জীবন গড়ার দহলিজে

আবদুল্লাহ আল মাসউদ 

একটি জীবনের ভেতর লুকিয়ে থাকে হরেক রকমের অনুভব-অনুভূতি। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে তারুণ্য, তারুণ্য থেকে যৌবনে পদার্পণের গতিধারায় একজন মানুষ প্রত্যক্ষ করে নানান কিসিমের অভিজ্ঞতা। তাকে সামনে বাড়তে হয় বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে। এই দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় নিবিড়ভাবে তার সঙ্গী হয় রঙ-বেরঙের চিন্তা-চেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি আর বোধ-বুদ্ধি।

তারুণ্যের সিঁড়িতে পা রাখার আগে আমাকেও পাড়ি দিতে হয়েছে তারুণ্য-পূর্ব অনেকগুলো ধাপ। সেসব ধাপে ছিলো বৈচিত্র; ছিলো চিন্তার পালাবদল আর সময়ের স্রোত বেয়ে পরিবর্তন হওয়া ভাবনার বিভিন্নতা। দিন যত গড়িয়েছে, আমি তত ঋদ্ধ হয়েছি। ঋণী হয়েছি পরিপার্শ্বিক পরিবেশের কাছে।

শৈশব-কৈশোরের রঙিন দিনগুলো আমি কাটিয়েছি কওমি মাদরাসার চৌহদ্দিতে। মক্তবখানা, হেফজখানা আর কিতাবখানার মখমল-পরিবেশে। দিবারাত্রির ব্যস্ততা ছিলো পড়াশোনাকে ঘিরে। সেখানে পরিচিত হয়েছি ভিন্ন এক নুরানি জগতের সাথে। পেয়েছি পিতৃতুল্য স্নেহশীল শিক্ষকদের আদর-মায়া ও ভালোবাসা। দেখেছি সহপাঠীদের অপার্থিব ত্যাগ ও তিতিক্ষা বন্ধুবৎসল আচার-ব্যবহার।

মানুষ গড়ার কারখানা মাদরাসার এই জগতটাকে আমার কাছে কখনো মনে হয়েছে নিরবধি বয়ে চলা খরস্রোতা কো্নো নদী—যে নদী তার দু পাশের জনবসতিকে সবসময়ই রেখেছে সবুজ-শ্যামল ও সতেজ-সজীব। আবার কখনো মনে হয়েছে এটা নির্জীব-নিথর কোনো প্রান্তর—যেখানে নব জীবনের স্পন্দন যৎসামান্যই চোখে পড়ে; সবখানেই কম-বেশ একজাতীয় স্থবিরতা গলাগলি করে পড়ে আছে।

কেন যেন আমি এই জগতের রূপ-রঙের মূল শেকড়টা খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছি সবসময়ই। যখন যা সামনে পড়েছে, ধরে দেখেছি, ছুঁয়ে দেখেছি। সময়ের বাঁকে-বাঁকে ঘটিত ঘটনাগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছি। এই ঘরানা সেই ঘরানার সাথে মেশার চেষ্টা করেছি, ঘরানার ভেতরের উপঘরানার কাছাকাছিও যাবার চেষ্টা করেছি; বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার ডালে আর অলিগলির বাঁকে ঘোরার মূল মাকসাদ ছিলো এদেরকে পারস্পরিকভাবে তুলনা করা। এদের মধ্যকার ফারাকের মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো পরখ করা। এক উম্মাহ হয়েও কেন এরা আজ শত উম্মাহর জীবন যাপন করছে তার মূলে পৌঁছা।

