রোহিঙ্গা সঙ্কটের এক বছর: বিপর্যয়ের নানাদিক

ওমর ফারুক

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। রোহিঙ্গা মিলিশিয়া সংগঠন আরসার তথাকথিত হামলার অভিযোগ তুলে এক নারকীয় গণহত্যার সূচনা করেছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। গোটা বিশ্বই এ বর্বরতার সাক্ষী। এ হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছে রাখাইন রাজ্যের সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ও স্থানীয় লোকজন।

গত বুধবার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আলোচনায় উঠে আসা অন্টারিও ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (ওআইডিএ) গবেষণাগ্রন্থে বলা হয়েছে, রাখাইনের মানচিত্র থেকে রোহিঙ্গাদের চিরতরে তাড়িয়ে দিতে গত বছরের ২৫ আগস্ট তাণ্ডব শুরু করেছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

সাম্প্রতিক ইতিহাসের এই ঘৃণ্যতম নৃশংসতায় অন্তত ২৪ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছে। আর ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ১৮ হাজার রোহিঙ্গা নারী। তা ছাড়া অগ্নিসংযোগ করে পোড়ানো হয় ১ লাখ ১৫ হাজার ঘরবাড়ি, বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করা হয় আরও ১ লাখ ১৩ হাজার ঘরবাড়ি। গ্রেপ্তার করা হয় ৫৫ হাজার ৭১৮ জন রোহিঙ্গাকে। সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত হয়েছে ৪১ হাজার ১৯২ জন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু। এর বাইরে আগুনে নিক্ষেপ করে আহত করা হয় ৩৪ হাজার ৪৩৬ জন রোহিঙ্গাকে।

গত এক বছর ধরে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমদের চাপ বহন করছে বাংলাদেশ । এরমধ্যে আগ থেকে ৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে জীবন যাপন করে আসছিল। গত বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চাপ তিন গুণ বেড়ে যায়। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে বাংলাদেশ সরকার তাদের আশ্রয় দেয়। নড়ে উঠে বিশ্বও। এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় সঙ্কট হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম।

নিজ দেশে ফিরে যাওয়া, হত্যাকাণ্ডের বিচার ও ২৫ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে শনিবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলও করেছে রোহিঙ্গারা। এ সঙ্কট কতদিন মোকাবেলা করবে বাংলাদেশ, কোন পথে সমাধান, রোহিঙ্গারা কি আদৌ তাদের দেশে ফিরে যেতে পারবে, এসব প্রশ্নের উত্তর কী?

প্রথমত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের আন্তর্জাতিক ‘গণহত্যা দিবস’ দাবি করাটা অযৌক্তিক কিছু নয়। যদিও ২৫ আগস্ট থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর এ নির্যাতন, বর্বরতা শুরু হয়নি। তবে এ জাতির অধিকার ফিরে পাওয়া, নির্যাতন থেকে মুক্তি ও সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধ জেগে উঠার জন্য একটি দিনকে নির্ধারণ করা তাদের জন্য প্রয়োজন ছিল।

শুধু গত এক বছর ধরেই নয় ৮০ ও ৯০ দশক থেকে এ বর্বরতার শিকার হতে হয়েছে রোহিঙ্গাদের। তবে গত ২৫ আগস্টের পর থেকে এ বর্বরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মানবিক আবেদনের ডাকে বাংলাদেশ সরকার, জনগণ ও আলেম ওলামারা ছুটে গেছেন রোহিঙ্গাদের সাহায্যে। সীমান্তে তাদের আর্থিক সহযোগিতা, খাদ্য বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ। পাশে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও।

সাহসিকতার সঙ্গে  এ সঙ্কট মোকাবেলা করলেও তাদের দেশে ফেরার বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো সুরাহা করতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার। উল্টো মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী অং সান সূচি বাংলাদেশ নিজ স্বার্থেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন। রোহিঙ্গা শব্দটি মুছে ফেলতেও তারা প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপ সৃষ্টি করে আসছেন। বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা দেখেও মনে হচ্ছে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেকটা ব্যর্থতারই পরিচয় দিচ্ছে। এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও দেখা দিয়েছে নানা সামাজিক সমস্যা। রোহিঙ্গা নারীদের দিয়ে দেহ ব্যবসা, রোহিঙ্গা যুবকদের দিয়ে মাদক পাচার ও অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করছে একটি মহল। শুরু হয়েছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনও। এমনটি চলতে থাকলে রোহিঙ্গারা অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য এক বড় বোঝা হয়ে দাড়াতে পারে।  যা মোকাবেলা করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন থেকে কঠিনতর হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার, আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন সৃষ্টির কাজে আরও অগ্রসর হতে হবে। রক্ষা করতে হবে রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতির স্বাধীনতাও।

সবার আগে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা প্রয়োজন। আলেমসমাজের পাশাপাশি এটা সরকারেরও দায়িত্ব। কারণ এটা বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থেও কাজে লাগবে। কারণ রোহিঙ্গারা মুসলিম থাকলে তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদও অব্যাহত থাকবে। তাদের নিয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে না। আর তাদের ওপর সাংস্কৃতির ও ধর্মীয় আগ্রাসন চালানো হলে রোহিঙ্গারা তাদের সংস্কৃতিও ভুলে যাবে। ফলে এ দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে।

সর্বোপরি আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে বাংলাদেশকে ভূমিকা রাখার প্রতি আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে যদি রোহিঙ্গাদের জন্য নিজ ভূমিতে ফেরার আশার আলো জ্বলে উঠে। বাংলাদেশও মানবিক দায়িত্ব পালনের বিশ্ব দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

আগের সংবাদগ্রামের ধর্ম ও ধার্মিকতা
পরবর্তি সংবাদদেশে আরো চারটি মেডিক্যাল কলেজ হচ্ছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী