোধের দিন আহত হন চট্টগ্রামের মাওলানা ওয়াহিদুর রহমান। ঘটনার দিন তার ডান পায়ের রগ ছিঁড়ে যায়। ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে তিনি জানালেন, ‘আমি আহত হয়েছি তাতে কোনো ক্ষোভ নেই। তবে সারাজীবনের জন্য আমি আমার পা হারালাম। ক্ষোভের জায়গা হলো—এতবড় আন্দোলন ব্যবস্থাপনা এলোমেলো ছিলো।’ এলোমেলো দ্বারা তিনি কী উদ্দেশ্য নিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বুঝাতে চাইছি—কোথায় কখন জমায়েত হবে, কতক্ষণ জমায়েত থাকবে, আহত-নিহতরা কোথায় যাবে এ সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলো স্পষ্টই ছিলো না। ফলে দেখা গেছে অনেক আহত-নিহত পরিবার একাকী ভুগেছে। হেফাজতের উচ্চ মহল থেকে কোনো খবর নেয়া হয়নি।’

ঢাকা অবরোধের সাত বছর পেরিয়ে গেছে। যদিও বিরাট এক ট্রাজেডি ঘটে গেছে ৫ মে’র রাতে, কিন্তু কতটুকু সফল হয়েছে হেফাজতে ইসলামের এই আন্দোলন?

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ঢাকা মহানগরীর অন্যতম নেতা ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ একাংশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া মনে করেন নাস্তিক্যবাদ প্রতিরোধে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ অনেকাংশেই সফল। তিনি বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম তখনই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল যখন ইসলাম, মুসলমান ও নবি কারীম (সা.) এর শানে কটূক্তি শুরু হয়েছিল। এগুলো হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের কারণে বন্ধ হয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকারও বাধ্য হয়েছে কিছু লোককে গ্রেফতার করতে। নাস্তিক ব্লগারদেরও ঔদ্ধত্য বন্ধ হয়েছে। এদিকে দিয়ে হেফাজত সফল। সেইসঙ্গে পাঠ্যপুস্তক থেকে আপত্তিকর বিষয়গুলো ও থেমিস দেবির মূর্তি সরাতেও সরকার বাধ্য হয়েছে। এগুলো হেফাজতের সফলতা। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে ইসলামের নামে প্রকাশ্যে কটূক্তি করা বন্ধ হয়েছে।’

এ বিষয়ে ইসলামি ঐক্যজোটের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন মনে করেন, ‘হেফাজতের আন্দোলনের ফলে নাস্তিক্যবাদরে প্রবণতা না কমলেও নাস্তিক্যবাদের জোয়ার ও আস্ফালন কমেছে। তাদের এগ্রেসিভ মনোভাব ও ইসলামের বিষয় নিয়ে অপপ্রচার, এগুলো কমেছে। এসব ক্ষেত্রে হেফাজতে ইসলাম অনেক সফল। এ আন্দোলনের পর ওলামাদের কদর বেড়েছে। এখন ওলামাদের এ কদরকে সযত্নে আগলে রাখতে হবে। এ কদরকে অযত্নে ফেলে দেওয়া বা নানা জায়গায় ব্যবহার করার ঠিক হবে না। ইসলামের কল্যাণেই ব্যবহার করতে হবে।’

আগের সংবাদঅবরুদ্ধ কাশ্মীরের ছবি তুলে পুলিৎজার জিতলেন তিন কাশ্মীরি সাংবাদিক
পরবর্তি সংবাদকরোনায় আরও এক পুলিশের মৃত্যু