স্বীকৃতির অলীক কল্পনা

মনযূরুল হক

যাই হোক, বহুদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক বুজরুকির মধ্য দিয়ে হলেও কওমি শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যন্ত তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন। যে সরকার তাদের এই স্বীকৃতি দিয়েছে, বৃহৎ পরিসরে তাদের সংবর্ধিত করার আয়োজন চূড়ান্ত। এর আগে শোকরানা মাহফিল, মিছিল, জনমান্য আলেম-আল্লামাগণের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে যারপরনাই অভিনন্দন ইত্যকার বিচিত্র কর্মসূচী সম্পন্ন হয়েছে ঘটা করে। স্বীকৃতির ফলে কী লাভ হয়েছে, কতুটুকু সামনে এগুনো গেছে—প্রসঙ্গক্রমে আলোচনা জারি আছে। স্বীকৃতি দাবির সময়ও বিভেদ ছিল—কেনো স্বীকৃতি চেয়েছি, কোন কোন সুবিধার কথা মাথায় রেখে স্বীকৃতির জন্যে আন্দোলন করেছেন শিক্ষককুল ও শিক্ষার্থী সমাজ ইত্যাদি; একইভাবে স্বীকৃতির পরেও কতটুকু লাভ-ক্ষতি হয়েছে এবং সেমতে সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির মাত্রা বিচার-বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। হচ্ছেও বোধ করি। যারা স্বীকৃতি আদৌ চাননি কিংবা এর ফলে কওমিদের কতটা ‘ভয়াবহ পরিণতি’ বরণ করতে হবে সেকথা বারংবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এখনও নানান সুযোগে খোঁচা মেরে আনন্দ পেতে চাচ্ছেন, শোকরানার উচ্ছ্বাস তাদেরও ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে।

এক.
কওমিতে যেসকল অভিভাবক তাদের সন্তানদের পাঠান, তাদেরই-বা প্রত্যাশা কী ছিল এবং এখন স্বীকৃতির পরে অন্যান্য শিক্ষাধারার বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন, কী ভাবছেন—সেই ভাবনাও এখন আর গায়ে মাখার সময় নেই। অথচ আরও প্রায় বছর বিশেক আগে, যখন স্বীকৃতির আবেদন কেবল ফেনাচ্ছে, বুদ্ধিজীবী মহলের কেউ বলেছিলেন—‘মাদরাসা শিক্ষিতরা এতোটাই দাম্ভিক যে, নিজেদের শিক্ষার বাইরে আর কিছুকেই তারা শিক্ষা মানতে রাজি নয়। আমরা তাহলে ফেলনা শিখছি? আমরা যা শিখছি, মুসলিম হিসেবে তা শেখার অধিকার কি আমাদের নেই?’ একজন মুশীর তখন উত্তর দিয়েছিলেন (তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যেই হবে)—‘না, যে বিদ্যায় রাষ্ট্র চালনা হয়, সমাজ ও সমর চলে, অসুখ সারে, উপকারী আবিষ্কার সম্ভব, সে বিদ্যা ইলমে অহির অংশ বৈ নয়; পরিপন্থী তো নয়ই।’ অভিভাবকদের তখন প্রশ্ন ছিল—‘আমাদের রুটি-রুজির সংস্থান খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকলে কোন ভরসায় সন্তানদের মাদরাসায় পাঠাব? কোনোমতে ওপারের দরিয়াটা পাড়ি দেওয়ার কোনো শর্টকাট সাজেশন কি নেই? ১২ বছরই লাগবে?’ আজ বিশ বছর পরে যখন ঢাকার বিখ্যাত কোনো মাদরাসায় সিভিক এডুকেশনের ক্লাস-প্রপোজাল নিয়ে যাই; যেখানে মৌলিক পুলিশি আইন, সংসদ, সংবিধান, নাগরিকত্ব, মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন ও নির্বাচন কমিশনের মতো গণতান্ত্রিক প্রতষ্ঠানগুলির কার্যাবলি সম্পর্কে প্রাথমিক পাঠ থাকবে, তখন মাদরাসা কর্তৃপক্ষ থেকে প্রথমেই প্রশ্ন থাকে—আপনারা কি অন্য কোথাও এটা করেছেন? আমরা উত্তর দিই— হুজুর, আপনারা সবসময় পিছনে কেনো থাকতে চান? কেনো ফার্স্ট হতে চান না? কেউ করার পরেই কেনো করবেন? কেনো প্রথমে নয়?

