কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি কার্যক্রম কতদূর, কী বলছেন নেতৃবৃন্দ?

ওমর ফারুক:

২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্সের সমমানের সরকারি স্বীকৃতির ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চট্টগ্রামের হাটহাজারি মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফীর উপস্থিতিতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী এ ঘোষণা দেন। এক বছর পার হয়ে গেলেও এ স্বীকৃতির কার্যক্রম এখনো প্রক্রিয়াধীন। এগিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচনও। চলতি বছরের অক্টোবরেই নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা দেওয়ার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ফলে ঝুঁকির মুখে পড়ে যাচ্ছে এ সরকারের আমলে কওমি মাদরাসার স্বীকৃতির প্রক্রিয়া। তবে কি প্রধানমন্ত্রীর কওমি মাদরাসার সরকারি স্বীকৃতির ঘোষণা কোটা আন্দোলনের মতোই সময়ের স্রোতে আটকে যাবে? এমনটাও আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

সর্বশেষ গতমাসে কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, তাকমিল (দাওরা) কে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্সের সমমান দিতে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অতিদ্রুত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে খসড়া পাঠানো হবে বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়। বাছাই কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ে পাঠাবে। ভেটিং শেষ হলে মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে অনুমোদনের জন্য। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে তারপর সংসদে যাবে।’ তবে খসড়ায় কী আছে এ বিষয়টি সেখানে উল্লেখ করা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে তাকমিল (দাওরা) কে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্সের সমমান দিতে প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও লেখক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেন তিনি বলেন, কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। কওমি লিয়াজো কমিটি এ সম্পর্কে খবর রাখেন। তারা যেহেতু গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন না ফলে আমরা এ বিষয়ে বলতে পারছি না। সর্বশেষ কোন অবস্থায় রয়েছে, আদৌ স্বীকৃতি হবে কী না এ বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো মন্তব্য নেই। এসব বিষয় নিয়ে কি দেশের শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবিদের সঙ্গে সনদ বাস্তবায়ন কমিটির প্রকাশ্য যোগাযোগ রক্ষা করা উচিত নয়? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনো পর্যন্ত আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমীয়ার প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। তবে বিষয়টি অস্পষ্ট থাকায় আমরা আতঙ্কিত ও শঙ্কিত। তারা তো প্রস্তাবিত আইনের খসড়াটি প্রকাশ করেনি।

‘আমার ধারণা লিয়াজো কমিটিই শুধু বিষয়টি জানে। আর যদি জেনে না থাকেন তাহলে এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। আমাদেরকে না জানিয়ে যদি কিছু পাস হয় সেটা যে কী হবে এটা নিয়ে আমি আতঙ্কিত। যে গতিতে এ কার্যক্রম চলছে এসব সকল বিষয়ে নিয়ে আমি শঙ্কিত। এ স্বীকৃতি এ সরকারের আমলে না হলে অন্য সরকারের আমলেও হতে পারে। তবে সরকার চাইলে আগামী সংসদীয় অধিবেশনেও এটা পাস করা সম্ভব। এটা নির্ভর করে সরকারের ইচ্ছের ওপর। তবে আমাদের খুব বেশী উদ্বীগ্ন হওয়ারও কিছু নেই। কারণ আমাদের এখনো আল হাইয়াতুল উলইয়ার নেতৃত্বের  প্রতি আস্থা রয়েছে। তারা জেনে শুনে কওমি মাদরাসাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে না।’ মাওলানা নদভী জানান।

প্রবীন এ শিক্ষাবিদের আতঙ্ক ও শঙ্কার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় সনদ স্বীকৃতি আন্দোলনের নেতৃত্বপ্রদানকারী আলেম আল্লামা ফরিদ উদ্দীন মাসঊদের সঙ্গে। তবে আল্লামা মাসঊদ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। যোগাযোগ করা হয় সদন বাস্তবায়ন কমিটির প্রতিনিধি সদস্য ও জামিয়া রাহমানিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহফুজুল হকের সঙ্গেও। তিনিও বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সনদ বাস্তবায়নের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বিষয়টি বলতে পারবেন বলে তিনি জানান।

তবে সনদ বাস্তবায়ন কমিটির প্রতিনিধি সদস্য মুফতি ফয়জুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন, আমরা আশাবাদি তিনি এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। আল হাইয়াতুল উলইয়ার বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দও আমাদের আশাবাদি করেছেন যে, খুব শীঘ্রই এটা বাস্তবায়িত হবে। সে লক্ষ্যে তারা কাজও করে যাচ্ছে। আমরা আশাবাদী মানুষ। সবসময় আশাবাদী হয়ে থাকতে চাই। আমরা হতাশাবাদী নই। আশা করি এটা বাস্তবায়িত হবে।

বিষয়টি যে গতিতে এগুচ্ছে এভাবে কী এ সরকারের আমলে বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব? জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এটা সরকারের ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে। ইচ্ছ করলে গতি ও বাস্তবায়ন সবই সম্ভব। তবে আমরা আশা ছাড়ছি না।

প্রসঙ্গত, গতবছরে গণভবনে শীর্ষ আলেমদের উপস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কওমী মাদরাসার দাওরায়ে হাদীসকে মাস্টার্স (আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ) সমমান ঘোষনা করেন। এরপর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এ বিষয়ে কোনও আইন না থাকায় ‘সনদের মান’ দেওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘দাওরায়ে হাদিস’কে মাস্টার্স সমমান ঘোষণার পর ছয়টি আঞ্চলিক কওমি শিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়ে গঠিত আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ এর অধীনে গত বছর ১৫ মে প্রথমবারের মতো এবং এবছর দ্বিতীয়বারের মতো সমন্বিতভাবে অনুষ্ঠিত হয় দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষা।