এখনো জ্বলে আছে সুফফার শিখা

কাজী মাহবুবুর রহমান

 মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে আদি প্রতিষ্ঠান হল মসজিদ। প্রাচীন এথেন্সের পরে সেটা ছিল মধ্যযুগে জ্ঞান চর্চার এক নতুন অধ্যায়। সাহাবায়ে কেরামদের একটা অংশ তাদের অন্য সকল পেশা ত্যাগ করে নিরবচ্ছিন্নভাবে মসজিদে থেকে পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকতেন। তাদের পড়াশোনার বিষয়বস্তু ছিল কেবল পবিত্র কোরআন ও হাদিস। স্বয়ং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে পাঠদান করতেন। নবিজি তাদেরকে ওহি পাঠ করে শোনাতেন এবং অন্যান্য দ্বীনি বিষয়ের শিক্ষা দিতেন। সাহাবায়ে কেরামদের ভেতর নবিজির সে সকল হাদিস এবং কোরআনের আয়াতসমূহ লিখে রাখার মত লোকও তৈরি হয়েছিলেন। তাঁরা টিকে ছিলেন অত্যন্ত বৈরী পরিস্থিতিতে। তাদের নিয়মিত খাবার ও পোশাকের কোন নিরাপদ জোগান ছিল না । তবু তারা সেখানেই সুখী ছিলেন। বিখ্যাত মুহাদ্দিস সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা রা. ছিলেন তাদের অন্যতম। ইসলামের ইতিহাসে এমনকি খোদ মধ্যযুগে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম রূপরেখায় তৈরি সাহাবায়ে কেরামের এই অংশটিকে আসহাবে সুফফা বলা হয়। সুফফাকে অবলম্বন করে পরবর্তীতে যেই শিক্ষা মুসলিমবিশ্বে প্রতিষ্ঠা লাভ করে তাকে বলা হয় মক্তব। ইতিহাসবিদগণ এই নামেই একে অভিহিত করে থাকেন।

এককালে সুফফা সময় ও ভূগোল অতিক্রম করে পবিত্র ইসলামের সঙ্গে বিস্তার লাভ করে মুসলিমবিশ্বের সর্বত্র। প্রায় ১০ শতক পর্যন্ত সুফফা টিকে ছিল উত্তরোত্তর উন্নতির সঙ্গে। গুটিকয়েক মানুষের হাতে গোড়াপত্তন হওয়া এই শিক্ষাব্যবস্থাই এনে দিয়েছিল অভাবনীয় সাফল্য। মধ্যযুগে মুসলিমদের হাত ধরেই রচিত হয়েছিল সর্বোচ্চ সাক্ষরতার এক অনবদ্য ইতিহাস।

উসমানি খেলাফতকালে মক্তবের শিক্ষার সবচেয়ে বেশি উৎকর্ষ সাধন হয়। সরকারি তত্ত্বাবধানে মক্তব পরিচালনা হতে থাকে। উপমহাদেশের সুলতানি ও মোগল আমলেও মক্তবের ব্যয়-নির্বাহ ও তত্ত্বাবধানের সুব্যবস্থা ছিল। সরকারিভাবে মক্তবগুলির জন্য লা-খেরাজ জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। তখন উপমহাদেশ জুড়ে এই আদলে হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। এটাও অব্যাহত ছিল মোঘল আমলের শেষ পর্যন্ত। তারপর মুসলিম দেশগুলিতে ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আগ্রাসনের ফলে অর্থনৈতিক চাপের মুখে এ সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে থাকে।

ইতিহাসবিদগণ মক্তবের যেই পরিচিতি পেশ করেন, এতে খুব সহজেই অনুমান করা যায়, প্রাচীন সেই মক্তবের শিক্ষার আদলই ধরে রেখেছে আজকের উপমহাদেশের কওমি মাদরাসা। মক্তবের পরিচিতির সঙ্গে দুইটি বৈশিষ্ট্যের কথা ইতিহাসবিদগণ উল্লেখ করেন। একটি হল, গৃহশিক্ষার প্রথা ভেঙে একাডেমির পথে আসা। আরেকটি হল, মেঝেতে বসে পাঠ গ্রহণ করা। বর্তমান সময়ে একাডেমিই হয়ে উঠেছে শিক্ষার প্রধান নজির। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ঐতিহ্যগত আলোচনায় একাডেমি আর গুরুত্বপূর্ণ অংশ নয়। তবে মেঝেয় বসে পাঠগ্রহণের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে কওমি মাদরাসা। কাল-পরিক্রমায় উসমানি খেলাফত-আমলে মক্তবে যেই বহুবিধ শিক্ষার উত্থান ঘটেছিল, সেটা বন্ধ হয়ে কেবল কোরআন হা্দিস ও দ্বীনিয়াতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়া ঐতিহ্যবাদী ধারা হিসেবে কওমি মাদরাসাই মক্তবের শিখা হয়ে জ্বলছে।

বাংলাদেশে মক্তবের চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় মুলত ইউরোপিয়ান সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ হিসেবে। আমাদের দেশীয় শিক্ষা ও কালচার যেন সম্পূর্ণ ভেঙে না পড়ে এই লক্ষ্য থেকেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের মক্তব। এটাও আমাদের এ দেশের শত বছরের মুসলিম ঐতিহ্যের নিদর্শন। প্রতিদিন সকাল হতেই ফজরের নামাজ আদায়ের পর শিশুদের সম্মিলিত কোরআনের সুর ও কলরবের ভেতর দিয়ে জেগে ওঠে আমাদের আমাদের গ্রাম-বাংলার সমাজ।

মক্তবের শিক্ষা শিশুদের জীবন ও আমাদের সমাজ—এই দুয়ের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে সময়ের ভেতর আমরা বাস করছি, এতে প্রতিটি শিশুর আগামীর দিনগুলোর নৈতিকতা ক্ষয়ের অসংখ্য উপকরণে পরিপূর্ণ। এছাড়াও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় শিক্ষায় ইসলামের অনুষঙ্গটি অত্যান্ত সীমিত জায়গায় এসে আটকে যাচ্ছে। ফলে শিশুদের মাঝে ইসলামের বুনিয়াদ গড়ে উঠছে না। অনেকেরই ধর্ম পালনের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে একটা বড় সময় অতিক্রম করে এবং অন্য কোনো মাধ্যমের দ্বারস্থ হয়ে। সমাজ থেকে ইসলামের শিক্ষা পুরোপুরি দেওয়া হচ্ছে না। এই শূন্যতার জায়গাটিতে মক্তবের ভূমিকা অপরিসীম।

বাংলাদেশের গ্রামগুলিতে মক্তবের শিক্ষা এখনো বহুলাংশেই সক্রিয় আছে। সকালবেলা সূর্য ওঠার সাথে সাথে মসজিদের মাইকে ছেলেমেয়েদের পড়তে ডাকা হয়। শিশুরা ঘর থেকে বুকে সিপারা চেপে মসজিদের বারান্দায় এসে বসে। তাদের কলরবে সকাল আড়মোড়া ভাঙে। দৃশ্যটি বড় সুন্দর। কোরআন শিক্ষাকারী ছাত্র-ছাত্রীদের পায়ের নিচে ফেরেশতারা নুরের পাখা বিছিয়ে দেন। আমরা কখনো নুরের পাখা দেখিনি; কিন্তু কোরআনের পাখি হয়ে ঘুম-ভাঙা পুষ্পের মতো এই শিশুদের মক্তবে যাওয়ার দৃশ্যটি দেখে ভাবতে ভালো লাগে, এমন শিশুদের পায়ের নিচে নুরের পাখা বিছিয়ে দেওয়া আছে । এক দীপ্তিমান, সুরেলা কোলাহলের মধ্য দিয়ে গ্রামের মানুষ একটি কর্মময় দিনে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের গ্রামগুলি এখনো এভাবেই অভ্যস্ত । শিক্ষার বাণিজ্যিকরণের এই দিনে নিষ্কলুষ নৈতিক শিক্ষার এমন সমাহার মনে প্রশান্তি এনে দেয়।

বাংলাদেশে মক্তব শিক্ষার এক নতুন সংযোজন শুরু হতে যাচ্ছে । ঢাকায় এবং জেলা শহরগুলিতেও চালু হচ্ছে বয়স্কদের জন্য দ্বীনি শিক্ষার মাদরাসা। যারা জীবনের শুরু-সময়ে কোরআন শিক্ষার সুযোগ পাননি, তারা একদম শুরু থেকেই কোরআন শিক্ষা শুরু করতে পারবেন। এটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। এই পদ্ধতিটি অতি দ্রুতই সাড়া ফেলে দিয়েছে সাধারণ শিক্ষিত ধার্মিক মুসলমানদের ভেতর। সেখানেও চোখে পড়ে আদি শিক্ষার ছবি।

মসজিদের বারান্দা, কওমি মাদরাসার মেঝে কিংবা  বয়স্ক শিক্ষার ঘর—জ্বলে আছে সুফফার শিখা।