বুড়িগঙ্গা নদী: আমাদের উন্মুক্ত ভাগাড়

কাজী মাহবুবুর রহমান  ঃ 

পৃথিবীর প্রায় সব বড় বড় নগরীই কোন না কোন নদীর উপর ভর করে গড়ে উঠেছে। আমাদের প্রিয় ঢাকাও তার ব্যাতীক্রম নয়। বুড়িগঙ্গাকে আশ্রয় করে ঢাকা শহরের উৎপত্তি। আঠারো শতকের শেষের দিকেও বুড়িগঙ্গা ছিল গঙ্গার মূলধারা, যা বর্তমানে ধলেশ্বরীর শাখায় পরিণত হয়েছে।

এ বুড়িগঙ্গা দিয়েই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মসলিন,নীল আর পাট। তারপর যুগে যুগে এ নদীর প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি জৌলুশও বাড়তে থাকে। ঢাকা যেমন হয়ে ওঠে প্রাচ্যের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠে বুড়িগঙ্গার বুক। কোন কোন শাসক বুড়িগঙ্গার দুই তীরে করেছিলেন আলোকসজ্জার ব্যবস্থা। বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল লম্বা তীরজুড়ে।যার নাম বাকল্যান্ড বাঁধ। আজ তা শুধুই ইতিহাস।

বুড়িগঙ্গা অবস্থানগত দিক থেকে ঢাকা শহরের দক্ষিণ এবং পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত জোয়ারভাটা প্রভাবিত একটি নদী। মোঘলশাসকরা এই নদীটির জোয়ারভাটার রূপ দেখে বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। নদীটির নামকরণ বুড়িগঙ্গা করার পেছনে রয়েছে একটি সনাতনী গল্প। প্রাচীনকালে গঙ্গা নদীর একটি প্রবাহ ধলেশ্বরীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে পতিত হত। ধীরে ধীরে এই প্রবাহটি তার গতিপথ পরিবর্তন করার ফলে একসময় গঙ্গার সঙ্গে তার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে এই বিচ্ছিন্ন প্রবাহটি বুড়িগঙ্গা নামে অভিহিত হয়।

বর্তমানে বুড়িগঙ্গা নদীটি বাংলাদেশের উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ২৯ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩০২ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিল আকারের। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক বুড়িগঙ্গা নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী নং ৪৭। যেই বুড়িগঙ্গা নদী একসময় ছিল ঢাকার জনজীবন ও শিল্প বানিজ্যের মূল প্রাণ। আজ তা হয়ে দাড়িয়েছে ঢাকার পতিত ভাগাড়।

সদরঘাট এবং তার আশপাশের অঞ্চলগুলো নদীর ময়লা পানিতে ভারী হয়ে উঠেছে। সোয়ারীঘাটে নদীর অবস্থা সবচে বিধ্বস্ত। হেন রকম ময়লা নেই যা এখানে খুঁজলে পাওয়া যাবে না। পোস্তগোলা ক্যান্টনমেন্ট অর্থাৎ বুড়িগঙ্গা সেতু ২ এর কাছে নদীটি কিছু পরিচ্ছন্ন রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একান্ত প্রচেষ্টা এবং নজরদারীর ফলে। এরপর থেকে শুরু করে বছিলা পর্যন্ত নদীর সম্পূর্ন বেহাল দশা। বর্ষাকালে যদিও একটু পরিস্কার পানির দেখা মিলে, কিন্তু শীতকালে নদীর পাশ দিয়ে প্রবাহিত বেড়িবাঁধ রোডে সাধারণ মানুষের চলাচলও দুঃসহ হয়ে ওঠে বিকট দুর্গন্ধে। এভাবে চলতে দিলে বুড়িগঙ্গা নদী ত অস্তিত্ব হারিয়ে কেবলই উন্মুক্ত ভাগাড়ে পরিণত হবে।

হাতিরঝিলের অবস্থাও আগে খারাপ ছিল । কিন্তু সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এটাকে ধ্বংসের হাত থেকে ফেরানো সম্ভব হয়েছে । সুতরাং প্রসাশন এবং আমরা জনসাধারণ চাইলে বুড়িগঙ্গাকেও ফিরিয়ে দেয়া যেতে পারে তার হারানো সৌন্দর্য্য । পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র বজায় রাখার জন্য বুড়িগঙ্গার প্রতি সকলের মনোযোগী হওয়া এখন সময়ের দাবী।