বেতন বাড়ছে না ইমামদের, কী ভাবছেন তাদের প্রতিনিধিরা?

ওমর ফারুক

মসজিদের ইমামরা সমাজের ধর্মীয় নেতা, আধ্যাত্মিক গুরু। স্বাভাবিকভাবে সমাজের অন্য আট দশজন মানুষ থেকে তাদের সম্মান ও মর্যাদা অনেক উর্ধ্বে। এমনকি মসজিদের এন্তেজামিয়া কমিটির থেকেও বেশি। তবে সময়ের প্রবহমান ধারায় আজ তারাই বেশি অবহেলিত। একদিকে তাদের প্রতি মসজিদ কমিটির অন্যায্য হস্তক্ষেপ অপরদিকে আর্থিক সঙ্কট। সব মিলিয়ে তারাই সমাজে অপেক্ষাকৃত অবহেলিত ও নিগৃহীত। এমনটাই মনে করছেন দেশের বিজ্ঞ মহল।

বিষয়টি স্বীকারও করেছেন ইমামদের প্রতিনিধিত্বকারী দেশের শীর্ষ সংগঠন ‘জাতীয় ইমাম ও উলামা পরিষদ’র নেতারা। তারা বলছেন, মসজিদ কমিটির অবহেলা ও অসচেতনতার কারণেই ইমামদের আর্থিক বিষয়টির প্রতি লক্ষ করা হচ্ছে না। এটি কোনোভাবেই উচিত নয়। তাদেরও ভালোভাবে বাঁচা ও জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ হিসেবে তাদের বেতন স্কিলও সে পর্যায়ের হওয়া উচিত।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পরিবার-পরিজন নিয়ে অভাব অনটনে দিনাতিপাত করছেন বেশির ভাগ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন। তারা এটাকে ভাগ্যের স্বাভাবিক ফয়সালা বলেই নীরবে সয়ে যাচ্ছেন সব ধরনের যন্ত্রণা। দেশের শহর ও গ্রামের মসজিদগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ফ্রি খাওয়া ও থাকার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে মসজিদে চাকরি করছেন সব এলাকার ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা। থাকা-খাওয়া ফ্রি হলেও বেতনের পরিমাণ অত্যন্ত কম। বেতন কমের পাশাপাশি দিন-রাত মসজিদে ডিউটি করেও নেই মানসিক স্বস্তি। প্রচণ্ড চাপের মুখে থাকতে হয় মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে।

এ বিষয়ে ‘জাতীয় ইমাম ও উলামা পরিষদ’র সেক্রেটারি ও ‘মাসিক আদর্শ নারী’র সম্পাদক মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী বলেন, এর কারণ ইমামদের প্রতি সাধারণ মানুষদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা। মনে করা হয়, ইমামরা আল্লাহওয়ালা মানুষ, আল্লাহ বিল্লাহ করবেন। কিন্তু তার যে সংসার রয়েছে, ছেলে সন্তান রয়েছে এসব বিষয়ে কারও নজর নেই।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির (২০০৯-১০ অর্থবছরে) চালানো এক জরিপে দেখা যায়, সারা দেশে জামে মসজিদের সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার ৩৯৯টি। ২০১৭ সালে এসে জামে মসজিদের এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ। আর এসব মসজিদে একজন ইমামের পাশাপাশি কোনো কোনো মসজিদে একাধিক ইমামও (সানি ইমাম) রয়েছেন। মসজিদগুলোতে রয়েছেন একজন করে মুয়াজ্জিন। ফলে সারা দেশে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব আর খাদেমের সংখ্যা প্রায় দশ লাখের কাছাকাছি হবে বলে ধারণা দিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

এ ১০ লাখ ইমাম মুয়াজ্জিনদের বেতনেরই বা উৎস কী? কিভাবে তাদের এ সঙ্কট দূর করা যায় এ বিষয়ে মুফতী শামসাবাদী বলেন, মসজিদ কমিটি সচেতন হলে এ বিষয়টি অগ্রসর হতে পারে। সমাজের অন্য মুসল্লীরাও মনে করেন এগুলো মসজিদ কমিটিরই দায়িত্ব। এখন তারা সচেতন হলেই ইমামদের উপযুক্ত বেতন দেওয়া সম্ভব। ইমামদের স্বচ্ছলতা ও ভালো জীবন যাপনের জন্য তাদেরকেই ভাবতে হবে। তাদেরকে মানবিক দায়িত্ববোধ হতে হবে। চেতনার অভাব ও সঙ্কীর্ণ মানসিকতা থেকেও তারা ইমামদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি চিন্তা করতে পারে না। তবে মসজিদ কমিটির সচেতনতার পাশাপাশি মসজিদের জন্য কোনো স্থায়ী আয়ের উৎসও রাখা উচিত। কোনো দোকানপাঠ কিংবা মার্কেট করে মসজিদের আয়ের দিকটি বৃদ্ধি পাবে । দানবক্সের ওপর থেকেও নির্ভরতা কমে আসবে। ইমামরা উপযুক্ত বেতন পাবেন।

