সাহাবিদের ভূমিতে সাহাবাযুগের চিত্র

আলী হাসান তৈয়ব ঃ

বৃহস্পতিবার। হারামের ঘড়িতে বিকেল ছয়টা। মাগরিবের বাকি এখনো প্রায় একঘন্টা। আমি আর কক্সবাজারের হাফেজ মাহমুদুল করীম বসে আছি মসজিদে হারামের মালিক ফাহাদ অংশে। সারাবিশ্বের উলামায়ে কেরামের মিলনস্থান এই অংশ।

এখানে সবসময়ই নামাজের পর কুরআনের উন্মুক্ত তালিম হয়। মক্কার বড় বড় আলেমরা দেন উন্মুক্ত পাঠ। বাদ আসর আর মাগরিব যুগশ্রেষ্ঠ ফকিহ ও মুহাদ্দিসদের দরস হয়। সারাবিশ্বের ইলমে ওহির মৌমাছিদের মিলন ঘটে এখানে।

সোম ও বৃহস্পতিবার মাগরিবের আগে এখানে এলে যে কারও মনে হয় রমজান মাস চলছে। আরবরা রমজানের রোজার মতোই সোৎসাহে সাপ্তাহিক সুন্নত দুই রোজা রাখেন। শুধু হজের মৌসুম নয়, সারা বছর এখানে চিত্র থাকে অভিন্ন।

শুধু রোজা রাখা নয়, রমজানের হামদর্দি ও মেহমানদারির বৈশিষ্ট্যও এখানে পুরোপুরি উপস্থিত। চারদিকে আপ্যায়নের জোয়ার। মক্কার বিত্তশালীরা থাকেন এর পুরোভাগে। বাইতুল্লাহর মুসাফিররাও নামেন নেকির প্রতিযোগিতায়। আসরের পর থেকে হুইল চেয়ারে করে খেজুরের বড় বড় বস্তা আর বিশাল বিশাল ফ্ল্যাক্স ভরা আরবের ঐতিহ্যবাহী ‘গাওয়া’ আসতে থাকে। শায়খদের খাদেমরা কাতারে কাতারে বিছিয়ে দেন সুফরা-দস্তরখান। হাতে হাতে তুলে দেন দামি খেজুরের ছোট ছোট প্যাকেট। ওয়ানটাইম গ্লাসে ঢেলে দেন গাওয়া। আর খানিক পরপর তো দেওয়াই আছে জান্নাতের হাদিয়া জমজমের বরকতি পানি। ঠান্ডা ও নরমাল উভয় রকম। আবার কেউ হেঁটে হেঁটে তুলে দিচ্ছেন কাতারে কাতারে বিস্কুট, কেক বা পাউরুটির প্যাকেট।

আসরের পর হিজরাহ রোড ধরে হারামের দিকে আসতে পথেই চোখে পড়ল সাপ্তাহিক রোজা দিবসের চিত্র। মিসফালা মাঠের একটু আগে হোটেলের সামনে বিতরণ করা হচ্ছে এক পিস করে বড় পরাটা। ফাহাদ অংশে হারামে ঢুকে অনুমিতভাবেই দেখি হাউজফুল। কোথাও একটু জায়গা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। পুরো হারাম কাণায় কাণায় পূর্ণ। কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাবে ভেতরে ঢোকা। বাইরের বিশাল চত্বর ভরে যাবে আজানের অনেক আগেই। মুসল্লিদের ভিড় গড়াবে হারামের চারপাশের সুদূর সড়কে।

আমরা অনেক খুঁজে কোনো রকম পথের পাশে দুই কাতারে দুইজন জায়গা পেলাম। যে যার মতো তেলাওয়াতে মশগুল হলাম। হঠাৎ কোলে ঝরঝর করে পড়ল অনেকগুলো শুকনো খেজুর। একটু পর আরেকজন এসে দিয়ে গেলেন গ্লাস ভর্তি জনপ্রিয় সুস্বাদু ‘সুক্কারি’ খেজুর। একটূ পর এলেন আরেকজন। তাকে শুকরান লাগবে না বলে ফিরিয়ে দিলাম। এলো আরও একজন, উত্তর দিলাম একই।

ইফতারের সময় একে অপরকে সাধাসাধি আর এগিয়ে দেওয়া। কে কার খেজুরের বিচি নিয়ে ঝুড়িতে ফেলতে পারে। কে কাকে জমজমের পানি এনে দিতে পারে। সুবহানাল্লাহ। সাহাবিদের ভূমিতে এখনো জীবন্ত সেই মেহমানদারি আর অপর ভাইকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিযোগিতা। দৃশ্যগুলো লক্ষ্য করে হঠাৎই চোখ ভিজে উঠল। কে বলল, এ উম্মতের গুণ নেই। সাহাবিদের বৈশিষ্ট্য নেই। কোন বেইনসাফ বলে, আরবদের মাঝে খাইর-কল্যাণ নেই।

 

আগের সংবাদদুই সপ্তাহের ব্যবধানে লম্বকে আবার ভূমিকম্প
পরবর্তি সংবাদবিএনপির ভবিষ্যত, ভবিষ্যতের বিএনপি