মাদরাসা-জীবন সাধারণত আবাসিক হয়ে থাকে। উপমহাদেশের যত কওমি মাদরাসা আছে, প্রায় সবগুলো এই ধরনেরই। এই শিক্ষাব্যবস্থায় গড়ে-ওঠা একজন শিক্ষার্থীর চারিত্রিক ও নৈতিক উন্নয়নের পেছনে এর বিশাল বড় ভূমিকা আছে। সারাক্ষণই উস্তাদদের নিরাপদ পর্যবেক্ষণে ও কলুষতামুক্ত নুরানি পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে একজন শিক্ষার্থী চাইলেই পাপের পথে পা বাড়াতে পারে না। চাইলে সে অন্যায় কো্নো কাজে নিজেকে যুক্ত করতে পারে না। মাদরাসার নিয়ম-নীতি আর অনুশাসন তার ভেতর আপনাআপনি তৈরি করে দেয় ভালো পথে থাকার মানসিকতা ও অভ্যাস। আমলি পরিবেশ তার রক্ত-মাংসের সাথে মিশিয়ে দেয় পঠিত শিক্ষাকে বাস্তবায়ন করার দুর্বার সদিচ্ছা। তবে একটা বিশাল বড় শিক্ষাব্যবস্থার হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে গুটিকতকের অধঃপাত থাকতে পারে।; বরং এভাবে বললেই ব্যাপারটা বেশি মানানসই হবে—এমন থাকাটাই খুব স্বাভাবিক, না থাকাটা অস্বাভাবিক। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, প্রত্যেক বিষয়ে মূল বিচার্য হলো সামগ্রিক চিত্র। নইলে চাঁদের গায়েও তো দাগ আছে। তাই  বলে তো আর চাঁদকে অসুন্দর বলে দেওয়া সমীচীন হয় না।

কওমি মাদরাসার জীবনটাকে মোটাদাগে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায় : মক্তবখানার জীবন, হেফজখানার জীবন, কিতাবখানার জীবন। এই তিন জীবনের ধরন-বরন পুরোই আলাদা। অভিজ্ঞতাগুলোও ভিন্ন-ভিন্ন। অবশ্য প্রথম দুই জীবনের মধ্যকার ব্যবধানটা খুব বেশি দূরের না, কাছাকাছিই। এই তিন জীবনের প্রতিটি জীবনই একেকটি দৃশ্যপটের ন্যায়, যেখানে প্রতিনিয়ত চিত্রিত হতে থাকে বিচিত্র রকমের সব গল্প-ঘটনা। আবাসিক জীবনের এই জগত একটা আলাদা জগত। হাসি-আনন্দ, দুঃখ-বেদনাকে ঘিরে এটি আবর্তিত হয়।

মাদরাসায় যারা ভর্তি হয়, তাদের অনেকে স্বেচ্ছায় আসে, কেউ কেউ মা-বাবার চাপে পড়ে আসে আর অধিকাংশই স্বেচ্ছায়ও না, মা-বাবার চাপে পড়েও না, বরং মা-বাবার ইচ্ছায় আসে। মা-বাবা এসে ভর্তি করিয়ে দেয় আর ছেলেও হাসিমুখে তা মেনে নিয়ে পড়তে থাকে। মক্তবখানার ‘আলিফ-বা-তা-ছা’ দিয়ে শুরু করে একদিন পৌঁছে যায় কিতাবখানার ‘ওয়াবিহি ক্বলা হাদ্দাসানা’র হাদিসের দরসে। আলোকিত মানুষ হয়ে ফিরে আসে সমাজের কোলে। দিকে দিকে ছড়িয়ে দেয় শাশ্বত ধর্ম ইসলামের সুমহান শিক্ষার অমীয় সুধা।

আমি মাদরাসায় এসেছিলাম স্বেচ্ছায়। নিজ আগ্রহে। কেউ জোরাজুরি করেনি। চাপ প্রয়োগ করেনি। তবে এই আগ্রহের বীজটা হৃদয়ের জমিনে সুনিপুণ কৌশলে বপন করেছিলেন আমার বাবা। সেই কৌশলের বিবরণী দিয়েই মাদারাসার দহলিজে আমার প্রথম পা রাখার কিচ্ছাটা শোনাবো…

(চলবে)

লেখক : আলেম ও অনুবাদক