
তুহিন খান
১.
‘ট্রিপল তালাক’ বা ‘তিন তালাক’ নিয়া এখন উত্তাল ভারত। তিন তালাক নিয়া ভারতে বিতর্ক বেশ পুরাতন। প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং বিজেপির অনেক নেতা তিন তালাক ইস্যুতে বরাবরই নেতিবাচক মন্তব্য করছেন মিডিয়ায়। এটর্নি জেনারেল মুকুল রোহাতগি তার জানমাল নিয়া মাঠে নামছিলেন এই তিন তালাকের বিরুদ্ধে। এরই জেরে গত ২০১৭ সালের আগস্টে, সুপ্রিম কোর্টের ৫ সদস্যের এক বেঞ্চ ৩-২ এ বিভক্ত রায় দেয়, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট তিন তালাকরে একইসাথে ‘অসাংবিধানিক’ এবং ‘অনৈসলামিক’ বইলা ঘোষণা দেয়।
তিন তালাক মুসলিম নারীদের ব্যাপার হইলেও, এবং মুসলিম পার্সোনাল ল’র অংশ হইলেও, এইটা নিয়া প্রত্যক্ষ আইনি পদক্ষেপ শুরু হয় একজন হিন্দু নারীর একটা মামলার প্রেক্ষিতে। কর্ণাটকের বাসিন্দা এক হিন্দু নারী তার পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ পাইতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করছিলেন। সেই মামলার শুনানি চলার সময়েই ওই নারীর বিরোধী পক্ষের আইনজীবী মন্তব্য করছিলেন যে, আদালতে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন নিয়া কথা হইতেছে, কিন্তু মুসলমানদের ধর্মীয় নিয়মে এমন অনেক কিছুই আছে যেগুলাও মুসলমান নারীদের অধিকার কাইড়া নেয়। ওই মন্তব্যের পরেই আদালত তিন তালাক নিয়া জনস্বার্থ মামলা দায়ের করার কথা বলে।
এইটা সত্য যে, তিন তালাকের অপপ্রয়োগ সম্প্রতি ভারতে বাড়ছে এবং নারীরা এর ভুক্তভোগী। তাই কিছু ভুক্তভোগী নারী এবং তথাকথিত নারীবাদী এনজিওর সহায়তায় পাওয়া কিছু মামলা নিয়া কোর্টের শুনানি শুরু হয়। এবং দীর্ঘ দুই মাসের শুনানি শেষে ২০১৭ সালের আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট এইটারে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘অনৈসলামিক’ বলে ঘোষণা দেয়।
এটর্নি জেনারেল মুকুল সাহেব শুনানি চলাকালেই কইছিলেন, কোর্টের ফয়সালা আসলেই সরকার এইটা নিয়া আইন বানাবে। মোদি সরকার সেইমতে এই ব্যাপারে বিল পাশ করার জন্য মরিয়া হইয়া উঠলো। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরেই ‘দ্য মুসলিম উইমেন প্রোটেকশন অব রাইটস ইন ম্যারেজ অ্যাক্ট’ নামে একটা বিল তারা লোকসভায় পাশ করায়, যা সাধারণ্যে ‘তিন তালাক বিল’ নামেই পরিচিত। কিন্তু রাজ্যসভায় বিলটা তখন আটকায় যায়।
কিন্তু এ বছরের শেষদিকে আইসা, মোদি সরকার আবার বিলটা পাশ করানোর জন্য ব্যাপক মরিয়া। যেহেতু সংসদে একবার বিলটা আটকায়ে গেছে, তাই নির্বাচনরে সামনে রাইখা, গত সেপ্টেম্বরে তারা এই বিতর্কিত বিল নিয়া একটা অর্ডিন্যান্স জারি করে। এর মাধ্যমে ঘুরপথে বিলটারে একরকম আইন বানায়ে ফেলে তারা, সংসদের তোয়াক্কা না কইরাই। তবে এই অর্ডিন্যান্সে মূল বিলটা কিছুটা শিথিল করা হয়। মূল বিলটার কিছু কিছু ব্যাপার ছিল ভারতের মুসলিম পুরুষদের জন্য বেশ ভয়াবহ। যেমন, মূল বিল অনুযায়ী এমনকি প্রতিবেশীও যেকোন মুসলিম পুরুষের ব্যাপারে এই অভিযোগ আনতে পারতো। কিন্তু অর্ডিন্যান্সে প্রতিবেশীর ব্যাপারটা বাদ দেয়া হয়। মূল বিলে তিন তালাক দেয়া স্বামীর জামিনের কোন ব্যবস্থা ছিল না, অপরাধটা ছিল ‘আনবেইলেবল’। তবে অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, স্ত্রীর বক্তব্য শোনার পর বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে অভিযুক্তের জামিন মঞ্জুর করতে পারবেন।
এই অর্ডিন্যান্সের ব্যাপারে গত ২৪ শে সেপ্টেম্বর ‘অল ইন্ডিয়া প্রোগ্রেসিভ উইমেন’স এসোসিয়েশন’র সেক্রেটারি কবিতা কৃষ্ণান একটা আর্টিকেল লেখেন। আর্টিকেলটাতে দেখানো হয়, কী ভয়াবহভাবে, সুচতুর কায়দায়, মুসলিম মহিলাদের স্বার্থ রক্ষার নামে আরেকটা ‘কাউ প্রোটেকশন ল’ পাশ করতে চাইতেছে মোদি সরকার। কবিতা কৃষ্ণান তার লেখায় অনেক ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট তুইলা ধরেন।
ওনার পয়লা পয়েন্ট ছিল এই যে, তিন তালাক নিয়া এই যে বিল, এইটা ডিসক্রিমিনেটরি। কারণ, ‘যে কারণে তিন তালাকরে ‘অসাংবিধানিক’ বলা হইতেছে, সেইটা এই যে, এই একতরফা তালাকে নারীর ক্ষতি হয়, তার রাইট নষ্ট হয়। কিন্তু এই একতরফা ডিভোর্সের প্রচলন ভারতের সব কম্যুনিটির মধ্যেই আছে। ভারতে প্রায় ২০ লাখ হিন্দু নারী একতরফা তালাকের শিকার, যেখানে মুসলমানদের মধ্যে মাত্র দুই-আড়াই লাখ নারী তিন তালাকের ভুক্তভোগী। অথচ, হিন্দুদের ক্ষেত্রে একতরফা ডিভোর্সরে সিভিল অফেন্স বলা হইছে এবং এর সাজা এক বছর। অথচ মুসলিমদের ক্ষেত্রে এটিরে ক্রিমিনাল অ্যাক্ট হিশেবে দেখানো হইতেছে এবং সাজা তিন বছর!’
কবিতা আরো লেখেন, ‘হিন্দুরা বিয়ারে মুসলিমদের মত ‘চুক্তি’ ভাবে না, ভাবে একটা ‘ধর্মীয় প্রতিশ্রুতি’। তাই তাদের ধর্মে বিবাহ বিচ্ছেদের কোন ওয়ে নাই। ফলে হিন্দু পুরুষেরা ‘তিন তালাক’ বলা ছাড়াই একতরফা তালাক দিয়া দিতে পারেন। অথচ এইটা ক্রিমিনাল অ্যাক্ট না, সিভিল কোড। অথচ মুসলিমদেরটা ক্রিমিনাল অ্যাক্ট। সম্ভবত যশোদাবেন এইরকম ঘটনারই ভুক্তভোগী, যারে তার স্বামী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৪৫ বছর আগে একতরফাভাবে ত্যাগ করছিলেন। যশোদাবেন বারবার প্রকাশ্যেই মোদির সাথে থাকতে চাইছেন, কিন্তু মোদি তা মানেন নাই। যশোদাবেনের মত অনেক হিন্দু নারীর জন্য এই সংগ্রাম কঠিন, কারণ তাদের স্বামীরা ‘তিন তালাক’ না বইলাই তাদের ছাইড়া দিতে পারেন।’
কবিতা কৃষ্ণানের দুসরা পয়েন্ট এই ছিল যে, ‘তিন তালাক বিল’ মুসলিম নারীর অধিকার হরণের বিল। তিনি বলেন, তিন তালাকের ভুক্তভোগী একজন নারীর জন্য তার স্বামীরে পুনরায় স্বামী হিশাবে পাওয়া এবং তার ভরণপোষণের অধিকার ফিরা পাওয়াই জরুরি। কিন্তু স্বামীরে যদি তিন বছর জেলে আটকায়ে রাখা হয়, তাইলে তিন তালাকের শাস্তিতে স্ত্রীর কোন লাভ আছে কী? এছাড়া এই বিলে স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর উপরে দেওয়া হইছে। অথচ ইন্ডিয়ার মেইনটেন্যান্স বিলে আছে, তালাকপ্রাপ্তা নারীর জীবনযাপনের জন্য সরকার সাহায্য করবে। সুতরাং এই বিল নারী অধিকারের পক্ষে তো না-ই, উলটা নারীর অধিকারবিরোধী আইন।
২.
