
মুজাহিদুল ইসলাম:
লৈঙ্গিক বিচারে নারী পুরুষ এই দুই প্রকারে মানব জাতি বিভক্ত। সমাজ ও জীবনের স্বাভাবিক প্রয়োজনে প্রত্যেক মানুষই নিজেকে পুরুষ কিংবা নারী হিসেবে পরিচয় প্রদান করে। কিন্তু আবহমান কাল থেকে কখনো এমন সন্তানের জম্ম হয়ে আসছে, যার লৈঙ্গিক পরিচয়-নির্ধারণ জটিল হয়ে পড়ে। বিদ্যমান সমাজে হিজড়া নামে পরিচিত এই জনগোষ্ঠী।
অবশ্য এদেরকে লিঙ্গ প্রতিবন্ধী বলাই শ্রেয়। কারণ, সব মানুষই নিখুঁত নয়, কারো হাত নাই, কারো পা নেই, কেউ চোখে কম দেখে, কেই কানে শোনেই না, কেউ কথা বলতে পারে না, কারো বুদ্ধি কম। এদের আমরা প্রতিবন্ধী বলি। হিজড়ারাও এক ধরনের প্রতিবন্ধী, তারা লিঙ্গপ্রতিবন্ধী। নারী পুরুষের বাহিরে লিঙ্গ-বৈচিত্রের এই মানবধারার বিষয়টি নারী ও পুরুষের দেহের অসামঞ্জস্যতার কারণে হয়। অনেক সময় জন্মের পরও হরমোনের তারতম্যের কারণে নারী পুরুষ প্রকৃতির মাঝখানে তৃতীয় আরেকটি লিঙ্গের সৃষ্টি হতে পারে। শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হলেও কেউ হিজড়া হতে পাতে পারে। আবার আতংক থেকেও হিজড়া হওয়ার বিষয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন।
হিজড়ারের বিষয়ে ইসলাম তার দৃষ্টিভঙ্গি সুবিস্তার ও বিন্যস্ত আকারে সংরক্ষণ করেছে। সমাজে ধর্মীয় জ্ঞানের অপ্রতুলতায় তা সংশ্লিষ্টদের সামনে অনাগত। হিজড়াদের সামাজিক মর্যাদা ইসলাম নিশ্চিত করেছে। লিঙ্গপ্রতিবন্ধীরা পরিবারের অন্য সকলের মতো বাস করবে। পড়ালেখা করবে। লিঙ্গপ্রতিবন্ধী হওয়া কোন অপরাধ নয়, এতে নেই লজ্জার কিছু। নবী যখন মদীনায় আসেন, নারী সন্তান জন্মদান করা একজন নারীর জন্য তা ছিল লজ্জাজনক। কিন্তু এটা ছিল সামাজিক ব্যাধি। তা ইসলাম উপশম করেছে। বাস্তব বিষয় হলো, লিঙ্গপ্রতিবন্ধীকে শৈশবেই প্রচলিত ধারার বিপরীতে চলার কারণ উদঘাটন করে যথাযথ চিকিৎসা দিলে তার প্রতিবন্ধকতা সেরে ওঠার সম্ভাবনাই বেশি।
কথিত ট্রান্সজেন্ডার
সমাজে এই লিঙ্গপ্রতিবন্ধীদের লৈঙ্গিক পরিচয় নির্ধারণের জটিলতা নিরসনে নতুন পদ্ধতি নিয়ে বর্তমান বাজারে হাজির হয়েছে এক পদ্ধতি। সার্জারির মাধ্যমে নারীর পুরুষ হওয়া এবং পুরুষের নারী হওয়া। এটার প্রয়োজনীয়তা ঠিক কতখানি, তা নিয়ে খোদ গবেষণার পাদপীঠ মার্কিন মুলুকের বিজ্ঞানীদের ভেতর রয়েছে বিস্তর বিবাদ। এ ধরনের সার্জারির পক্ষে যারা আছেন, তারা মানুষের লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণে কথিত স্বাধীনতার দাবি তোলেন। একজন লিঙ্গপ্রতিবন্ধী ঠিক কী লিঙ্গপরিচয় ধারণ করবে, তা সে নিজেই নির্ধারণ করার অধিকার রাখে। কিন্তু আসলেই ভুক্তভোগী কি প্রকৃত এ ধরণের সমস্যার শিকার হয়েছে কি হয়নি, সে বিষয়ে তারা যথাযথ কোন কারণ দেখানো ছাড়াই সামাজিক ও মানসিক চাপ তৈরি করে। এবং সমাধানযোগ্য উদ্ভূত সমস্যাকে স্থায়ী সমস্যায় রুপান্তরিত করেন। তাছাড়া প্রাকৃতিকভাবে পুরুষ কিংবা নারী-বৈশিষ্ট্য থেকে অবমুক্ত হওয়াও বেশ কঠিন। নারী পুরুষের মধ্যে ন্যূনতম ছয় হাজার পাঁচশত জেনেটিক ভিন্নতা আছে। এই ভিন্নতা হরমোন, দেহ, কাঠামো, পেশী ও যৌনাঙ্গসহ সবকিছুতে প্রকাশিত হয়। সার্জারির পরেও জন্মগত মানবীয় গুনাবলী থেকে মুক্ত না হওয়ার একটি ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে।
রুপান্তরিত বক্সার নারী
২০১৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্টের বিখ্যাত বক্সার ফ্যালন ফক্স সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করেন, তিনি পুরুষ থেকে নারীতে রুপান্তরিত। সে পুরুষ হিসেবেই জন্মগ্রহণ করেছে। কিন্তু শৈশব থেকেই পুরুষ অবয়বে এক নারীচিন্তাকে লালন করছিলো। যেহেতু ফ্যালন নারীদের কাতারে থেকেই বিভিন্ন ইভেন্টে অংশগ্রহণ করতেন, এটা নারীদের মধ্যে বেশ সমালোচনা সৃষ্টি করে। যদিও পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ক্লাব তাকে নারীদের সাথে থেকেই সকল ইভেন্টে অংশ নেয়ার অনুমতি প্রদান করে। তবে এ ঘোষণার মাত্র এক বছরের মধ্যে ফ্যালন ট্যামিকা নামক অপর নারী বক্সারের সাথে সে একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু ইভেন্টের মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে ট্যামিকা চরমভাবে পরাস্ত হয়। তৎক্ষনাৎ তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এবং সাতটি সার্জারি করা হয় তার। ট্যামিক পরবর্তীতে জানান, ”জীবনে আমি এতটা নির্দয় আঘাত কখনো খাইনি। অনেক নারীদের সাথে আমি লড়াই করেছি, কিন্তু ঐ রাতে যে শক্তির মুখোমুখি আমি হয়েছি, তার আর কখনো হইনি। জানি না, ফ্যালন পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছে, এজন্যই নাকি! তবে আমি যা জানি, আমি আমার ক্ষেত্রে একজন শক্তিশালী নারী বক্সার। তবে জীবনে এতটা পরাজয় আমি অনুভব করিনি।”
মার্কিন লেখিকা অ্যাশলি কথিত স্বাধীনতা ও অগ্রগতির নামে এ ধরনের সার্জারি বিষয়ে বলেন, বর্তমানে লৈঙ্গিক পরিচিতি নির্ণয়টা ব্যক্তির ইচ্ছাধীন বিষয় হয়েছে। কিন্তু এটা প্রয়োগিক বিজ্ঞানপরিপন্থী। প্রখ্যাত মার্কিন মনোচিকিৎসক বোল ম্যাকহু বলেন, ”ট্রান্সজেন্ডারের জন্য মানবাধিকারের দাবি তোলা প্রকৃতপক্ষে মানসিক অস্থিরতাকে আরো উস্কে দেওয়া।”
মার্কিন শিশুচিকিৎসক মিশেল তার চিকিৎসা জীবনের একটি ঘটনা তুলে ধরে বলেন, একবার এক নারী তার পুত্র সন্তানকে নিয়ে আমার নিকট এলো। তার যখন তিন থেকে পাঁচ বছর চলছিল, সে মেয়েদের খেলনা নিয়ে খেলা করতো। এবং শিশুটি বলা শুরু করলো, সে মেয়ে। তার পিতামাতা তাকে এ কাজে উৎসাহিত না করে সোজা ডাক্তারের নিকট নিয়ে যায়। পরবর্তীতে দেখা যায়, পুত্র সন্তানটি পারিবারিক সমস্যার শিকার।
শিশুটি একবার তার ব্যবহৃত মেয়েদের খেলনার রেখে দিয়ে বললো, আমার আব্বু আম্মু আমাকে পছন্দ করে না। ডাক্তার পারিবারিক কিছু খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো; বাড়িতে একটি প্রতিবন্ধী মেয়ে শিশু আছে। বাবা-মা তার জন্য বিশেষ যত্ন নেয়। পুত্র সন্তানটির প্রতি ঠিক ততটা যত্ন নেয়া হয় না কিংবা লাগেও না। এটা শিশুর মনোজগতে প্রভাব ফেলেছে যে, সেই বোনের মতো সাজগোজ করলে আব্বু আম্মু আমাকে পছন্দ করবে।
ডাক্তার মিশেল বলেন, দেখুন, বর্তমান সময় যদি হতো, ঐ শিশুটির বাবা-মা এ ধরনের কিছু শুনেই হয়তো বলতো, এটা বাচ্চার ইচ্ছে। ওর যা-মন চায়, নির্বাচন করবে। সে কী হতে চায়, এটা একান্তই তার বিষয়। এজন্য তারা তার নাম পরিবর্তনও করতো।
কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক দাবি করেন, প্রতি ২৫ জন ট্রান্সজেন্ডার নারীর মাত্র তিনজন শৈশবে লৈঙ্গিক পরিচয়ে সমস্যার শিকার হয়েছে, অবশিষ্ট ২২ জনের বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় তারা সুস্থ থেকেও এখন স্থায়ী অসুস্থতার শিকার হয়েছেন। কারণ, ট্রান্সজেন্ডারদের ভেতর আশংকাজনক হারে আত্মহত্যার প্রকোপ দেখা যায়। লিঙ্গপ্রতিবন্ধী ও ট্রান্সজেন্ডারদের মধ্যে ট্রান্সজেন্ডারদের মধ্যে আত্মহত্যার হার উনিশ গুণ বেশি।
সুইডেনের কারলুনিসকো তাদের ত্রিশ বছর মেয়াদী এক গবেষণাকর্মে দাবি করেন, পরিবর্তিত ব্যক্তি দশ বছরের মধ্যেই মারাত্মক মানসিক সমস্যার শিকার হয়।
কারলোস ফ্লোরসের গবেষণায় বলা হয়, শরীরে যতই নতুন অঙ্গ যুক্ত করা হোক না কেন, কিংবা নারী ও পুরুষের অর্গান যুক্ত করা হোক, নারীকে পুরুষ কিংবা পুরুষকে নারী করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। হ্যা, কিছুটা স্বভাবে পরিবর্তন হয়তো হবে।
”ট্রান্সজেন্ডার সমাধান নয়” শিরোনামে বোল ম্যাকহু বলেন, গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকরা জনগণকে এবং ট্রান্সজেন্ডারদেরকে প্রকৃতপক্ষে কিছু দিতে পারেনি। মানসিক সাপোর্টও নয়।
বাস্তবে অযৌক্তিক দাবি করে প্রকৃতিপ্রদত্ত সমাজ ভেঙ্গে দিয়ে মানবতার বিকৃতিই এখন তক এই ট্রান্সজেন্ডারের ফলাফল। এবং যার বলি হচ্ছে প্রপাগান্ডার শিকার তরুণ-তরুণী ও কিশোর-কিশোরী।