এইসব বলা হলো, কেননা, স্বীকৃতি পাওয়ার আগে যে-কোনো শিক্ষাব্যবস্থাকে সব শ্রেণির মানুষের কাছে একটা ন্যায্যতা প্রমাণ করতে হয়। মনীষীরা যাই বলুন, যদি গড়পড়তা সাধারণ মানুষের বড় একটা অংশ তা অন্যায্য মনে করেন, তবে তা লেজিটিমেশন ক্রাইসিস বা ‘ন্যায্যতার সংকট’-এর মধ্যে পড়ে। এই ন্যায্যতা কেতাবি যুক্তির ধার ধারে না। এটা নির্ভর করে মামুলি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার ওপর। তার খাওয়া-পরা, জীবিকার নিরাপত্তা আর সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার ওপর। যুক্তির বিচার যতো অকাট্যই হোক সামাজিকতার নিজস্ব কিছু বিচার-বিবেচনা আছে, যা তার নিজস্ব যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। এই দুটি ভিন্ন যুক্তি, এদের মধ্যে সঙ্গতি আনতে না পারলে প্রাপ্তি সম্ভব হয় না। শিক্ষার ক্রিয়াকলাপ, যার পারস্পরিক সম্পর্ক মিলে একটা সমাজনীতি তৈরি হয়, সাধারণের সমাজেই যার অস্তিত্ব তাকে নানান সামাজিক ও রাজনৈতিক শর্ত মেনেই টিকে থাকতে হয়। তাকে বদলাতে গেলেও সেই শর্ত মেনেই বদলাতে হয়। বদলানোর প্রশ্ন উঠল, কেননা, স্বীকৃতির আন্দোলন যতটা জোরালো হয়েছে, শিক্ষাসংস্কারের শ্লোগান ততটা নয়। দীর্ঘ শতবর্ষ একাদিক্রমে একই সিলেবাস ও শিক্ষানীতিতে চলাটা আমাদের কাছে প্রায় অভ্যাসের মতো হয়ে গেছে; এমনকি সিলেবাসের পাঠ্যতালিকায় যা আছে, তার কোনো কোনোটি কয়েকশ’ বছর আগে লিখিত। প্রসঙ্গক্রমে মনে রাখা দরকার, পাঠ্যবই আর রেফারেন্স বই এক নয়, হওয়া জরুরিও নয়। রেফারেন্স গ্রন্থকেই পাঠ্য করার স্টাইল সেকেলে এবং পুরাতন। বরং প্রয়োজনীয় টপিক শিক্ষাটাই সিলেবাস থাকে এবং রেফারেন্স তাকে শক্তিশালী করে। যাই হোক, যতই বলি যে, আমরা ফর অলটাইম মডার্ন, সেকেলে নই, কিন্তু আমাদের সিংহভাগ শিক্ষাবিদই সংস্কারের আনুষঙ্গিক দায় নিতে রাজি হননি। অতএব, স্বীকৃতি হলেও তার সুফল কতটা আসবে, তার আশঙ্কা শুরু থেকেই ছিল। তবে এটা ঠিক যে, যদি সামাজিকতার ভাষা না বুঝে একটা সময় ভূগোল-বিজ্ঞান বাধ্যতামূলক করা হয়, আর ছাত্রদের উদাসীনতার প্রতি দোষ চাপানো হয়, তাতেও লাভের ফল হাতে মিলবে না। তাছাড়া সংস্কার আর পরিবর্তনটা ঠিক কোথায় প্রয়োজন তা কখনো কেউ স্পষ্ট করে বলেছেন বলেও মনে হয় না। আমাদের ধারণা, সম্ভাব্য দুটি দিক বিবেচিত হতে পারতো—সিলেবাস সংস্কার ও তৃণমূল পর্যায়ে গর্ভনিং বডি সংস্কার। সাথে শিক্ষার্থীদের সামনে অন্তত উপকরণ অর্জনের পথটুকু নিষ্কন্টক হওয়া এবং ক্যারিয়ার গঠনের বিচিত্র মাধ্যম হাজির থাকার বন্দোবস্ত রাখাও জরুরি ছিল।

দুই.
কওমি শিক্ষাধারার মধ্যে যেসব স্তরবিন্যাস আছে—ইবতেদাইয়াহ, মুতাওয়াসসিতা, সানুবিয়া, ফজিলত—এগুলোর কোন সুরাহা না করে কেনো কেবল দাওরা বা তাকমিলকে মাস্টার্স স্বীকৃতি দেওয়া হলো, এটা একটা ন্যায্য প্রশ্ন। যদিও কওমি শিক্ষাবিদগণ যুক্তি দেন যে, আইনে সুযোগ আছে বলেই দেওয়া হয়েছে, না থাকলে তো হতো না। কিন্তু এভাবে একটা শিক্ষাব্যবস্থা স্বীকৃত থাকলে কন্টেম্পরারি শিক্ষাবিদদের কাছে তা নৈতিক বৈধতা কতখানি পাবে—সে প্রশ্নের কথা বোধকরি তারা ভাবছেন না। একটা ছেলে প্রাইমেরি থেকে স্নাতক পর্যন্ত নানাস্তরের কোনো পর্যায়েই শিক্ষিত নয়, কেবল হঠাৎ করে একটি পরীক্ষা দিয়ে সে মাস্টার্সমানের শিক্ষিত কিভাবে হয়ে যায়? এতদিন যে শিক্ষাধারার ছাত্ররা শিক্ষিত বলেই গণ্য হতেন না, বুঝলাম, তাদের জন্যে এতে শিক্ষিত পরিচয় দেওয়ার একটা সুযোগ হয়েছে, কিন্তু ফজিলত (স্নাতক) পর্যন্ত পড়ে দীর্ঘ ১১টি বছর পার করেও সে কেনো তাহলে শিক্ষিত বলে গণ্য হবে না? কেবল ১টি বছর বা বলা যায় ১টি ক্লাস-পরীক্ষাই শুধু তাদের শিক্ষিত হওয়ার মানদণ্ড? কেবল ওই একটা ক্লাস যদি কেউ পড়েন, তাহলেও তিনি মাস্টার্স-সমমান শিক্ষিত বলে গণ্য হবেন? এখন আপনি যতই আইন করেন যে, মেশকাত বা ফজিলত দ্বিতীয় বর্ষে তাকে উত্তীর্ণ হতে হবে, তাহলে তারও যৌক্তিক ভিত্তি লাগবে যে, মাস্টার্সপাশের আগে বাধ্যতামূলক ওই যে পরীক্ষাটা, ওটা মেট্রিক বা ইন্টারের মতো মূল পরীক্ষাপর্বের পূর্বের যাচাই পরীক্ষা কি না? সেই পরীক্ষা কেউ না দিয়ে যদি তাকমিল পরীক্ষা দেয় বা দিতে চায়, আইনিভাবে তাকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের কতখানি আছে?

বিরাট একটি অংশ সোজা মাস্টার্স স্বীকৃতি দানের পক্ষে একটা মুখস্ত যুক্তি দেন—ফুলডোজ যুক্তি। অর্থাৎ এটা এমন একটা শিক্ষাধারা যেখানে এন্টিবায়োটিকের মতো ফুলডোজ না খেলে তার রোগের উপশম হবে না। তাই তাকে অন্যান্য শিক্ষাধারার মতো মধ্যিখানে কাউকে স্বীকৃতি দেওয়া চলবে না। তাতে করে শিক্ষার্থীরা বিন্দাস হয়ে পড়বে এবং আধ-আলিয়া কিংবা আধ-জেনারেলের সঙ্গে কওমি চেতনাকে গুলিয়ে ফেলবে। ফলশ্রুতিতে সে রোগাক্রান্তই থেকে যাবে। আসলে এটা একটা ফাঁপা যুক্তি। এতে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে—যারাই কওমি শিক্ষার জন্যে মাদারাসায় যান, তারা সবাই কি রোগাক্রান্ত? কী সেই রোগ? দ্বিতীয়ত: এই ডোজের দৈনিক-সাপ্তাহিক-মাসিক-বাৎসরিক পরিমাণ কতটুকু? অর্থাৎ প্রতিদিন তাকে কয়টি করে ট্যাবলেট খেতে হবে? প্রশ্নটা এজন্য করলাম যে, যে-ছেলেটা কওমিতে ৫ বছর পড়ল এবং প্রতিটি পরীক্ষায় ৮০ করে পেলো, সে এবং যে ছেলেটি ১০ বছর (ফজিলত পর্যন্ত) পড়ল এবং ৪০ করে পেলো, অর্থাৎ কোনোমতে পাশ করল, এই দুজনই কি সমান রোগাক্রান্ত? দুজনেই সমান অপরাধী? আর যে ছেলেটা কোনো ক্লাসে পাশ আবার কোনো ক্লাসে ফেল করে টেনেটুনে তাকমিলে উঠল, হাদিসের ইবারতও শুদ্ধভাবে পড়তে শিখল না, সে কেবল ১২টি বছর সময় কাটানোর কারণেই রোগমুক্ত? অর্থাৎ এখানে মূলডোজটা শিক্ষা নয়—সময় কাটানো। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, এখনও আমাদের বেশিরভাগ মাদরাসার তাকমিল ক্লাসের ছাত্ররা একদশক ধরে আরবি পাঠ্যবই পড়েও তিনভাগের দুইভাগ ছাত্র (কোনো কোনো মাদরাসায় তার চেয়েও কম) হাদিসের ইবারত (অর্থ-মর্ম নয়) পড়তে পরে না। তাহলে এই ডোজের মর্মকথা কী?

তিন.
কওমি স্বীকৃতির ফলে একটা বড় সুবিধা হলো যে, তারা রাষ্ট্রের মূল কাঠামোতে আসার সুযোগ পাবে। ‘রাষ্ট্রের মূলকাঠামোতে’ যুক্ত হওয়ার প্রসঙ্গে কয়েকটি গুরুতর কথা বলে নিতে চাচ্ছি।

আমাদের সময় একটা বড় চ্যালেঞ্জ হলো উগ্রপন্থা (জিহাদ নয়)। একটা থিওরিটিকাল ভুলের ফলে ইসলামি উগ্রপন্থার উত্থান হয়েছে বলে মনে হয়; যার সঙ্গে আলেমদের রাষ্ট্রের মূলকাঠামোতে যুক্ত হওয়ার একটা সম্পর্ক আছে। কথাটা খোলাসা করি। উগ্রপন্থার উত্থানের পিছনে বড় কারণ যে, মুসলিমবিশ্ব বিভিন্ন স্থানে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষোভ—এ বিষয়ে সম্ভবত কেউ দ্বিমত করবেন না। অমুসলিমগণ, হোক সে হিন্দু, খ্রিষ্টান বা বৌদ্ধ, তারা মুসলিম জাতি ও দেশগুলিতে আক্রমণ করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে। পুরো পৃথিবীতে যতগুলো বা যত স্থানে মুসলিম জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হচ্ছে, তার মধ্যে মনে হয় এমন একটিও পাওয়া যাবে না, যেখানে অমুসলিমগণ মুসলিম দেশে থেকে মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গোপনে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে মুসলিমদের উপর চোরাগুপ্তা হামলা চালাচ্ছে। বরং এটা সারাবিশ্বের যারা করছে, তাদের পরিচয় মুসলিম। বিভিন্ন অমুসলিম দেশে রাষ্ট্রের আইন ভঙ্গ করে অমুসলিমদের আক্রমণ করে তারা। অথচ ভিন্নধর্মীরা যখন আক্রমণ করে রাষ্ট্রীয়ভাবে, উচিত ছিল মুসলিমদেরও রাষ্ট্রীয় জায়গায় থেকে জবাব দেওয়া। সেটা মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানরা দেন না। এর একটি কারণ হলো, অমুসলিম রাষ্ট্র যখন আক্রমণ করে, তখন তারা বিশ্বাস বা ধর্মের কথা বলে না, বরং সাম্য, গণতন্ত্র, সমৃদ্ধি, মানবতার কথা বলে আক্রমণ করেন। কিন্তু মুসলিমগণ যেহেতু ধর্মীয় ভিত্তিতে বিশ্বমুসলিমকে নিজের ভাই মনে করেন, তাই তারা প্রতিরোধ করতে চান বিশ্বাসের ভিত্তিতে (গণতন্ত্রে তাদের বিশ্বাস নেই, বাধ্য হয়ে জড়িত থাকতে হয়)। এই বিশ্বাস ধর্মযুদ্ধের আহ্বান করে এবং তাকে জিহাদ বলে আখ্যায়িত করা হয়—যদিও অমুসলিমরা মুসলিম দেশে তাদের আক্রমণকে ক্রুসেড বলে না (মুখ ফসকে বলে থাকলে, সে-কথা ভিন্ন)। সঙ্গত কারণেই আক্রান্ত দেশের মানুষ তো বটেই, অন্যান্য দেশের প্রবল ধর্মানুরাগীরা এতে ব্যথিত হন। তারা চান তাদের রাষ্ট্রের সরকার প্রধানগণ একটা বিহিত করুন। যখন দেখেন রাষ্ট্রপ্রধানরাও তাদের নিজস্ব শক্তিমত্তার অভাবে এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের দুর্বলতার কারণে মুসলিমদের রক্ষায় বিশ্বাসের জায়গা থেকে এগিয়ে আসছে না, তখন তাদের একটি শ্রেণি উগ্রবাদি অবস্থানে চলে যায়। তারা ব্যক্তিগতভাবে ও দলবদ্ধ হয়ে নিজের রাষ্ট্রেরও বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। আর অন্য শ্রেণি নীরবতা অবলম্বন করে। বিস্ময়ের কথা হলো, এই দুটি শ্রেণির একটিও নিজেদের রাষ্ট্রের লাগাম হাতে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করে না। সেজন্যে বর্তমানবিশ্বে পপুলার সিস্টেম অর্থাৎ জনমত যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায়ও তারা অংশগ্রহণ করে না। বরং রাষ্ট্রকে অচ্ছুৎ ভেবে দূরে থাকাকেই নিরাপদ মনে করে। এভাবেই একটি দল ইনোসেন্ট হয়ে রাষ্ট্রের মূলঅধিপতিদের করুণা নিয়ে বেঁচে থাকে, আর আরেকটি দল ইসলামকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করার কর্মসূচী চালিয়ে যায়। ক্ষমতাবান বিশ্বের চোখে দুটি শ্রেণিই সমান। এখানে একটা ভয়াবহ গুরুত্ব ধারণ করে—ইসলামিক সিম্বল। যেহেতু টুপি-পাঞ্জাবি, তসবি, মসজিদ এগুলো ইসলামের প্রতীক বলে বিশ্বে পরিচিত, তাই কোথাও এটা থাকলেই সেখানটা মুসলিম বলে চিহ্নিত হয়। সিনেমায়, গল্পে, প্রচ্ছদে, ইন্টারনেটে মুসলিম বা ইসলাম লিখে সার্চ দেন, দেখবেন কী আসে। যেহেতু বর্তমান সময়ে এই প্রতীকধারীরাই হয়তো ওই ইনোসেন্টদের দলভুক্ত অথবা জঙ্গি দলভুক্ত, তাই প্রতীকধারীদের বদনাম ইসলামের বদনাম হিসেবে গণ্য হয়। আর যারা প্রতীক ছেড়ে সবল অবস্থানে আছেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক যাদের বেশি, যারা টুপি-দাড়ি রাখেন না, অর্থাৎ সিম্বল ধারণ করেন না, তাদের অবদানও মুসলিমদের অবদান হিসেবে গণ্য হয় না।

একটা কথা না বললেই নয়, আমাদের মাদরাসাগুলো তার শিক্ষার্থীদের যতটা না শিক্ষিত করতে চান, তারচে’ বেশি সুফি বানাতে চায়। বহু ক্ষেত্রে অযোগ্য শিক্ষকদের তাদের সুফিগিরির উছিলায় ‘আমলদার’ নাম দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ এই আমল হলো প্রাকটিস। আমরা শেখ সাদির বিখ্যাত উক্তি বলিও বটে, ইলম বে-বাহাস টিকে থাকে না। এই বাহাস মানেও কিন্তু প্রাকটিস বা চর্চা। প্রাকটিসের জন্যে দরকার প্রয়োগক্ষেত্র। আমরা প্রয়োগক্ষেত্র না বুঝে প্রাকটিস মানে বুঝেছি—অন্যকে শেখানো। এটা একটা ভুল ধারণা। অন্যকে শেখানোর দ্বারা ‘সিনা বসিনা’র দায়িত্ব আদায় হতে পারে, ইলম এক বুক থেকে অন্য বুকে স্থানান্তর হতে পারে, কিন্তু প্রাকটিস হবে না—প্রাকটিস হয় প্রয়োগক্ষেত্রে। নামাজ-রোজার মতো শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত যাপন ছাড়া আমাদের ইলমের কোনো প্রয়োগক্ষেত্র নেই। দণ্ডবিধি জানা ফকীহদের জন্যে বিচারিক ময়দান নেই, এজলাস নেই; অর্থনীতি অভিজ্ঞ আলেমদের জন্যে ইসলামি অর্থনীতির সেক্টর নেই। আবার যা আছে, তাতেও আমরা নেই। মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরের জন্যে সমাজ ও রাষ্ট্রে কোরআন ও হাদিসের কোনো সূত্র প্রয়োগের কিংবা গবেষণার একাডেমিক জায়গা নেই। একজন সৈন্য তার প্রশিক্ষণের উছিলায় সেনাবাহিনীতে নিয়োগ পেয়ে সারাজীবন চাকরি করে গেলেও তার প্রয়োগক্ষেত্র ওটা নয়—যুদ্ধের ময়দান। ওখানের জন্যেই তাকে তৈরি করা হয়। যদি সে কাউকে আবার প্রশিক্ষণ দেয়, তাও সে দেয় যেন যুদ্ধের ময়দানের উপযুক্ত হয়। ওখানে যতদিন সে বেশি কাটাবে, তত সে সমরাভিজ্ঞ হবে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকান ইউনিয়নের বহু দেশে ইলমের প্রাক্টিসের ক্ষেত্র কমবেশি আছে, কমপক্ষে একটা শরিয়া আদালত হলেও আছে। যার ফলে সেখানে বিশ্বাসেরা ইসলামি আইনজ্ঞ তৈরি হয়, এখানে নয়। সাহাবায়ে কেরামও কিন্তু ইলমের প্রাকটিস করেছেন এভাবেই।

প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা বলে নিই, রাষ্ট্রীয়পদে যাওয়া, সরকারি পদবি নেওয়া, বা কোনো আর্থিক সংস্থায় যোগ দেওয়া মানেই দুনিয়াদার হয়ে যাওয়া নয়, ‘দুনিয়ালাভের জন্যে শিক্ষা’ গ্রহণ করাও নয়। রসুলের (সা.)জীবদ্দশায় এবং তার ওফাতের পরে যতবেশি ভূখণ্ড মুসলিমদের করতলে এসেছে, মশহুর ও ইলমদার সাহাবিদের ততবেশি রাষ্ট্রীয় কাজে জড়াতে হয়েছে, প্রশাসনিক পদে যেতে হয়েছে, বিভিন্ন জনপদে গভর্নেন্স ও আমলার পদে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। ওখানে তারা ইউরোপ ও আফ্রিকার অমুসলিম কূটনৈতিকদের সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির সঠিক চর্চা করেছেন। গ্লোবাল কনটেক্সটে ইসলামের ভেলিডিটি প্রমাণ করেছেন। সেখানে যে যতবেশি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, আমরা তার নাম এখন ততবেশি শুনি। হাদিস বা আসার দিয়ে তিনি ততবেশি আমাদের উপকৃত করেছেন, কাজের জন্যেই তাকে রসুলের (সা.) যুগে জানা ও শেখা জ্ঞানের প্রয়োগ করতে হয়েছে। রসুলের (স.) পত্রাবলি দেখলেও বোঝা যায় এবং বিদেশিদের সঙ্গে তার যুদ্ধের অভিযানের বর্ণনাগুলি পড়লে জানা যায়, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত আইনগুলো সম্পর্কে তিনি কতটা ওয়াকিবহাল ছিলেন। ইমাম আবু হানিফার (রহ.)মতো বহু আলেম রাষ্ট্রীয় পদ গ্রহণ করতে না চাইলেও তার প্রিয় ছাত্রদ্বয় ইমাম মুহাম্মাদ ও আবু ইউসুফ রহ. কিন্তু ছিলেন, ছিলেন ইমাম গাজালি ও শামির (রহ.) মতো ব্যক্তিত্বরাও। ফলাফলেও আমরা দেখি, প্রত্যেকের কর্মক্ষেত্র অনুসারে তাদের মতামত গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা হয়।

