আমার কলমকাল : যে যৌবন লেখকের

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

আমার মনে আছে, আমি তখন ধামরাই ইসলামপুর মাদরাসায় পড়ি। ঢাকায় একটা সাহিত্য-পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে যোগদানের সুযোগ হয়েছিল। ২০০১ সালের দিকের ঘটনা। ওই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বিভিন্নজন কবিতাপাঠ করছিলেন। যিনি উপস্থাপক ছিলেন, তিনিও কোনো এক কবি। নাম মনে নেই। তিনি উপস্থাপনার মধ্যে মাঝে মাঝে বলছিলেন, ‘এখন কবিতা পাঠ করবেন শূন্য দশকের কবি অমুক…।’ আমি তখন বুঝতে পারছিলাম না শূন্য দশক জিনিসটা কী। পরবর্তীতে আরেকটু বয়স হওয়ার পর নানাজনের কাছে শুনে বুঝতে পারলাম, একুশ শতাব্দীর প্রথম দশককে বলা হয় ‘শূন্য দশক’।

আশা করি এই ঘটনা দ্বারা বুঝতে পারবেন এই শতাব্দীর প্রথম দশকে আমার সাহিত্যজ্ঞান ঠিক কোন পর্যায়ের ছিল।

যাক সে কথা। প্রথম দশকে সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি বিচার করার মতো বিজ্ঞতা আমার ছিল না। আমি তখন কেবলই ছাত্র, সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক। বিশেষত এ দশকের প্রথম দিকে লেখালেখি বলতে যা বোঝায় তার কিছুই শুরু করিনি। যৎসামান্য কবিতা লিখতাম। সেগুলো জোর করে ভাই-বোন বা ক্লাসের বন্ধুদের গলধঃকরণ করাতাম। তবে পড়তাম খুব। পড়ার নেশা হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি কিংবা মাদরাসা, হাতে কোনো বই ছাড়া কখনো থাকতাম না। পড়ার ব্যাপারে কোনো বাধা-নিষেধ মানতাম না। সামনে যা পেয়েছি তাই পড়েছি।

পড়ার জন্য আমি নিজেই একটা নিয়ম বানিয়ে নিয়েছিলাম। কোথাও যদি পাঁচটা মিনিট অহেতুক আড্ডা বা বসে বসে সময় নষ্ট হতো, নিজেকে বলতাম, এই পাঁচটা মিনিট একটা বই পড়লে পাঁচটা পৃষ্ঠা পড়া যেত। সত্যি বলতে কি, ক্লাসের পড়া, ঘুম ও নাওয়া-খাওয়া—এসব নিত্যকার কাজ ছাড়া আমার কোনো অবসর ছিল না। আমার অবসর বলতে ছিল বই। আড্ডা দেওয়া আমি বরাবর অপছন্দ করি, এখনও। অনেকে আড্ডার নানা গুণাগুণ বর্ণনা করে থাকেন, কিন্তু আড্ডায় বসলেই তখন আমার মনে হতো, এই সময়গুলো অনর্থক নষ্ট হচ্ছে। আমি বই নিয়ে অন্য কোথাও বসে যেতাম। তখন আমার পণ ছিল, পাঁচ মিনিটের বেশি কোথাও বই ছাড়া থাকব না।

দুই

এ শতাব্দীর প্রথম দশকটা ‘মাদরাসা-সাহিত্যের’ জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়। কেন, সেটা বলছি। এ সময়টা ছিল ইসলামি ম্যাগাজিনের সুবর্ণকাল। মাসিক রহমত, আদর্শ নারী, কাবার পথে, মদীনা তো আগে থেকেই ছিল; মুসলিম জাহান তত দিনে বন্ধ হয়ে গেলেও তার রেশটা রয়ে গিয়েছিল; রাহমানী পয়গাম, মুঈনুল ইসলাম প্রভৃতি ম্যাগাজিনসহ আরও কিছু নতুন-পুরাতন পত্রিকা তখন সদর্পে রাজত্ব করেছে। প্রতিটি মাদরাসায় পত্রিকাপাঠ ছিল আবশ্যিক একটা বিষয়। বিশেষত মাসিক রহমত (লুপ্ত জাগো মুজাহিদ) ছিল মাদরাসা-সাহিত্যের জন্য যক্ষের ধনের মতো। এটা কেবল পত্রিকা ছিল না, ছিল পত্রিকার চেয়ে বেশি কিছু। এটা পড়া হতো না, বিনম্র ভালোবাসায় পাঠ করা হতো।

এ জাগরণের একটা খোলামেলা কারণ ছিল। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ধ্বংস এবং তৎপরবর্তী আমেরিকা কর্তৃক আফগানে আক্রমণ, বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের প্রতিবাদী আচরণ, আমেরিকা ও পশ্চিমাদের প্রতি তীব্র ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ; এসব কিছু মাদরাসা-সাহিত্যকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল। যখন কোথাও কোনো আলোড়ন ওঠে, আলোড়ন-পরবর্তী তার একটা প্রভাব চারপাশে রয়ে যায়। হাজারও মানুষের মাঝে এই প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। এসব পত্রিকা হাজারও মানুষের মাঝে সেই প্রতিবাদী মানসিকতা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

মাদরাসা-সাহিত্যের একটা চরিত্র হলো, প্রতিবাদী আচরণ। এখনও স্যোশাল মিডিয়ায় দেখা যায়, সমাজের যে কোনো অনাচারে মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা দারুণ প্রতিবাদী। হোক সেটা ধর্মীয় কিংবা জাতীয় ইস্যু, কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো অন্যায়-অনাচার—সবখানে মাদরাসাসংশ্লিষ্টদের প্রতিবাদী উপস্থিতি লক্ষ করা যাবে। তাদের ভাষা, উপস্থাপনা, আচরণ হয়তো অনেক ক্ষেত্রে দৃষ্টিকটূ, কিন্তু প্রতিবাদ তাদের করতেই হবে। প্রতিবাদী এই আচরণের অন্যতম পুরোধা মাসিক রহমত। সেটাকে আপনি দোষ বলুন আর গুণ বলুন, মাদরাসা-সাহিত্যে এই প্রবণতা অনেকাংশে পাকাপোক্ত করেছে ঝঞ্ঝাকালীন অবস্থায় প্রকাশিত মাসিক রহমত। আমি বলছি না যে, রহমত যারা পড়েছে, তারাই প্রতিবাদী আচরণ লালন করে। রহমত যে প্রজন্মটা তৈরি করেছিল, সেই প্রজন্মের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল অন্য আর সবার মাঝে। এটা সময়ের একটা আপেক্ষিক তত্ত্ব। সময়ের সঙ্গে এর রেশ অনেকদিন পর্যন্ত রয়ে যায়।

সেই সময়ের ঘুর্ণিঝড় থেকে যেসব লেখক-কলামিস্ট উঠে এসেছেন, তাদের অধিকাংশ প্রতিবাদী মানসিকতা লালন করে বেড়ে উঠেছেন। এই প্রতিবাদী মনোভাবাপন্ন তরুণ তুর্কিরা মাদরাসা-সাহিত্যে একটা বড় সম্পদ হতে পারতো। কিন্তু হয়নি। ‘হয়নি’ না বলে আমি বলব, হতে পারেননি। কারণ তাদের ভেতরে প্রতিবাদের ক্ষোভ ছিল, ক্রোধ ছিল, চোখের ভেতর আগুন ছিল। কিন্তু সেগুলো যথাযথভাবে প্রকাশের ভাষা তাদের ছিল না। তাদের ভাষা ছিল দরিদ্র, তাদের চিন্তার পরিধি ছিল সীমিত এবং প্রকাশের মাধ্যম ছিল হাতেগোনা। তদুপরি ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিধি-নিষেধ তো ছিলই। যদি সে সময় তারা যোগ্য সহযোগিতা পেতেন, তবে এত দিনে বাংলাসাহিত্যে মাদরাসা-সাহিত্য স্বমহিমায় আসন করে নিতে পারতো।

এই তরুণ তুর্কিরা কেন প্রস্ফুটিত হতে পারেনি, তার কারণ সেই পুরোনো কাসুন্দি। মাদরাসাগুলো কখনোই প্রতিবাদী মানসিকতাকে তোয়াজ করেনি। প্রতিবাদী আচরণকে দমিয়ে রাখার ব্যাপারে মাদরাসাগুলোর সুদীর্ঘ সুনাম (!) রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটা কওমি মাদরাসায় পড়ানো হয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ইংরেজবিরোধী প্রতিবাদী আন্দোলন, দেওবন্দ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলনসহ অনেক ইতিহাস। মাদরাসার পাঠ্যসূচি তৈরিই হয়েছে প্রতিবাদী মানসিকতা পরিপুষ্ট করতে। অথচ সেই মাদরাসাগুলো থেকে যদি কেউ অন্যায় বা অনাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরে, তখন তাকে নিবৃত্ত করার ব্যাপারে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বরাবর মুন্সিয়ানা দেখিয়ে আসছে। কিন্তু প্রথম দশকে মাদরাসা থেকে উদ্ভূত ওই ‘অ্যাংরি জেনারেশন’-কে যদি সুষমভাবে পরিপুষ্ট করা যেতো, মাদরাসার লৌকিক চৌহদ্দির তল থেকে তাদের যদি খোলা আকাশের নিচে প্রতিস্থপন করা যেতো, তবে মাদরাসা-সাহিত্যে এত দিনে আলি মিয়া নদভি, শিবলি নোমানি, ইকবাল কিংবা নসিম হিজাজির ভ্রুণে উজ্জীবিত বহু সংখ্যক চারাগাছ মাথা তুলে দাঁড়াতো।  দুঃখের বিষয় হলো, পরিপালনের অভাবে মাদরাসা-সাহিত্য এখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। এর দায়ভার বাংলাদেশের আলেমসমাজ কোনোদিনই এড়িয়ে যেতে পারবেন না।

( চলবে )

লেখক : আলেম,সাহিত্যিক ও সাংবাদিক