
ওমর ফারুক
স্বার্থের জন্য ধর্মের ব্যবহার নতুন কোনো বিষয় নয়। সর্বকালেই স্বার্থবাদীরা ধর্মের ব্যবহার করে আসছে। তুলনামূলক রাজনীতিতেই ধর্মের ব্যবহারটি বেশি হয়ে থাকে। যদিও ব্যক্তি জীবন বা সমাজ জীবনে এ বিষয়টির প্রকাশ ততোটা ঘটেনি। তবে মানুষকে কাছে টানার জন্য বা বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য কিংবা নিরাপদ থাকার জন্য অনেকেই তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা শিল্প প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করে থাকেন বা ইসলামের নিদর্শনাবলীর নাম ব্যবহার করেন। আবার অনেকে আবেগ অনুভূতি বা বরকত লাভের জন্যও ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করেন। তবে বিষয়টি যখন উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে ধরা দেয় কিংবা বেমানান বলে মনে হয় তখনই প্রশ্ন সৃষ্টি হয়।
সম্প্রতি এমনই এক প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে রাজধানীতি ধাক্কা মেরে দুই শিক্ষার্থীকে হত্যায় অভিযুক্ত বাস পরিবহন কোম্পানি ‘জাবালে নূর’। ভাঙচূড় ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে কোম্পানিটি এখন নাম পরিবর্তন করে ‘আল মক্কা পরিবহন’ করতে যাচ্ছে। শুধু বাস কোম্পানি নয়, অনেক প্রতিষ্ঠানই এ ধরণের ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করে থাকে।
গত কয়েক বছর আগে যত্রতত্র প্রস্রাব ঠেকানোর জন্য ধর্মমন্ত্রণালয় দেয়াল লিখনে আরবি শব্দের ব্যবহার শুরু করেছিল। আরবি ভাষা পবিত্র কোরানের ভাষা, তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে আরবি ভাষার ব্যাপারে একটা সম্মান ও ভীতির অনুভূতি কাজ করে, দেয়ালে আরবি লেখা দেখলে সেখানে লোকের প্রস্রাব করবে না এই ভাবনা থেকেই এ উদ্যোগ নিয়েছিল ধর্মমন্ত্রণালয়। যদিও এ উদ্যোগ তেমন একটা সাড়া ফেলেনি।
শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই বিভিন্ন ধর্মের মানুষরা ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা কল কারখানায় নামেন। তবে বিষয়টি তখনই বিতর্ক জন্ম দেয় যখন শব্দটির ব্যবহার হয় বেমানান ও দৃষ্টিকটু। আল মক্কা বা আল মদিনা এসব ঐতিহাসিক স্থানগুলোর নাম পরিবহন সেক্টরে ব্যবহার করার উদ্দেশ্য বা রহস্য কী? বিষয়টি কী দৃষ্টিকটু নয়? এমন কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে কথা হয়েছিল দেশের দুই ইসলামি আইনবিদ ও আলেমের সঙ্গে।
এ বিষয়ে রাজধানী মুহাম্মদপুরে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ মসজিদের ইমাম ও খতিব, টিভি আলোচক মুফতি মুহাম্মদ মহিউদ্দীন বলেন, ইসলামের এমন সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ নামসমূহ এ ধরণের কাজে ব্যবহার করা কোনোভাবেই উচিত নয়। এগুলো ইসলামের নিদর্শন। ইসলামের নিদর্শন ব্যবহার করে মতলব হাসিল করা গর্হিত ও মাকরূহ পর্যায়ের। এ ধরণের নাম ব্যবহার করে পার পাওয়া যাবে না। যদিও অনেকে বরকত লাভের জন্য এ ধরণের নাম ব্যহার করে। তবে এড়িয়ে চলা উচিত।
তিনি বলেন, এ ধরণের প্রবনতা বাংলাদেশ বা এশিয়ান সাবকন্টিনেন্ট দেশগুলোতেই বেশি দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্য কিংবা অন্যান্য মুসলিম বিশ্বে এ ধরণের প্রথা চোখে পড়ে না। তারা ধর্মকে যতটা না খাতা কলেমে ব্যবহার করেন এর চেয়ে বেশি বাস্তবজীবনে ব্যবহার করেন। আমরা নাম ব্যবহার করি অথচ কাজে নেই।
অনেকটা একই সুরে কথা বলেছেন জামিয়া ইসলামিয়া রওজাতুল উলুম বাউনিয়াবাদ মাদরাসার প্রিন্সিপাল, প্রধান মুফতি ও রাজধানীর সাইন্স ল্যাবরেটরি মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মাদ শামছুদ্দোহা।
তিনি ফাতেহ২৪ কে বলেন, নাম সাধারণত সংশ্লিষ্ট জিনিসির পরিচিতির জন্য ব্যবহার করা হয় কিংবা আলাদা কোনো পরিচিতি দেওয়ার জন্য। এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষণীয়। এক. ব্যক্তির নাম রাখা দুই. কোনো বস্তুর নাম রাখা। ব্যক্তির নামের ক্ষেত্রে সাহাবিদের নামে নাম রাখা বা কোনো পীর বুজুর্গের নামের অনুসরণে নাম রাখায় কোনো সমস্যা নেই। বরকত লাভের উদ্দেশ্যে এটা হতে পারে। তবে বস্তুর নাম রাখার ক্ষেত্রে ইসলামের যে মৌলিক নিদর্শনাবলী রয়েছে এগুলোর অনুসরণে নাম রাখা উচিত নয়। কারণ এগুলোর বিষয়ে মানুষের অনুভূতিতে তা’জিম ও সম্মানবোধ কাজ করে।
তাই এমন নাম যত্রতত্র ব্যবহার করাও ঠিক নয়। যেমন বাসের নাম আল মক্কা বা আল মদিনা রাখা হলে বাসের প্রতি মানুষের সম্মানবোধ বেড়ে যাবে তা নয়। বরং এ ক্ষেত্রে মক্কা ও মদিনা নামের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা হবে ও সঠিক সম্মান প্রদর্শন সম্ভব হবে না। তবে বিষয়টি নাজায়েজ তা নয়। এ ধরণের কাজ অপছন্দনীয়।