কিন্তু ইমাদের বা ধর্মীয় সেবা প্রদান করে বেশি অর্থ নেওয়া দৃষ্টিকটু নয় কী? কিংবা শরিয়তে কী বৈধতা রয়েছে? এ বিষয়ে তিনি বলেন, শরীয়তে এ ধরণের কোনো বাধা নিষেধ নেই। তা থাকলেও তো এক টাকা দিলেও নিষেধ থাকবে পাঁচশ টাকা দিলেও নিষেধ থাকবে। তবে আমাদের পূর্বসূরারা অর্থাৎ মুতাকাদ্দিমীনরা ধর্মীয় সেবা প্রদান করে অর্থ গ্রহণ করতেন না। তখনকার প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এটার পরিবর্তন হয়েছে। সমাজের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষদের তুলনায় তাদের ধর্মীয় প্রতিনিধিত্ব করার জনসংখ্যা অনেক কম। ফলে পরবর্তী আলেম উলামারা ধর্মীয় সেবা দিয়েও অর্থগ্রহণ কিংবা জীবন জীবিকার উপকরণ গ্রহণ করাকে বৈধ করেছেন।

সরকারিভাবে ইমামদের জন্য কোনো বেতন কাঠামো রয়েছে কীনা? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যেয়ে জানা যায়, এসব মসজিদ পরিচালনা, পরিচালনা নীতি, কমিটি, মসজিদের পদবিসহ বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয় ২০০৬ সালের ১৫ই নভেম্বর ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নীতিমালায় মসজিদের আটটি পদের মধ্যে সর্বোচ্চ সিনিয়র পেশ ইমামের বেতন স্কেল নির্ধারণ হয়েছে ১৩৭৫০-৫৫০-১৯২৫০ টাকা আর প্রধান মুয়াজ্জিনের বেতন ৫১০০-২৮০-৫৮৫০-ইবি-৩০০-১০৩৬০ টাকা।

তবে তা প্রজ্ঞাপন প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। আজ পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের ভাগ্য বদলানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এছাড়া সারা দেশে ৪টি সরকারি মসজিদসহ হাতেগোনা কয়েকটি মসজিদ বাদে বাকি সব মসজিদ এলাকার মানুষদের দানে কমিটির মাধ্যমে বেসরকারিভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে। মসজিদ কমিটিই মসজিদের বেতন কাঠামো ঠিক করে দেয়। ইমাম-মুয়াজ্জিন নিয়োগ দিয়ে থাকে। গোটা মসজিদের কার্যক্রম তাদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত।

ইমাদের সর্বনিন্ম বেতন কেমন হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে মুফতী শামনসাবাদী বলেন, ইমামদের সবচেয়ে ছোট পরিবারটির জন্যও ১৫-২০ হাজার টাকার বেতন হলেও তারা প্রয়োজন পূরণ করতে পারবেন। তবে এটা নির্ভর করে পরিবার কাঠামোর ওপর। পরিবার কাঠামো বিবেচনা করেই তাদের বেতন ধার্য করা উচিত। সর্বোচ্চ ৪০-৫০ হাজারও হতে পারে।

ইমাদের বেতন বৃদ্ধির ব্যাপারে আপনাদেও সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কী? এ বিষয়ে তিনি বলেন, জাতীয় ইমাম ও উলামা পরিষদের উদ্দেশ্য ইমামদের ঐক্যবদ্ধতার মাধ্যমে সমাজের দ্বীনের হেফাজত ও বিদআত দূর করা। বেতন বিষয়ে দাবি তুলতে গেলে এসব কাজে বাধা সৃষ্টি হবে। তবে আমরা কৌশলী অবস্থান থেকে তাদের বুঝানো কিংবা লেখালেখির মাধ্যমে তাদের বুঝানের চেষ্টা করে যাচ্ছি।

রাজধানীর মুগদা থানার ইমাম পরিষদের সভাপতি মাওলান তোফাজ্জল হুসাইন মনে করেন, যদি ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সার্বিকভাবে উপযুক্ত সম্মানী দেয়া হয় তবে তারা মানসিক অস্থিরতা ও আর্থিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। তাদের দাওয়াত কিংবা টিউশনির ওপর নির্ভও করতে হবে না। ইমামদের যথাযথ সম্মান দিলে দেশ ও জাতি সবাই উপকৃত হবে। তাদের সম্মানী কম হওয়ায় একদিকে ইমামগণ জাতীয় কোনো ইস্যুতে কথা বলতে ভয় পান বা চুপ থাকেন এবং এ দুর্বলতার কারণেই অনেকে বিভ্রান্ত হন।

গ্রামাঞ্চলের মসজিদগুলোতে দেখা যায়, প্রায় মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন কাঠামো গড়ে ১০ হাজার টাকার অনেক নিচে। যা জীবন প্রয়োজনের এক তৃতীয়ংশও পূরণ করতে পারে না। এর মধ্যে সন্তানদের লেখাপড়া করানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবে পরিবার নিয়ে চলতে হিমশিম খেতে হয়।

মাওলান তোফাজ্জল হুসাইন মনে করেন, ইমামদের সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার হওয়া উচিত। ইমামদের পরিবার পরিজন দেখেই তাদের বেতন নির্ধারণ করতে হবে। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বেতন স্কিল বাস্তবায়ন করা হলেও তাদের জীবন মান কিছুটা উন্নয়ন হবে বলে তিনি মনে করছেন।