এ বছর ডিসেম্বরের ইলেকশনে ‘গো-বলয়’র গুরুত্বপূর্ণ তিনটা রাজ্য—মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ে পরাজিত হয় বিজেপি। ফলে, ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনরে সামনে রাইখা ‘তিন তালাক বিল’রে একটা রাজনৈতিক ট্রাম্প কার্ড হিশাবে গ্রহণ করছে বিজেপি। গত ২৮ ডিসেম্বর আবারো ভারতের লোকসভায়, আগের বিলে কোনরকম সংশোধনী না আইনাই বিলটা পাশ করায়ে নেয় তারা। এইসময় বিরোধী কংগ্রেস এবং অন্যান্য দলগুলা এই বিলের বিরোধিতায় ‘ওয়াক আউট’ করলে কেবলমাত্র কণ্ঠভোটেই বিলটা পাশ হয়ে যায়। তবে ৩১ ডিসেম্বর এই বিল ২০১৭-র মত আবারো রাজ্যসভায় আটকায়ে যায়। এসময় কংগ্রেসসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলার বিরোধিতার মুখে সংসদ বুধবার (আজ) পর্যন্ত মুলতুবি রাখা হয়।
এআইএমআইএম-এর চেয়ারম্যান আসাদুদ্দিন ওয়ায়েসি লোকসভায় এই বিলের বিরুদ্ধে বেশ শক্ত ডিবেট খাঁড়া করেন। তিনি যে পয়েন্টগুলা তুইলা ধরেন সেগুলা হইলো:
এক. ভারতের সংবিধানের ১৪ (আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান), ১৫ (ধর্ম, বর্ণ বা জেন্ডারের ভিত্তিতে কোন ডিস্ক্রিমিনেটরি আইন প্রণয়ন না করা) , ২৬ (ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার) ও ২৯ (সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা) নং ধারা অনুযায়ী এই বিল অসাংবিধানিক।
দুই. সেক্সুয়াল মাইনরিটিজ পার্সোনাল রাইট হিশাবে সমকামিতারে ডিক্রিমিনালাইজ করা হইছে, অথচ তিন তালাক, যা ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলমানদের ধর্মীয় প্রথা, তারে ক্রিমিনাল অ্যাক্টের আওতায় আনা হইছে।
তিন. পরকীয়া, যার কারণে অনেক ঘর ভাইঙা যাইতেছে, শিশুদের মানসিক সমস্যা হইতেছে, নারীরা অধিকার বঞ্চিত হইতেছে, অনেক পুরুষ নির্যাতিত হইতেছে এবং অনেক অপরাধ এই পরকীয়ার কারণে সংঘটিত হয়—এই পরকীয়ারে ডিক্রিমিনালাইজ করা হইছে। অথচ নারীর অধিকারের কথা বলে তিন তালাকরে ‘অসাংবিধানিক’ বলা হইতেছে।
চার. ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ বিল’-অনুযায়ী, কেউ যদি পাবলিক বেনিফিট ছাড়া কোন অর্থ গ্রহণ করে, তাইলে সেটা অপরাধ না। কিন্তু তিন তালাক অপরাধ।
পাঁচ. ভারতের আইন অনুযায়ী হিন্দুদের একপাক্ষিক ডিভোর্সের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক বছরের শাস্তি, কিন্তু এই ‘তিন তালাক বিল’ অনুযায়ী মুসলমানদের জন্য তিন বছরের শাস্তির কথা বলা হইতেছে।
ছয়. কেরালা রাজ্যের সাবরিমালা মন্দির, যেইখানে ১৩-৫০ বছর বয়সী নারীদের প্রবেশ নিষেধ, সুপ্রিম কোর্ট এইটারেও ‘অসাংবিধানিক’ বলছে। কিন্তু সরকারী দল এই রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে, এর বিরোধিতা করছে, তারা বলতেছেন, এইটা হিন্দুদের প্রথা ও বিশ্বাস। তাহলে মুসলমানদের প্রথা ও বিশ্বাসের উপর কেন এই হামলা?
সাত. সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে বলছেন ‘নন এস্ট’, অর্থাৎ তিন তালাকের কারণে বিয়া ভাঙবে না। বিয়েই যদি না ভাঙে, তাহলে কিসের জন্য আপনি তিন বছরের সাজা দিচ্ছেন?
আট. কারো গাড়ির সাথে ধাক্কা লাইগা কারুর মৃত্যু হইলে ২ বছরের শাস্তি। অথচ কম্যুনাল রাইটের আওতায় ‘তিন তালাক’ বলায় তিন বছরের শাস্তি?
নয়. ইসলামে তিন তালাক কোন প্রশংসনীয় কিছু না, বরং তালাকে মুগাল্লাযা গুনাহ। আপনি যদি মুসলিম নারীর রাইট চান, তাইলে অনেকভাবেই সেইটা বাস্তবায়ন করতে পারেন। ইসলামে বিবাহ একটি ‘চুক্তি’। আপনি এখন চুক্তিনামায় লেখেন যে, তিন তালাক দিলে তিনগুণ মোহর দিতে হবে। না দিলে জেলে নিন। কিংবা লেখেন যে, তিন তালাক দিলে এক তালাক হবে। ইসলামের ভেতরে থেকেই এর সমাধান সম্ভব। কিন্তু সরকার এ আইন প্রতিরোধে আলেম ওলামাদের পরামর্শ নিতেছে না। কারণ, তাদের মুসলিমদেরকে জেলে ভরতে হবে।
৩.
আসাদুদ্দিন ওয়ায়েসির সবগুলা পয়েন্টই আমাদের মতে জোরদার ও যুক্তিসঙ্গত।
প্রথমত, পৃথিবীর সকল ধর্মেই বিবাহ বিচ্ছেদের আইন আছে, নিয়ম আছে। এবং সেসব নিয়া হাজাররকম সমস্যাও আমাদের সমাজে আছে এবং থাকবে। কিন্তু সেইজন্য নির্দিষ্ট কোন ধর্মের বিবাহবিচ্ছেদ প্রথারে ‘বেআইনী’ বলা এবং তার জন্য তিন বছরের জেল স্পষ্টতই ধর্মীয় প্রতিহিংসামূলক। এমন না যে, ভারতে কেবলমাত্র মুসলিম নারীরাই এই তিন তালাকের মাধ্যমে নানা সমস্যায় পড়তেছেন। একতরফাভাবে বউরে পরিত্যাগ করার রীতি ও রেওয়াজ সমাজের সব কম্যুনিটির মধ্যেই প্রচলিত, রবং হিন্দুদের মধ্যে এর প্রচলন বরং বেশি; স্বয়ং মোদিজির বউ এর ভুক্তভোগী। তাইলে, বিশেষ একটা কম্যুন্টির পার্সোনাল ল’রে টার্গেট কইরা বিশেষ কম্যুনিটির জন্যে আইন বানানো কতটুকু যৌক্তিক?
