ঢাকার মসজিদ-মাদরাসাগুলোর অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী?

রাগিব রব্বানি

রাজধানীর চকবাজার চুড়িহাট্টায় ঘটে গেল ভয়াবহতম মর্মান্তিক অগ্নি-দুর্ঘটনা। শ’য়ের কাছাকাছি লোক পুড়ে মারা গেলেন। শোকে ছেয়ে গেছে পুরো দেশ। নিহতদের স্বজনের আহাজারি ভারি করে রেখেছে চকবাজার ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিবেশ। এর জন্য ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল-জাতীয় দ্রব্যাদির কারখানা এবং সরকারি-বেসরকারি নানামাত্রিক অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন দেশ-বিদেশের আপামর মানুষ।

মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় সরকার থেকে নিয়ে সকলেই নড়েচড়ে বসেছেন। ঘনবসতিপূর্ণ এই রাজধানী শহরে অগ্নি-দুর্ঘটনা থেকে মানুষ কতটা নিরাপদ, আদৌ কোনো নিরাপত্তা আছে কি-না—দুদিন ধরে চায়ের দোকান থেকে টিভি-টকশো, সর্বত্র কেবল এ নিয়েই আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

ঢাকাকে বলা হয় মসজিদের শহর। ২০১৬ সালে তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে ঢাকায় ৫ হাজার ৭৭৬টি মসজিদ রয়েছে। তাছাড়া গত দশক থেকে এখানে মাদরাসার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার কারণে ঢাকাকে এখন অনেকে মসজিদ-মাদরাসার শহরও বলেন।

রাজধানীর নানামাত্রিক সংকটের অন্যতম হচ্ছে অগ্নি-নিরাপত্তা-সংকট। এই সংকট থেকে মুক্ত নেই বড় বড় মসজিদ-মাদরাসাসহ রাজধানীর অলিগলিতে ছড়ানো-ছিটানো ছোট ছোট মসজিদ-মাদরাসাগুলোও।

কারুকার্য খচিত বহুতল মসজিদের অভাব নেই রাজধানীতে, কিন্তু দু-একটি বিকল্প বাদ দিলে কোনো মসজিদেই অগ্নি-দুর্ঘটনা প্রতিরোধের নূন্যতম কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ প্রতি ওয়াক্তে হাজার হাজার মানুষ সালাত আদায় করেন এই সব মসজিদে। কোনো কোনো মসজিদ তো গলির এতটাই ভেতরে, দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সেখানে পৌঁছতে পারবে না; যেমনটা হয়েছে চকবাজারের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে।

মসজিদে তো নির্দিষ্ট সময় ছাড়া মানুষের খুব বেশি আনাগোনা থাকে না, কিন্তু মাদরাসাগুলোতে দিনরাতের চব্বিশ ঘণ্টাই ছাত্র-উসতাদের অবস্থান থাকে। দু-একটা বিকল্প বাদ দিলে কোনো মাদরাসায়ই অগ্নি-নিরাপত্তা জনিত কোনো ধরনের ব্যবস্থাপনা নেই।

তাছাড়া রাজধানীর মাদরাসাগুলোতে ভবন ও জায়গার তুলনায় ছাত্র বেশি হওয়ায় ভবনগুলোর ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি ছাত্র সেখানে বসবাস করে। ফলে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে খুব দ্রুত যে তারা সরে পড়তে পারবেন বা বহুতল ভবন থেকে বের হতে পারবেন, এমনটা সম্ভবপর নয়।

রাজধানীর যাত্রাবাড়িস্থ জামিআ আবু বকর রাদি. পরিচালিত হয় পাশাপাশি দুটো বহুতল বাড়িতে। অস্থায়ী ক্যাম্পাস হিসেবে বেশ ক’বছর থেকে এ দুটো বাড়িতে মাদরাসাটি পরিচালিত হয়ে আসছে। বিশেষায়িত মাদরাসা হবার কারণে দেশের নানা অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর এখানে ভিড় জমান। হাজার খানেক ছাত্র ভবন দুটোতে আবাসিক ব্যবস্থাপনায় থেকে পড়াশোনা করেন।

সেখানে অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে কি-না জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম মাদরাসাটির পরিচালক মুফতি বুরহানুদ্দীন রব্বানীর সঙ্গে। তিনি প্রথমেই দেশের বিদ্যমান নানামাত্রিক সমস্যার কথা উল্লেখ করে জানান, অগ্নি-নিরাপত্তায় বাংলাদেশে আইন থাকলেও ভবন নির্মাণের সময় তা মানা হয় না কোনোখানেই, যার দরুণ কেবল মাদরাসা-মসজিদ নয়, দেশের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়ও অগ্নি-নিরাপত্তা জনিত কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। এর ধারাবাহিকতায় আমাদের মাদরাসাগুলোতেও তা রাখা হয় না। এ ক্ষেত্রে মাদরাসা-কর্তৃপক্ষগুলোর যে অসচেতনতা পরিলক্ষিত হয়, তার মূল দায় আমাদের রাষ্ট্রের বিদ্যমান সিস্টেম জনিত দুর্বলতার। আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে থাকলে এ অসচেতনতার সৃষ্টি হতো না।

মুফতি বুরহানুদ্দীন রব্বানী বলেন, ‘জামিআ আবু বকর বর্তমানে আমরা একটি অস্থায়ী ক্যাম্পাসে পরিচালনা করছি। শিগগির স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিফট করব। সেখানে অগ্নি-নিরাপত্তার দিকটা যথাসাধ্য গুরুত্বের সঙ্গে খেয়াল রাখা হবে। তাছাড়া নতুন ক্যাম্পাসে বড় একটি পুকুরও রয়েছে, অগ্নি-নিরাপত্তায় তা যথেষ্ট সহায়ক হবে।

‘আমাদের বর্তমান অস্থায়ী ক্যাম্পাসে অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা সেভাবে না থাকলেও উভয় ভবনেই একাধিক সিঁড়ি রয়েছে। যেকোনো দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীরা দ্রুত সরে পড়তে পারবে সেখান থেকে।’

শুধু মসজিদ-মাদরাসাই না, রাজধানীর অধিকাংশ ভবনেই মানা হয় না অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন। অথচ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত গেজেটের অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০১৪-তে উল্লেখ আছে—বহুতল বাণিজ্যিক ও ৫০০ বর্গমিটার ফ্লোর এরিয়াবিশিষ্ট শিক্ষা, সমাবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক, শিল্প, বিপজ্জনক ও মিশ্র ব্যবহার শ্রেণির ভবন নির্মাণের জন্য ফায়ার ফাইটিং ফ্লোর প্ল্যানে নিম্নোক্ত বিষয়াবলি চিহ্নিত করিয়া ফ্লোর প্ল্যান তৈরি করিতে হইবে। প্ল্যান স্থায়ী অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থাদি, জরুরি নির্গমন সিঁড়ি ও বিকল্প সিঁড়ি, লিফট ও ফায়ার লিফট, ডিটেকশন সিস্টেম, এলার্মিং সিস্টেম, ইমার্জেন্সি লাইট, এক্সিট সাইন, রিজার্ভার, ডাক্টসসমূহ, ফায়ার কমান্ড স্টেশন, ট্রান্সফরমার কক্ষ, স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর কক্ষ, ফায়ার ফাইটিং পাম্প হাউজ, রাইজার পয়েন্ট ও হোজ কেবিনেট, স্প্রিংকলার হেড, ওয়াটার স্প্রে প্রজেক্টর হেড, সেফটি লবি, ফায়ার রেটেড ডোর, ভেন্ট ও এভিয়েশন লাইট ফায়ার ফাইটিং বিল্ডিং প্ল্যানে লিজেন্ডসহ উল্লেখ করিতে হইবে।

সচেতন মহল মনে করছেন, বাংলাদেশে আইনের যথার্থ প্রয়োগ যদি থাকত এবং প্রতিটি বিল্ডিং নির্মাণ আইন মেনে তৈরী হতো তবে কিছুদিন পর পর চকবাজারের চুড়িহাট্টার মতো এমন ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সংঘটিত হতো না দেশের কোথাও।