আসন্ন নির্বাচন: কী হতে পারে?

আবুল কাসেম আদিল

নির্বাচনের মাঠ আগে থেকেই অসমতল করে রাখা হয়েছে। বিরোধীদলের জনপ্রিয় নেতাদেরকে মামলার পর মামলা দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকার আদালতকে সহযোগী হিসেবে পেয়েছে, বা সহযোগী হতে বাধ্য করেছে। অনুগত বিচারকদের দিয়ে আদালতের আনুগত্য নিশ্চিত করা হয়েছে।আদালতের আনুগত্যে বিন্দুমাত্র সংশয় রাখা হয় নি। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ব্যাপারটা দিয়েই বুঝুন। আপিল বিভাগের বিচারপতি থাকার সময় থেকে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের মর্জিমত একটার পর একটা রায় দিয়ে গেছেন। আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই তিনি প্রধান বিচারপতি হয়েছেন। তাঁর বিগত দিনের ভূমিকায় সন্তুষ্ট হয়েই সরকার জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে ডিঙিয়ে তাঁকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়। তারপরও দানা পরিমাণ আনুগত্যে ঘাটতি থাকায় তাঁকে বেইজ্জত করে বিতাড়িত করা হয়েছে।

পরের ধাপে বিএনপির নির্বাচনযাত্রা বাধাগ্রস্ত করতে ভূমিকা রাখেন রিটার্নিং অফিসারেরা। যাদেরকে মামলার জালে ফাঁসানো হয়েছে, তাদেরকে ছাড়াই বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। রিটানিং কর্মকর্তারা ঠুনকো থেকে ঠুনকোতর অভিযোগে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করতে থাকে। এমনকি একজন প্রার্থীর মনোনয়ন গ্রহণ করতেই অস্বীকার করে। প্রার্থীর মনোনয়নে ত্রুটি থাকলে, তাঁর প্রার্থিতায় আইনগত বাধা থাকলে বাছাইয়ের সময় বাতিল হতে পারে, কিন্তু গ্রহণ করতেই অস্বীকৃতি জানানো বিস্ময়কর ঘটনা। ভাবতেও অবাক লাগে, এই নির্বাচনে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা এমনতর বিস্ময়কর ঘটনার জন্ম দিতে সমর্থ হয়েছেন। বিএনপি সরকার ও সরকার-অনুগত কর্মকর্তাদের দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে বুদ্ধিমানের পরিচয় দিয়েছে। বিএনপি প্রত্যেক আসনে একাধিকজনকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছে। রিটানিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশন বেশি সংখ্যক মনোনয়ন বাতিল করলেও যেন কোনো আসন প্রার্থীশূন্য না হয়।

এর পরের ধাপে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা। পদে পদে বাধা, হামলা, মামলা, গণগ্রেফতার। এর আগে কোনো নির্বাচনে এমনটা আর দেখা যায় নি, স্বয়ং প্রার্থীর শরীরে আঘাত করা। একজন ওসি, যার দায়িত্ব প্রার্থীকে নিরাপত্তা দেওয়া, স্বয়ং তিনি গুলি করে দিয়েছেন প্রার্থীর গায়ে—ভাবা যায়? তিনশ আসনের প্রতিটিতে পুলিশের মাধ্যমে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা অসহযোগিতার মুখোমুখি হয়েছেন, হচ্ছেন। গ্রামে-গঞ্জে প্রতি রাতে বিএনপিকর্মীদের বাড়িতে পুলিশ হানা দিচ্ছে, হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। বিএনপির সক্রিয় কর্মীদের বড় একটা অংশ জেলখানায়, আর বাকিরা আছে দৌড়ের ওপর। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সমানে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে প্রচারণা চালাচ্ছে। পুলিশের সামনে বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। পুলিশ নির্বৃত্ত করার চেষ্টা তো করছেই না, বরং অনেকসময় সহযোগিতা করছে। মির্জা আব্বাস ও আফরোজা আব্বাসের ওপর হামলার ভিডিওচিত্র দেখলে এমনটাই প্রতীয়মান হয়।

নির্বাচন কমিশনের কথা যত কম বলা যায়, ততই ভালো। কোথায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাকি এটা দেখতেই পাচ্ছেন না। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অনুপস্থিতি তাঁকে কে দেখাতে পারবে? দেখালেও তো তিনি দেখবেন না। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীকেও দেখানো যায়, বিবেকপ্রতিবন্ধীকে দেখাবে, এই সাধ্য কার!

এই পর্যায়ে এসে আবার ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনযাত্রায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আদালত। ইতোমধ্যে ঐক্যফ্রন্টের ১৫ জনের মতো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। একই ধরনের মামলায় দুই দলের প্রার্থীর ক্ষেত্রে দুই রকম রায় দিচ্ছে আদালত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে ছয় মাস আগে পদত্যাগ করা সত্ত্বেও বিএনপিপ্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদে থেকেও সরকারি দলের প্রার্থী নির্বাচন করতে পারছেন। অথচ সরকারি চাকরি ছাড়ার তিন বছরের মধ্যে নির্বাচন করতে না পারার বিধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়, কিন্তু সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার কথা। উল্টো ফল ফলেছে। সরকারি দলের প্রার্থীরা সংসদ সদস্যের মতো বেশি লাভজনক পদে বহাল থেকে নির্বাচন করতে পারছেন, অথচ উপজেলা চেয়ারম্যানের মতো তুলনামূলক কম লাভজনক পদে বহাল থাকায় ঐক্যফ্রন্টের কয়েকজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হলো। এভাবে বিভিন্ন অজুহাতে নির্বাচনের আগে হয়ত ঐক্যফ্রন্টের আরো অনেকের প্রার্থিতা বাতিল হবে। সেক্ষেত্রে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট ২০ থেকে ৫০টির মতো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে বঞ্চিত হবে।

শেষমেশ হয়ত বিএনপি ২৮০ থেকে ২৫০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে। ধারণা করি, নির্বাচনের আগের রাতে প্রত্যেক কেন্দ্রে যারা বিএনপির পক্ষে ভূমিকা রাখতে পারবে, তাদের বড় একাংশকে গ্রেফতার করা হবে। নির্বাচনের সময় একদিকে তাদেরকে মোকাবেলা করতে হবে আওয়ামী লীগের ক্যাডারবাহিনীকে, আরেকদিকে পুলিশকে। সরকারি দল ও প্রশাসনের সেদিনের কারচুপি যাতে প্রকাশ না পায়, সেজন্য সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মিডিয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে। শীর্ষ মিডিয়া কর্তারা এই নিয়ন্ত্রণে সরকারের ওপর অখুশি নয়। সেদিন তাদের ভূমিকা কী হবে, তাদের এখনকার ভূমিকা দ্বারা আন্দাজ করুন। যে মিডিয়া সামান্য ফেইসবুকের ভোট ৮১ শতাংশকে ৪৪ শতাংশ ও ১৯ শতাংশকে ৫৬ শতাংশ বলে প্রচার করে, জাতীয় নির্বাচনে এরকমটা করবে না এর নিশ্চয়তা কী? মিডিয়া নিঃসন্দেহে সরকারের ভোটচুরি আড়াল করবে এবং সেদিনের সকল অন্যায়কে বৈধতা দিতে প্রস্তুত থাকবে। তবু ভাবছেন, ইন্টারনেট আছে? ইন্টারনেটে সব অপকর্ম ছড়িয়ে পড়বে? সরকার এসবের থোড়াই কেয়ার করে। তারপরও যাতে ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেজন্য নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মোবাইল নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া যাবে না, ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়া হবে।

এতসব কিছুর পরেও ঐক্যফ্রন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতে যাবে? যেতেও পারে। কিন্তু জিতে গেলেও কথা আছে। নির্বাচনের পরেও বেশ কিছুদিন এই সরকারের মেয়াদ থাকবে। সরকারে থেকে নির্বাচন দেওয়ার সুফল তারা ঘরে তুলবে।ঐক্যফ্রন্টের নবনির্বাচিত কিছু এমপির সদস্যপদ আদালতের মাধ্যমে আটকে দেওয়া হবে, আর কিছু আসনে গোলযোগের অভিযোগ এনে ফলাফল বাতিল করা হবে। এরকম বিচিত্র উপায়ে মহাজোটের সংখ্যারিষ্ঠতা নিশ্চিত করা হবে। এই সরকারই আবার সুখে-শান্তিতে দেশ পরিচালনা করতে থাকবে। দৈবক্রমে অচিন্ত্য অসাধারণ কিছু ঘটা ছাড়া ঐক্যফ্রন্টের সরকারে যাওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা আপাতত দেখছি না।

লেখক: আলেম, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট