বিএনপি ও জামায়াত: সম্পর্কের নতুন সমীকরণ।। আবুল কাসেম আদিল

আবুল কাসেম আদিল

একসময় বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন বলতে জামায়াতের আন্দোলন বোঝাত। অর্থাৎ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত যৌথ হলেও মাঠে দেখা যেত শুধু জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদেরকে। যৌথ আন্দোলকে লোকক্ষয় করে জামায়াত একাই সফল করে তুলত। যৌথ আন্দোলন ছাড়া বিএনপির একক আন্দোলনেও শিবিরের নেতাকর্মীদেরকে মাঠে দেখা যেত। অথচ জামায়াতের একক আন্দোলনে বিএনপি-নেতাকর্মীদেরকে কখনও মাঠে দেখা যায় নি। কেন্দ্রীয় বিএনপি জামায়াতের আন্দোলনে মাঝেমধ্যে ‘নৈতিক সমর্থন’ দিলেও, অনেকসময় তা-ও দিতে কার্পণ্য করত।

বিগত যৌথ ও একক আন্দোলনে জামায়াতের বিপুল পরিমাণ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন, এ কারণে হোক, অথবা বিএনপির প্রতি অভিমানে হোক — সাম্প্রতিক নির্বাচনে অভিমানের প্রকাশ দেখা গেছে — জামায়াতের নেতাকর্মীদেরকে বিএনপির নিকট অতীতের আন্দোলনে দেখা যায়নি। যেদিন থেকে জামায়াত আন্দোলনবিমুখ হয়েছে, সেদিন থেকে বিএনপির আন্দোলন জৌলুস হারিয়েছে। বিপুল জনসমর্থিত দল বিএনপির এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার জনসমর্থন আছে, কিন্তু এককভাবে আন্দোলন করার মতো সাহসী কর্মী নেই। অন্যদিকে জামায়াতের জনভিত্তি দুর্বল হলেও আন্দোলন সফল করার মতো কর্মী তাদের আছে। কারণ জামায়াতের প্রতিটি ভোটারই কর্মী। এই যখন বাস্তবতা, তখন বিএনপির জন্য জামায়াত এবং জামায়াতের জন্য বিএনপি অনিবার্য। আন্দোলনের মাঠে জামায়াত বিএনপির আর ভোটের মাঠে বিএনপি জামায়াতের জন্য সহযোগী।

কিন্তু আন্দোলন করে সরকারের পতন অথবা দাবি আদায় করা যাবে, এমনটা সম্ভবত আর কেউই মনে করছেন না। আন্দোলন করে সরকারের পতন ঘটানো গেলে এই সরকারের কয়েকবার পতন হয়ে যেত। একটি নয়, কয়েকটি সরকারের পতন ঘটানোর মতো আন্দোলন বিএনপি-জামায়াত এই সরকারের প্রথম পাঁচ বছরে করে ফেলেছে। আন্দোলনের মাঠে দল দুটি বিপুল পরিমাণ নেতাকর্মী হারিয়েছে। এখন দল দুটির নেতাকর্মীরা শারীরিকভাবে ক্লান্ত, মানসিকভাবে ভীত। ফলে বিএনপি-নেতারা বিগত কয়েক বছর ধরে মাঠের আন্দোলনের চেয়ে কূটনৈতিক তৎরপরতার দিকে বেশি ঝুঁকেছেন। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী বিএনপির রাজনীতি কূটনৈতিক তৎপরতায় সীমাবদ্ধ। কূটনৈতিকভাবে তারা কতটা লাভবান হয়েছেন, আদৌ হবেন কি না— সে প্রশ্ন থাকছেই। কিন্তু দেশে মাঠে নামার মতো যখন ন্যূনতম পরিবেশও নেই, শান্তিপূর্ণভাবে একটা মানববন্ধন করার মতো সুযোগও সরকার দিচ্ছে না— তখন এছাড়া তাদের আর করার কী! মনে রাখতে হবে, বিএনপিও কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিই করে। ক্ষমতার রাজনীতি যারা করে, তাদের সকল দোষগুণ বিএনপি-নেতৃত্বের মধ্যে আছে। ফলে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এবং সরকারের রোষানল থেকে বাঁচার জন্য সম্ভাব্য সকল চেষ্টাই তারা করবে বা করছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা তারই অংশবিশেষ। এই কূটনৈতিক তৎপরতায় যদি তাঁরা বুঝে থাকেন জামায়াতের কারণে তা সফল হওয়ার নয়, ইসলামি দল জামায়াতের সঙ্গ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করছে, আর সেকারণে যদি বিএনপি জামায়াত থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে চায়— তাহলে আমার মনে হয় জামায়াত-নেতাদের তা ইতিবাচকভাবেই দেখা উচিত। বিএনপি যদি এককভাবে অথবা ড. কামালদের সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় আসতে পারে, তা জামায়াতের জন্য আওয়ামী লীগের চেয়ে তো খারাপ কিছু হবে না।

জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের মনে রাখা উচিত যে, তাঁরা বিগত দশ বছরে বহু কিছু হারিয়েছেন। তাঁদের আর হারানোর কিছু নেই। তাঁদের আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। ভোটের রাজনীতির চেয়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক রাজনীতিকে প্রাধান্য দিলে অতিদ্রুত অনিবার্য শক্তিরূপে তারা বিবেচিত হবে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রভাবক হতে পারলে একটি আসন না পেয়েও রাজনৈতিকভাবে দেশ ও ধর্মের কল্যাণ করতে পারবে। এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে যদি প্রয়োজন হয়, জামায়াতেরই উচিত বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট ছেড়ে দেওয়া। তা হবে বিএনপি-জামায়াত দুই দলের জন্যই মঙ্গলজনক। একই কথা বিশদলভুক্ত অন্যান্য ইসলামী দলের জন্যও প্রযোজ্য।

তবে কথা থেকে যায়— বিদেশি শক্তির মদদে ও সমর্থনে ক্ষমতায় আবির্ভূত সরকার দেশ ও ধর্মের জন্য কল্যাণকর হতে পারবে কি? হ্যাঁ, সামগ্রিকভাবে এই প্রবণতা কল্যাণকর নয়। কিন্তু একটি মাত্র দেশের মদদ ও সমর্থনে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার যেভাবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে একমুখী করে ফেলেছে, একটি মাত্র দেশের স্বার্থে একের পর এক জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, অবিচার ও অপবিচারের সংস্কৃতি চালু করেছে, বিরোধী মতের লোকদেরকে ধারবাহিকভাবে গুম-খুন করছে— বিএনপি কি এতটা অকল্যাণকর হতে পারবে? কল্যাণকর না হলেও বেশি অকল্যাণকর না হলেই মন্দের ভালো মনে করা যেতে পারে।

একই কথা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিষয়েও। বাম প্রভাবিত বিএনপি বাম প্রভাবিত আওয়ামী লীগের চেয়ে ক্ষতিবৃদ্ধি করতে পারবে না। কতটুকু কল্যাণ তারা করতে পারবে, সে বিষয়ে খুব আশাবাদী নই। কিন্তু জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দলের জন্য আওয়ামী লীগের চেয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বেশি ক্ষতিকর হবে না— এটুকু মনে করতে পারি। তাছাড়া জামায়াত এবং অন্যান্য ইসলামী দলকে মেনে নিতে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা রাজি হয়েছেন, আলামতে তা-ই বোঝা যাচ্ছে। ঐক্যফ্রন্ট প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় জমিয়ত-মহাসচিব মুফতী নূর হোসাইন কাসেমীকে দাওয়াত দিয়ে ঐক্যফ্রন্ট-নেতারা প্রাথমিকভাবে সেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তারপরও জামায়াতের বিষয়ে তাদের সংশয় ছিল। প্রথমে ঐক্যফ্রন্ট-নেতারা চাইছিলেন শুধু বিএনপির সঙ্গে নয়, জামায়াত ছাড়া বিশদলীয় জোটভুক্ত সকল দলের সঙ্গে অভিন্ন ঐক্য হবে। বিএনপিনেতারা শেষ পর্যন্ত জামায়াত ছাড়া ঐক্য করতে রাজি হননি। শেষমেশ একটা সুরাহা হলো। সুরাহাটা হলো এভাবে— গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, জাসদ (রব) এই দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির ঐক্য হবে। বিএনপির সঙ্গে আলাদা করে আর কোন কোন দলের ঐক্য আছে, এটি সদ্যগঠিত ঐক্যফ্রন্টের দেখার বিষয় নয়। এভাবে জামায়াতকে ঐক্যফ্রন্টে না রাখলেও বিএনপি-নেতৃত্বাধীন বিশদলীয় জোটে রাখার পদ্ধতি আবিষ্কার করা হলো। জামায়াত বিষয়ে ছুঁৎমার্গ জিইয়ে রেখেই অচ্ছুৎ দলটির ভোট নিজেদের বাক্সে পাওয়ার উত্তম তরিকা আবিষ্কৃত হয়। বলা যায়, ঐক্যফ্রন্ট-নেতারা বিএনপির সঙ্গে জামায়াতসহ অন্যান্য ইসলামী দলের জোট মেনে নিতে রাজি হয়েছেন। এমন কি এই প্রক্রিয়ায় বিকল্পধারা রাজি না হওয়ায় বিকল্পধারাকেই ঐক্যফ্রন্ট-নেতারা বাদ দিতে দ্বিধা করেননি।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট