
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
তিন
প্রথম দশকের শেষ দু-তিনটে বছর আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। পড়াশোনার জন্য আমি ঢাকায় আসি ২০০৩ সালে। ২০০৩ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত পড়াশোনা করি মাদরাসায়ে দারুল উলুম মিরপুর-৬-তে। ২০০৭ সালে ভর্তি হই লালবাগ মাদরাসায়। লালবাগ মাদরাসায় ভর্তি হওয়াটা আমার জন্য বেশ ফলদায়ক ছিল। বাংলাদেশের সুপ্রাচীন মাদরাসা বলে এখানকার একটা ঐতিহ্য আছে। এই ঐতিহ্যটা আমি অনুধাবন করার চেষ্টা করতাম। এর মধ্যে ছাত্রদের স্বাধীনতার একটা ব্যাপার আছে। লেখালেখির ব্যাপারেও স্বাধীনতা এর মধ্যে গণ্য। অনেক শিক্ষক লেখালেখির ক্ষেত্রে উৎসাহও দিতেন।
তো, এখানে এসে মাসিক রহমতে নিয়মিত লেখালেখি শুরু করি। রহমতের অফিস কামরাঙ্গীরচর, লালবাগের কাছেই। শুধু জানতাম, কখনো সাহস করে যাওয়া হয়নি। লালবাগ থেকেই চিঠি কুরিয়ারের মাধ্যমে কামরাঙ্গীচরে রহমত-এর ঠিকানায় পাঠাতাম। অথচ হেঁটে গেলে বড়জোর আধা ঘণ্টার পথ। কিন্তু যেতে আমার ভীষণ শরম লাগত। আমি কে না কে, সম্পাদক সাহেব উটকো ঝামেলা মনে করবেন। ‘পাঠকের কলাম’-এ দু-চারটা লেখা ছাপা হয়েছে বলেই হুট করে অফিসে যাওয়া যায় নাকি!
রহমতের পাঠকের কলামটা তখন বেশ জনপ্রিয়। আমি, সালাহুদ্দীন মাসউদ, নোমান বিন আরমান, নোমান আহমদ, শাব্বির আহমদ—এরা তখন পাঠকের কলামে নানা বিষয়ে জোর বিতর্কমূল কলাম-পাল্টা কলাম লিখতাম। দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল কলামগুলো। যাক, এর মধ্যে একদিন হলো কি, রহমত-এর অফিসে আসা-যাওয়া করে এমন কে একজন যেন এসে জানাল, রহমত-সম্পাদক মনযুর আহমদ আপনাকে দেখা করতে বলেছে। এ কথা শুনে তো আমি আকাশ থেকে পড়লাম! আমাকে কোত্থেকে দেখা করতে বলবে? আর আমি যে লালবাগ মাদরাসায় পড়ি, এ তথ্যই বা তিনি কীভাবে জানলেন? পরে বুঝতে পারলাম, আমার পাঠানো চিঠির মধ্যে তো আমার ঠিকানা লেখা থাকে।
একদিন সুযোগ করে আমি আর তামীম ভাই (তামীম রায়হান) মনযুর আহমদের সঙ্গে দেখা করলাম। তার সঙ্গে কথা হলো, তিনি উৎসাহ দিলেন, নিয়মিত লিখতে বললেন। আমার তো আনন্দ ধরে না। ফিরে এসে মনের আনন্দে লিখতে শুরু করলাম। কয়দিন পর মনযুর ভাই পাঠকের কলাম থেকে আমার লেখা মূল কলামে নিয়ে গেলেন। দেখে আবার অভিভূত হই। যাদের লেখা পড়ে পড়ে শিহরিত হতাম—মাসুদ মজুমদার, যাইনুল আবিদীন, শরীফ মুহাম্মদ—আরও বিজ্ঞ কলামিস্টের পাশে নিজের কলাম দেখে তাজ্জব তাজ্জব লাগত।
মনযুর ভাই মাসিক রহমতে লিখিয়ে যে সাহস তৈরি করে দিয়েছিলেন, ওটার কোনো তুলনা নেই। আমার লেখালেখি-জীবনে মনযুর ভাইয়ের অবদান অনেক। হাতে-কলমে ধরে শেখানো যাকে বলে, তিনি আমার হাতে সেভাবেই কলম ধরিয়ে দিয়েছিলেন। যখনই লেখার প্রয়োজন হতো, লেখার ক্ষেত্রে তিনি কোনো বাধ্য-বাধকতা দিতেন না। সবসময় বলতেন, লেখেন আপনার মতো করে। এই অভয়বাণী আমাকে পরবর্তী জীবনে সাহসী হতে সাহায্য করেছে। এখনও আমি যা-ই লিখি, সাহসের সঙ্গে লিখি। ভয়, পরাধীনতা, সীমাবদ্ধতার জিঞ্জিরে আবদ্ধ রেখে আপনি কখনোই সুসাহিত্য আশা করতে পারেন না।
মনযুর ভাই যখন সাপ্তাহিক ‘জাগো প্রহরী’ নামে নতুন পত্রিকা বের করেন, আমাকে সেটার সহকারী সম্পাদক পদে বসিয়ে দেন। ২০০৮ সালের শেষের দিকের কথা এটা। কেবলই লালবাগ থেকে দাওরা শেষ করে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হয়েছি। রীতিমতো সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক বনে গেলাম!
মাঝখানে বলতেই হবে, লালবাগ পড়াকালীন তামীম ভাই, ইমরান ভাই আরও দু-একজন মিলে ‘নবধ্বনি’ নামের ছোট্ট একটা পত্রিকা বের করলেন, আমাকেও সঙ্গে নিলেন। সেটা নিয়েও আমাদের কর্মযজ্ঞের শেষ নেই। নবধ্বনির গল্পটা না হয় থাক আজকে। সেটা নিয়ে বলতে গেলে আরেক রামায়ণ হয়ে যাবে। আরেকদিন সুযোগ হলে বলব। বিরাট-বিস্তৃত কাহিনি নবধ্বনি নিয়ে রচিত হবে একদিন।
যাকগে, সম্পাদকপক্ষ আর মালিকপক্ষের নানা জটিলতায় জাগো প্রহরীটা শেষমেশ প্রকাশের কিছু দিন পরই বন্ধ হয়ে গেল। আমি হয়ে গেলাম ভবঘুরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করি আর পার্টটাইম এটা সেটা লিখি। কখনো কারো খ্যাপের লেখা লিখে দিই, কোনো মাদরাসারা স্মারক বা ডায়েরি—এসব করেই চলেছে। এর মধ্যে লালবাগ পড়াকালীন গ্রাফিক্স ডিজাইন কিছুটা শিখেছিলাম। জাগো প্রহরীতে থাকার সময় হা মীম কেফায়েতের হাতে কিছুটা তালিমও নেয়া হয়েছিল। কেফায়েত ভাই তখন নামি ডিজাইনার। মূলত কেফায়েত ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় জাগো প্রহরী অফিস থেকেই। তো, সেই বিদ্যা দিয়ে টুকটাক ডিজাইনের কাজ শুরু করলাম। পেট চালাতে হবে তো।
তখন থাকতাম ঢাকা আলিয়ার পেছনে খাজে দেওয়ান লেনে। চকবাজার এবং লালবাগের মাঝামাঝি একটা এলাকা। প্রায় বছর চারেক ছিলাম সেখানে। সেখানে ছোট্ট এক রুমের বাসায় তিন বন্ধু থাকতাম—সানাউল্লাহ, আবদুল মুমিন, তামীম ভাই, আসাদ, ইমরান ভাই। মাঝেমাঝে সারারাত আড্ডা দিতাম। এতটুকুন বাসা, গাদাগাদি করে থাকতাম। শীতের রাতে বেশ লাগত, গাদাগাদির কারণে খুব একটা শীত বসতো না গায়ে।
চার
এভাবে বোহেমিয়ান হয়ে কাটালাম ২০১০ সাল পর্যন্ত। পল্টনে নিয়মিত আসা-যাওয়া হতো। পল্টন তখন মাদরাসা-সাহিত্যের ভালো একটা আঁতুড়ঘর হয়ে উঠছিল। অধুনালুপ্ত জাগো প্রহরীর অফিসে বিশ্বকল্যাণ পাবলিকেশন্সের সাইফুল ভাইয়ের অফিস স্থানান্তর হওয়ায় সেখানে ভালো আড্ডা জমতো। বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম গঠিত হয় এ সময়েরই কিছু আগে-পরে। সাইফুল ভাইয়ের অফিস ছিল লেখক ফোরামের অস্থায়ী কার্যালয়। জহিরুদ্দীন বাবর, মুফতি এনায়েতুল্লাহ, মুনীরুল ইসলাম, আবদুল মুমিন, এহসান সিরাজসহ আরও তরুণরা তখন দাপিয়ে বেড়াতেন পল্টন। নোয়াখালী হোটেল আর ভাই ভাই হোটেলে প্রায় সন্ধ্যায়ই তাদের দর্শন পাওয়া যেত। তাছাড়া, জমিয়তে ইসলাম, মুসলিম লীগসহ আরও দু-একটা ভাঙনপ্রিয় দলের অফিস ছিল পল্টনের জামান ম্যানশনে। জামান ম্যানশনও তখন রমরমা। পল্টনের সাহিত্যসেবীদের পদচারণা ছিল ভাঙাচোরা এ বিল্ডিংয়েও।
এর মধ্যে একদিন পল্টনের রাস্তায় দেখা হয়ে গেল নামি সাংবাদিক শাকের হোসানই শিবলি ভাইয়ের সঙ্গে। ‘আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে’—বহুল আলোচিত বিরাটাকার গ্রন্থ লিখে তিনি তখন বেশ পরিচিতমুখ। সদাহাস্য এবং আড্ডাবাজ শিবলি ভাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। একদিন তার অফিসে যাওয়ার দাওয়াত দিলেন। এহসান সিরাজের সঙ্গে আমার পরিচয় শিবলি ভাইয়ের অফিসেই। জামান ম্যানশনেই ছিল শিবলি ভাইয়ের অফিস।
শিবলি ভাই তখন নতুন একটা প্রকাশনী প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ব্যাপক তোড়জোড় করছিলেন। প্রকাশনীর নামধামও ঠিক করে ফেলেছেন—মাহফিল, দিলরুবা, সুবহে সাদিক, একসঙ্গে ত্রয়ী প্রকাশনা, অভিনব এবং সাহসী ব্যাপার। একসঙ্গে শ খানেক পাণ্ডুলিপি জমা করছিলেন। বই যখন প্রকাশ করবেন, তখন একসঙ্গেই সবগুলো বাজারে নিয়ে আসবেন। বাজারে একটা হুলস্থূল লাগিয়ে দেবেন—এমনই ছিল শিবলি ভাইয়ের ইচ্ছা। আমাকে বললেন তার সঙ্গে ভিড়ে যেতে। আমার না করার তেমন কোনো গুরুতর কারণ ছিল না। ভিড়ে গেলাম। জামান ম্যানশনের ঘিঞ্জি কোঠা ছেড়ে অফিস নিলেন পল্টন টাওয়ারের পেছনের গলিতে। তিন রুমের বিরাট অফিস। আমার থাকবার জায়গাও হয়ে গেল সেখানে। খাজে দেওয়ানের সেই ছোট্ট রুম ছেড়ে কাঁথা-বালিশ আর বই-কম্পিউটার নিয়ে উঠে এলাম পল্টনের নতুন ঠিকানায়।
শিবলি ভাইয়ের সঙ্গে দুই বছর ছিলাম। অনেক কিছু শিখেছি শিবলি ভাইয়ের কাছ থেকে। এ জীবনে তার ঋণ অশোধযোগ্য। সম্পাদনা, লেখার মন্দ-ভালো, একটা যোগ্য শিরোনাম, লেখার খুঁটিনাটি—অনেক বিষয় শেখা হয়েছে তার সঙ্গে থেকে। তাছাড়া শিবলি ভাই দারুণ সাহসী মানুষ এবং স্বপ্নবাজ মানুষ। কখনো ছোট স্বপ্ন দেখতেন না। তার কাছ থেকে এই গুণটি আমি সযত্নে হরণ করেছি। স্বপ্ন যদি দেখো, তবে বিরাট-বিশাল কিছু দেখো। স্বপ্ন দেখতে কখনো কার্পণ্য কোরো না। নিজেকে কখনো ছোট-খাটো মূল্যে বিকিয়ে দিয়ো না। আগে নিজেকে বাজারের জন্য মূল্যবান করে তৈরি করো, তারপর নিজেকে বাজারে উঠাও। ভালো দাম পাবে। সস্তা মূল্যে বিকোলে সারাজীবন সস্তা হিসেবেই বিক্রি হবে, কেউ আর দাম বাড়াবে না।
বলতে ভুলেই গেছি, আমার প্রথম বই প্রকাশ হয় শিবলি ভাইয়ের মাহফিল প্রকাশনী থেকে। অবশ্য মাহফিল প্রকাশনীরও প্রথম বই ছিল ওগুলো। আমার বই দিয়েই মাহফিল প্রকাশনীর যাত্রা শুরু। একসঙ্গে চারটি গল্পের বই—সোরাকার মুকুট, মৃত্যুবাগিচার বীর, হাজার বছরের ভালোবাসা, গেরিলাযুদ্ধের নায়ক। ২০১২ সালে সম্ভবত। বেশ একটা লেখক লেখক ভাব এসে গেল। কোথাও গেলে এখন খানিকটা দাম পাওয়া যায়। পরিচয়-টরিচয় দিতে সুবিধে হয়।
অবশ্য আমার চেয়ে আমার লেখক হওয়ার পরিচিতি বেশি বিতরণ করেছে এহসান সিরাজ। শিবলি ভাইয়ের অফিসে প্রথম দিকে পরিচয় হওয়ার পর থেকে ওর সঙ্গে জোরদার খাতির তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ওর প্রথাগত কোনো কাজ ছিল না। এক চাচার সঙ্গে জমির ব্যবসা করতো আর বিভিন্ন লোকজনদের নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতো। এহসানের এই এক বিশেষ গুণ। লোকজনকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া। হাসপাতাল-সম্পর্কিত তার জ্ঞান এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো। এ কারণে আত্মীয়-স্বজন বা এলাকার লোকজন কিংবা বন্ধু-বান্ধব, কারো রোগ-বালাই হলে প্রথমে ডাক পড়ে এহসানের। এহসান মনের আনন্দে অসুস্থ রোগী নিয়ে হাসপাতাল অভিমুখে রওনা হয়।
এই এহসানই একদিন কানে কানে খবর দিল, শাহ ইফতেখার তারিক ভাইয়েরা তো পত্রিকা করছে। সাপ্তাহিক পত্রিকা। অফিস টফিস নিয়েছে, ডেকোরেশনের কাজ চলছে। লোকজন কিছু নিয়েছে, আরও নেবে। চিন্তা-ভাবনা কর…
লেখক : আলেম,সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
(চলবে…)