দ্বিতীয়ত, হ্যাঁ, ধরা যাউক, অন্যান্য ধর্মে একতরফা ডিভোর্সের সম্ভাবনা থাকলেও, ইসলামে ব্যাপারটা ফেকাহর দৃষ্টিতেই সিদ্ধ। তাই তিন তালাকের ব্যাপারে এই বাড়তি পদক্ষেপ।
আমাদের আরজ এই যে—ইসলামে তালাকের বিধান রাখা হইছে, যাতে কোন দম্পতির সামনে নিজেদের যার যার পথে যাওয়ার পথ খোলা থাকে। ইসলামে বিবাহ একটি চুক্তি, জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধন না। তো, এইজন্যেই তালাক প্রথা। এবং, ইসলামে এই তালাক প্রথার সুন্দর ও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিও আছে।
কিন্তু কথা এই যে, একত্রে তিন তালাক, যারে তালাকে মুগাল্লাজা বা তালাকে বিদা বলে, এটির বিধান কী? হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, তিন তালাক খুবই গর্হিত ও গোনাহের কাজ। কিন্তু কেউ যদি তিন তালাক একত্রে দেয়, তাহলে তিন তালাকই হবে। এবং ভারতের মুসলমানরা হানাফি ফিকহের অনুসরণ করে। ধরা যাক, তিন তালাকের মাধ্যমে নারীর অধিকার লঙ্ঘন হইতেছে, তারা ব্যাপকভাবে নির্যাতনের সম্মুখীন হইতেছে। কিন্তু, যেমনটা আমরা আসাদুদ্দিন ওয়ায়েসির বক্তব্যে দেইখা আসছি—ইসলামি নিয়মের ভিতরে থাইকাই এই তিন তালাক প্রথার নেতিবাচক দিকগুলার সংশোধন সম্ভব। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এটিরে ‘অসাংবিধানিক’ বলার পরে, আইনপ্রণেতাদের উচিত ছিল মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের সাথে বসে এই ব্যাপারে আইন প্রণয়ন করা। কিন্তু ভারতের আলেম-উলামা ও মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের সাথে মশওয়ারা দূরে থাকুক, তারা উলটা ব্যাপারটারে ফৌজদারি অপরাধের কাতারে নিয়া গেছে।
তৃতীয়ত, সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, তিন তালাক দিলে বিবাহ ভাঙবে না, তালাকও হবে না। এবং তালাক বিল অনুযায়ী, জেলে থাকা অবস্থায় স্ত্রীর খোরপোষও স্বামীর দেওয়া লাগবে। তাইলে কোন অপরাধের ভিত্তিতে তিন বছরের শাস্তি হইতেছে? আমরা এ ব্যাপারে হয়রান।
চতুর্থত, অন্যান্য সব ধর্মের ক্ষেত্রে একতরফা তালাকের ব্যাপারটা সিভিল কোডের আওতায় আলোচিত। কিন্তু কেবলমাত্র তিন তালাকের ক্ষেত্রে, এইটারে কোন ইসলামসম্মত পদ্ধতিতে সংস্কার করা তো দূরে থাক, এরে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ বলা হইতেছে! অন্যান্যদের ক্ষেত্রে ‘সিভিল কোড’ থাকলেও, মুসলিমদের তিন তালাকের ক্ষেত্রে ‘ক্রিমিনাল অ্যাক্ট’ আরোপ করা হইতেছে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার কথা বলছে বিজেপি সরকার, আমাদের সবিনয় আরজ—সারা ভারতে কোথায় সেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি? আর কোন সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে একতরফা ডিভোর্স খোদ নিজেই একটি ক্রিমিনাল অ্যাক্ট, এবং সেজন্য তিন বছরের জেলের বিধান আছে?
পঞ্চমত, তিন তালাকরে ফৌজদারি অপরাধ বলা হচ্ছে। কিন্তু ভারতীয় সমাজে তিন তালাকের অপব্যবহার বা কোনরকম প্রাতিষ্ঠানিকতা ছাড়া যেনতেনভাবে তিন তালাক দেওয়ার রেওয়াজ কতটুকু? এইটা কি এতই বেশি যে, এখন এইটা একটি সামাজিক ব্যাধি বা সোশাল ইভিলে পরিণত হইছে? ব্যাপারটি তেমন নয় কিন্তু।
ভারতে তিন তালাকের বৈধতা নিয়া যখন সুপ্রিম কোর্টে শুনানি চলছিল, সেই সময় এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ভারতের মুসলিম সমাজে তিন তালাক দিয়া বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা বাস্তবে একেবারেই নামমাত্র, ১ শতাংশেরও কম। সমীক্ষাটি করছিলো সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ডিবেটস ইন ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিআরডিডিপি)। ১৬,৮৬০ জন মুসলিম পুরুষ এবং ৩৮১১ জন নারীর ওপর চালানো এই সমীক্ষা করা হয় চলতি বছর মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে। সমীক্ষার নেতৃত্বে ছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. আবু সালেহ শরিফ, যিনি ২০০৬ সালে ভারতীয় মুসলিমদের অনগ্রসরতা এবং বঞ্চনার তদন্তে গঠিত ঐতিহাসিক ‘সাচার কমিটি’র অন্যতম একজন সদস্য ছিলেন। সমীক্ষায় ৩৩১টি মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এগুলার এক-চতুর্থাংশ ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (যেমন কাজি) জড়িত ছিল। তবে সমীক্ষায় সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ফলাফল এই যে, ৩৩১টি ঘটনার মধ্যে কোনো সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়াই মুখে তিনবার তালাক উচ্চারণ কইরা বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ছিল মাত্র ১টি অর্থাৎ ০.৩ শতাংশ।
ষষ্ঠত, এই বিলরে ‘মুসলিম নারীর অধিকার রক্ষা’র বিল বলা হইলেও, আদতে এটি মুসলিম নারীর অধিকার হরণেরই বিল। এই বিল অনুযায়ী, তিন তালাকের মাধ্যমে বিবাহ ভাঙবে না, তিন তালাকও হবে না, কিন্তু স্বামীর তিন বছরের জেল হবে, তাও আবার ‘জামিনঅযোগ্য’! এই আইন যদি ‘ম্যারিজ রিকনসিলিশেয়ন’ বা বৈবাহিক সম্পর্ক অটুট রাখার জন্যেই হয়, তাইলে তিন বছরের জেলে আদৌ কি কোন লাভ আছে? যে স্বামী স্ত্রীর করা মামলায় তিন বছরের জেল খাটবে, তিন বছর পর এসে ওই স্বামী স্ত্রীর সাথে ‘সুখে-শান্তিতে ঘর করিবে’—এটা কোন পাগলও বিশ্বাস করবে না। উপরন্তু, কোন মেয়েই, তার নিজের সংসার এবং স্বামীর কাছে তার যেসব অধিকার সেসবের খাতিরেই, চাইবে না যে তার স্বামী তিন বছর জেল খাটুক।
মরার উপর খাঁড়ার ঘা দেখেন, এমনেই স্বামী জেলে, এইসময় এই মহিলার ভরণপোষনও নাকি স্বামীরই দিতে হবে! হলি ইন্ডিয়ান কাউ! যদি স্বামী বলে যে, আমি ভরণপোষণ দিতে পারব না, আমি জেলে, আমার চাকরি নাই—তখন সরকার কী করবে? কে এই মহিলার সংসার চালাবে? তিন বছর পর জেলফেরত স্বামী বউরে সোহাগ করে বুকে নেবে, এমন ভাবার কোন কারণ নাই। বরং, সে এইবার পাকাপাকিভাবেই এই বউরে ত্যাগ করবে। তখন এই নারীর দুর্দশাটা কী হবে কল্পনা করেন।
বোঝাই যাচ্ছে, নারীর অধিকার রক্ষার নামে এইটা আসলে একটা মুসলিম পরিবাররে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া।
এছাড়া, যেসব দেশে তিন তালাকের প্রথার কারণে নারীরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই দিকে লক্ষ্য রাইখা তালাকের জন্য আলাদা রাষ্ট্রীয় পন্থা ও প্রসিডার রাখা হইছে, সেসব দেশেও তিন তালাকরে কোন ‘ক্রিমিনাল অ্যাক্ট’ বলা হয় নাই এবং এজন্য কোন শাস্তির বিধানও কোথাও নাই। সুতরাং, এই তিন তালাক ইস্যু নিয়া বিজেপি সরকার যে ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে লিপ্ত, তা একরকম পরিষ্কার।
৪.
তিন বছরের জেল এবং ভরনপোষণের ইস্যুরে কেন্দ্র করে কংগ্রেসসহ অন্যান্য দলগুলির তীব্র বিরোধিতার মুখে গত সোমবার রাজ্যসভায় বিলটি পাশ হয় নাই। বিজেপির কথা হইলো, সুপ্রিম কোর্ট তিন তালাককে ‘অসাংবিধানিক’ বলছে এবং এ ব্যাপারে আইন প্রণয়নের কথা বলছে। কিন্তু কংগ্রেসসহ অন্যান্যদের পালটা যুক্তি এই যে, সংবিধান এরে ফৌজদারি অপরাধ বানাইতে বলে নাই, দণ্ডনীয় অপরাধ বলে নাই। এর কোন নজিরও ভারতের অন্যান্য কম্যুনিটিসহ অন্য কোন দেশে নাই। বিজেডি বা এমআইএডিএমকে-র মত দল, যারা অতীতে অনেক ব্যাপারেই সরকারের পাশে ছিল, তারাও এই ব্যাপারে কংগ্রেসের সাথেই আছে। এমনকি, একাধিক সূত্রমতে, বিজেপির এলাই জেডি (ইউ)-ও বিলের বিরোধিতা করতেছে। কিন্তু সরকার এই বিল পাশ করাইতে বদ্ধ পরিকর।
কালকে আবার বিলটা রাজ্যসভায় ওঠার কথা ছিল। রাজ্যসভায় বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ না হওয়ায়, তারা বিলটা পাশ করাইতে পারতেছে না। কংগ্রেসসহ অন্য বিরোধীদের দাবি হইলো, এই বিল আগে একটা সিলেক্ট কমিটির কাছে পাঠানো হোউক। তারা এর আইন, ধারা-উপধারাগুলো যাচাই-বাছাই করুক। এরকম একটা বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর আইন রাজ্যসভা যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু বিজেপি সরকারের নিয়ত খারাপ। গত সেপ্টেম্বরে ইতিমধ্যেই তারা একটি অর্ডিন্যান্স বা নির্বাহী আদেশ জারি করে, ঘুরপথে বিলটারে একরকম আইন বানায়েই ফেলছে।
মজার ব্যাপার, আমাদের দেশের মিডিয়ায় এই তিন তালাক ব্যানের বিষয়টি বেশ উৎসাহের সাথে প্রচার করা হইতেছে। আমাদের অনেক নামধারী সেক্যুলার ‘বাঙলাদেশেও তিন তালাক অবৈধ’ বইলা বিজেপিরে সমর্থন দিতেছে। কিন্তু বাঙলাদেশে তিন তালাকের ব্যাপারটা যে কোন ক্রিমিনাল অ্যাক্ট না, এরজন্য যে তিন বছরের জেল হয় না, যে কেউ অভিযোগ করলেই যে এইটা কার্যকর হয় না—এসব তারা বলতেছেন না। যেখানে ভারতের মিডিয়াতেও, তিন তালাক ব্যানের পক্ষের লোকেরাও এই বিলরে ‘বিদ্বেষমূলক’ বলতেছেন, সেখানে বাঙলাদেশের মিডিয়াগুলিতে এ ব্যাপারে সেক্যুলারদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মত। দিল্লি বহুত দূর হইলেও, দিল্লির স্বপনে বিভোর থাকা এইসব সেক্যুলারদের ঘুম ভাঙুক, আমাদের এই কামনা।
৫.
এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনালরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদি বলছেন, সাবরিমালার ব্যাপারটি হিন্দুদের প্রথা, বিশ্বাস। আর তিন তালাকের ইস্যুটি নারীর অধিকারের ইস্যু। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের শুনানির সময় এটর্নি জেনারেল মুকুল রোহাতগি সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন করেন যে, মুসলিম পার্সোনাল ল’র অন্যান্য ব্যাপার, যেমন—নিকাহে হালালা এবং বহুবিবাহ নিয়াও কোর্টের হস্তক্ষেপ করা জরুরি। এতে এই ধারণাই পোক্ত হইতেছে যে, মোদি সরকার এখন মুসলমানদের ঘরের ব্যাপারে হাত দিতে চাইতেছে, এবং অভিন্ন দেওয়ানি আইনের নামে তাদের ধর্মীয় অধিকার হরণ করতে চাইতেছে। সাবরিমালায় এখনও নারী প্রবেশ নিষেধ, এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর যত নারী এই মন্দিরে ঢুকতে চেষ্টা করছে, সবাই সামাজিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে চরম লাঞ্চনা ও হুমকির মুখে দিন কাটাইতেছে, সরকারের লোকদের পক্ষ থিকা তারা হুমকিতে আছে; অথচ মোদিজির যাবতীয় কনসার্ন তিন তালাক নিয়া। আমরা ভারতে ‘কাউ প্রটেকশন ল’ দেখছি। তিন তালাক বিলের নামে আর কোন ‘কাউ প্রটেকশন ল’ হউক—যেমনটা কবিতা কৃষ্ণন বলছেন—তা আমরা চাই না।
লেখক : কবি ও ক্রিটিক