কেবল শেখা, শিখানো, ইমামতি ও ওয়াজের মাধ্যমে কি আমরা রাষ্ট্র ও সমাজের সাংবিধানিক কঠামোটা বদলাতে পারবো? গত দুইশ বছরে কি সেটা সম্ভব হয়েছে? ইংরেজ ও ইংরেজি বয়কটের পরেও কি তা আরও প্রবলভাবে আমাদের ওপর বিজয়ী হয়নি? ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে স্বাধীনতায় আলেমদের এতশত অবদানের পরেও কি রাষ্ট্রগুলোতে ইসলামের সিম্বল টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে? বরং আমাদের আলেমদের বেশিরভাগ তাদের ইলম কর্মজীবনে এসে খুইয়ে বসেন একারণে যে, প্রয়োগের কোনো জায়গা তারা পান না। বাস্তব জীবনে তো তার অর্জিত বিপুল জ্ঞানের প্রয়োজন খুব একটা হয় না—যা সে পড়েনি তার প্রয়োজন হয় বেশি । এভাবে কেবল শিখিয়ে শিখিয়ে চর্চা করার ফল হলো, রাষ্ট্রীয় বিধানপ্রদানের সময় এই ইলমের শক্তি কাজে দেয় না। ভারতে যারা তিন তালাক বাতিল করেছে, তাদের দলে কি দেওবন্দিরা আছে? সম্ভবই না। কিন্তু সেই দলে যদি তারা থাকতেন, তাহলে কি বাতিল করা সম্ভব হতো? আবুল হাসান আলি নদভি রহ. সেই যে মুসলিম পার্সোনাল কোর্ট করে গেলেন, দেওবন্দ তার কতটুকু উন্নতি করেছে, তা তিন তালাক বাতিল হওয়ার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়। অর্থাৎ যারা তিন তালাক বাতিল চান, সেই সব মুসলিমরাই কোর্টে শক্তিশালী, যারা চান না, তারা সেখানে যানও না কিংবা তারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তালাকের ন্যায্যতা বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

সবিশেষ—তবে মাস্টার্সের সমমানের ফলে বাংলাদেশে অন্যান্য শিক্ষাধারার ছাত্রদের সঙ্গে একটা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ পাবে কওমি ছাত্ররা, যেহেতু বিভিন্ন সেক্টরে নিজেদের অবস্থান গড়ার একটা প্রাথমিক সত্যায়ন তারা পেয়েছে। এখন সেখানে গেলেই নিজেদের দুর্বলতা নজরে পড়বে এবং সবলতাও প্রকাশ পাবে। এছাড়া বিশ্বে ইসলামিক পারস্পেক্টিভে একাডেমিক পরিসরে নিজেদের জানান দিতে পারবে। এটাও কম নয়। তবে এই স্বীকৃতি আমাদের ছেলেদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়নি। কেননা, বিদেশে অনার্স লেভেলে পড়ার জন্যে ইন্টারমিডিয়েটের সনদ দরকার হয়, সেটা আমদের নেই। এমনকি মাস্টার্স বা পিএচডি করতে যাওয়ারও সুযোগ নেই, যেহেতু অনার্স পড়লেও আমার শিক্ষিত না। দেশে বিসিএসে অংশগ্রহণেরও সুযোগ নেই। এমনিতেও আমাদের ছেলেদের উচ্চশিক্ষায় বিদেশ যেতে নিরুৎসাহিত করা হয় যে, সেখানে গেলে তারা বিগড়ে যাবে। তো সে কেবল মাদরাসার অন্দরে থাকার জন্যেই তৈরি হয়েছে? কেউ এটা বলে না যে, আমরা আমাদের ছেলেদের এমনভাবে শিক্ষা দিই যে, সে প্রয়োজনে সেখানকার ভার্সিটির পরিবেশ বদলে দেবে। আর কিছুই বলার নেই।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক, গবেষক