
ঢাকা শহরে একটা পাখিই সচরাচর চোখে পড়ে। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার এই পাখিটিকে কেউ পাখি বলে ডাকে না। দশটি পাখির নাম বলুন, এই প্রশ্ন করলে কি কেউ কাকের নাম বলবে? কি জানি, হয়ত বলবে। তবে হ্যাঁ, কাকও একটি পাখি। ঢাকা শহরের গল্প লিখতে গেলে কাকের নাম এসেই পড়ে।
হুমায়ূন আহমেদের গল্পে কাককে দেখা যায় নানারুপে। কাক মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি বসবাস করা মজার এক নাগরিক চরিত্র। তার এক গল্পের ভদ্রলোক কাক পুষেন। লোকটির ভয়ংকর দিনগুলিতে পোষা কাকটি তাকে দিকনির্দেশনা দেয়। অপর একটি গল্পে দেখা যায়, আরেক নিঃসঙ্গ শিল্পী প্রতিদিন সকালে দুই কাপ চা এনে একটি কাপ জানালার কাছে রাখেন। প্রতিদিন একটি কাক সেই কাপে ঠোট ডুবিয়ে চা খায়।
গল্পগুলি পড়তে পড়তে পাঠক হাসেন। কিন্তু আমার কাছে সবসময় এটা হাসির গল্প মনে হয় না। কেন যেন মনে হয়, কাকের প্রতি লেখক এক অপার্থিব মমতা বোধ করেন।
বাংলাদেশে মূলত দুই ধরণের কাক পাওয়া যায়। কালো চুলে ঝলমলে দাঁড়কাক। এদের শরীরের গ্রোথ বেশ উন্নত। এবং এরা গ্রামের অধিবাসী। আরেক প্রকৃতির কাক আছে, রঙচটা শহুরে কাক। ঢাকার পথেঘাটে এদের দেখা মিলে। চোখের দৃষ্টি দাঁড়কাকের মতই নির্মল। রঙচটা গায়ের লোম, গম্ভীর হাটার ভঙ্গি, কেমন ঘরপলানো বিবাগী চলন। সব মিলিয়ে একটা দার্শনিক ব্যাপার স্যাপার লক্ষ্য করা যায় এদের মাঝে। সব কাকই দার্শনিক প্রকৃতির না। কাকের মধ্যে একটা দল আছে, যারা যোদ্ধা ও স্বাধীনচেতা।
কাকের জীবন খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। স্বচক্ষে না দেখলে এরকম গল্প কেবল গল্পই মনে হত। মুহাম্মদপুর থাকাকালীন সময়ে আমাদের মাদ্রাসার পেছনে একটা নারিকেল গাছে একটি কাক বাস করত। কাকটির ছিল সদ্য ফোটা তিনটি ছানা। ছানাগুলি সারাক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকত। আর একটু পরপর বড় কাকটি এসে ছানাদের খাইয়ে যেত। এদেরকে দেখতে খুব ভাল লাগত।
কাকটার ছিল মসৃণ চুল। ঘাড়ের কাছে সবে ধুসর হয়ে উঠতে শুরু করেছে। একদল দুষ্ট ছেলে ছানাগুলি তুলে আনার পরিকল্পনা করল। বড় কাকটি যতক্ষণ বাসায় থাকে ততক্ষণ কিছুতেই সম্ভব হয় না। তাই কাকটি চলে যাবার পর চেষ্টা করল। কিন্তু বাসায় ছোয়া লাগতেই কোত্থেকে যেন বড় কাকটি উড়ে আসত। এরপর বাচ্চারা ঢিল ছোড়া শুরু করল। কাকটিও বসে রইলো না। যারা যারা ঢিল ছুড়েছিল এদের লক্ষ্য করে উড়ে এসে মাথায় এলোপাথাড়ি ঠোকর দিতে চাইত। ছেলেরা কোনমতে লুকিয়ে যেত। এমন সাহসী কাকও হতে পারে কখনো কল্পনা করিনি।
নাগরিক এই পাখিটি বড় দয়াদ্র। কোথাও মানুষ মারা গেলে এরা ছুটে আসে। কিংবা কোথাও মরদেহ পড়ে থাকলে এরা সেখানে আকাশ কালো করে নেমে আসে। চারপাশে ভিড় করে তীব্র গলায় কা কা করে। কা কা করে কি কিছু বলতে চায়? কি জানি, কাঁদে হয়ত।
