
|| তাসনিফ আবীদ ||
বাংলাদেশে বিদেশি আলেমদের আগমন নতুন কিছু না। যুগ যুগ ধরেই এদেশে বিভিন্ন দেশের আলেমদের আগমন লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে কওমি মাদরাসা কেন্দ্রিক বছরের নানা উপলক্ষ যেমন, খতমে বুখারি, ওয়াজ-মাহফিল, ইসলামি জলসাসহ বিভিন্ন আয়োজনের মসনদ অংকৃত করেন বিশ্বখ্যাত স্কলারগণ।
বিদেশি স্কলারদের বাংলাদেশে আগমনের তালিকা যদি সামনে রাখা হয় তাহলে দেখা যাবে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে যে দেশের আলেমরা আসছেন, এরমধ্যে ভারত প্রথম দিকে। এক সময় ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান থেকেও বড় বড় আলেমরা আসতেন এদেশে। তাদের সোহবতে ধন্য হতো মানুষজন। কিন্তু এখন কেন পাকিস্তানের আলেমদের বাংলাদেশে আসতে তেমন দেখা যায় না? এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম রাজধানীর মিরপুরের জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়ার কাছে।
দেশের যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক সম্মেলন, খতমে বুখারি, সেমিনার ও ইসলাহি সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি বিদেশি আলেমদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় এরমধ্যে আরজাবাদ মাদরাসা অন্যতম। প্রাচীনতম এই প্রতিষ্ঠানটির মুহতামিম বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বর্তমানে পাকিস্তানের ভিসা পলিসি খুব কঠিন। তাই আগের মতো যে কাউকে চাইলে সহজে আনা যায় না।
‘তাছাড়া এখন তাদের সঙ্গে আমাদের দেশের সরাসরি কোনো ফ্লাইটও নেই। দুবাই, কাতার বা শ্রীলঙ্কা হয়ে যাতায়াত করতে হয়। যা অনেক খরচ এবং পেরেশানির বিষয়। পাশাপাশি সরকারি কিছু পলিসির বিষয় আছে। এসব বিষয় নিয়ে কথা না বলাই ভালো।’ যুক্ত করেন তিনি
পাকিস্তানের আলেমদের যাতায়াত বাংলাদেশে স্বাভাবিক করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া যায় কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর জন্য প্রয়োজন দুই রাষ্ট্রের মাঝে সম্পর্ক সহজ হওয়া। রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি ভিসা প্রসেসিং ও যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হয় তাহলে এমনিতেই পাকিস্তানের আলেমদের উপস্থিতি বাংলাদেশে বাড়বে। দুই রাষ্ট্রের মাঝে এসব বিষয় সহজ করার উদ্যোগ নেওয়ার আগে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো বিষয় উত্থাপিত হলে বিষয়টি নেতিবাচক কোনোকিছু বয়ে আনতে পারে।
এদিকে সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিক্স বাংলাদেশ বসুন্ধরা ঢাকা’র নির্বাহী পরিচালক ও গবেষক আলেম মুফতি শাহেদ রহমানীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম বিষয়টি নিয়ে। তার বাবা ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আব্দুর রহমান রহ. জীবিত থাকাকালীন আল্লামা আব্দুল মাজিদ নাদিম রহ., আল্লামা রফি উসমানী রহ. ও আল্লামা তাকি উসমানী হাফিজাহুল্লাহসহ পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের প্রায় সময়ই বাংলাদেশে নিয়ে আসতেন। কিন্তু এখন পাক ওলামায়ে কেরামের বাংলাদেশে আগমন কমে যাওয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, কোনো দেশের আলেমরা তো আর নিজে থেকে আসেন না। তাদেরকে উদ্যোগী হয়ে নিয়ে আসতে হয়। এখন উদ্যোগ নেওয়ার মতো তেমন কেউ নেই। বাংলাদেশে যেসব বড় বড় মুরুব্বি ছিলেন তারাও দুনিয়া থেকে চলে গেছেন এবং পাকিস্তানের বড় বড় আলেমরাও চলে গেছেন। এখন দু’দেশের আলেমদের মাঝে তাই একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
‘পাকিস্তানের শীর্ষ আলেমদের মাঝে বেঁচে আছেন আল্লামা মুফতি তাকি উসমানি। তিনিও বয়সের কারণে এখন আর তেমন সফর করেন না। সৌদি আরবে ওমরা ও সেখানের কিছু সংস্থার কাজে যেতে হয়। তাও তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণে যেতে পারেন না। এছাড়া আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করে মাওলানা হানিফ জালান্দারিকে গত বছর দুইবার এনেছিলাম।’ -যুক্ত করেন তিনি
পাকিস্তানের ওলামায়ে কেরাম কম এলেও ভারতের অনেক আলেমকেই বিভিন্ন ইসলামি কনফারেন্সে আসতে দেখা যায়। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘দেওবন্দে যারা পড়াশোনা করেছেন তাদের বড় একটি অংশ এখনও জীবিত। তাছাড়া তরুণদের মাঝে দারুল উলুম দেওবন্দে পড়াশোনা করেছে এমন অংশও কম নয়। তাই তারা উদ্যোগী হয়ে তাদের উস্তাদদেরকে ফুজালা হিসেবে দাওয়াত দেন। কিন্তু পাকিস্তানে পড়ুয়া আলেমের সংখ্যা তো অনেক কম। ফুজালাও কম। তাই তাদের উস্তাদদের দাওয়াত দেওয়ার মানুষও কম।
‘পাকিস্তানে যারা লেখাপড়া করেছেন তাদের হার দিন দিন কমছে। তরুণরাও ভিসা জটিলতার কারণে সেখানে পড়াশোনার জন্য যেতে পারছেন না। সরাসরি ভিসা নেই। বিভিন্নভাবে ভিসা ম্যানেজ হলেও খরচ আকাশচুম্বি। তাই ইচ্ছে থাকলেও সম্ভব হয় না। এর বিপরীতে ভারত আমাদের সঙ্গে। যেতে খরচ কম। যাওয়াও সহজ। তাই সেখানের ফুজালাও বেশি। এভাবে দেওবন্দসহ ভারতের মাদরাসাগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটাও এখনো চমৎকার আছে।’ –উল্লেখ করেন তিনি
পাকিস্তানের বড় বড় আলেমদেরকে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে আনার জন্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা যায় কী না? তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো জোড়ালো করা যায় কীভাবে? এমন প্রশ্ন করলে মুফতি শাহেদ রাহমানী বলেন, আলেমগণ যেকোনো দেশেরই হোক নিজেদের মাঝে সম্পর্ক থাকা, নিজেদের মাঝে চেনা-জানা থাকা খুব প্রয়োজন। বিশেষ করে উপমহাদেশের আলেমদের মাঝে আসা-যাওয়ার একটা সম্পর্ক থাকা, ইলমি সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।
বিশেষ করে সার্কভুক্ত যে দেশগুলো আছে (বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান এবং আফগানিস্তান) তাদের ব্যবসায়ীদের একটা কমিউনিটি আছে। দেশগুলোর মাঝে সাংস্কৃতিক, খেলাধুলা, বিনোদন কমিউনিটি আছে। সার্কের যারা যা নিয়ে কাজ করছে তারা নিজেদের মতো একটি কমিউনিটি করে নিজেদের মাঝে একটি রিলেশন তৈরি করেছে। সে হিসেবে সার্কভুক্ত দেশের আলেমরা ‘সার্ক ওলামা কাউন্সিল’ গঠন করতে পারেন। এটা প্রতিটি দেশের সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে তৈরি হতে পারে। নিজেদের সম্পর্ক, শিক্ষাসিলেবাস, গবেষণা বিষয়ে নলেজ শেয়ার করতে পারে। এর ফলে উপমহাদেশে আলেমদের চিন্তা-চেতনা আরো সমৃদ্ধ হবে। নিজেদের মাঝে কমিউনিটি থাকার ফলে অনেক বিষয় সহজ হয়ে যাবে।
এদিকে বাংলাদেশে বিদেশি স্কলার এনে বিভিন্ন প্রোগ্রাম, সেমিনার ও অনুষ্ঠান করে থাকেন এমন কয়েকজন আলেমের সঙ্গে কথা হয় ‘বর্তমানে পাকিস্তানের আলেমদের বাংলাদেশে আসার হার কমে যাওয়া’র বিষয়ে। তাদের কথায় সরকারী নানা বিধি-নিষেধ ও জটিলতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে তারা বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে রাজি হননি।
