‘ছাত্ররা এক প্রকার জোর করেই পাহারার দায়িত্ব পালন করে’

টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমার মাঠ দখলের দুরভিসন্ধিতে গতকাল ১ লা ডিসেম্বর সাধারণ তাবলিগি সাথি, মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের উপর সাদপন্থীরা ন্যক্কারজনক হামলা চালায়। মৃত্যু ও অসংখ্য হতাহতের মতো ঘটনা ঘটে। নষ্ট হয় রাস্তাঘাট, প্রতিষ্ঠান; বাধাগ্রস্ত হয় নাগরিক জীবন। এর মধ্য দিয়ে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে নানা মহলে চলছে মিশ্র আলোচনা। ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্রও চলছে। সেইসব আলোচনা থেকে ফেসবুক-স্ট্যাটাস থেকে একটি পর্যবেক্ষণ ফাতেহ24-এর সৌজন্য তুলে ধরা হলো…

হাসান আজিজ :

শুক্রবার বিকেলে মাঠ থেকে ফেরত চলে আসা এক ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি তার অবস্থানকালীন মাঠের অবস্থা বর্ণনা করেন। মুরুব্বিদের সিদ্ধান্ত নাকি ছিলো, ছাত্ররা ভেতরে আমলে মগ্ন থাকবে। গেইট পাহারা দিবে সাধারণ সাথীরা। তাবলীগের সাথীরা সেটার উপরই অটল ছিলেন। ছাত্রদের পাহারায় আসতে দিচ্ছিলেন না। কিছু বললে একটাই উত্তর, এটা মুরুব্বিদের নির্দেশ। মশওয়ারায় এটাই সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তাদের সামনে দিয়ে পরিচিত সাদপন্থী সাথীরা মাঠে ঢুকছিলো। তারা বাধা দিতে পারছিলো না। তখন তারা মনসুরুল হক সাহেবকে ফোন দিয়ে ঘটনা জানায়। তিনি তখন ছাত্রদের পাহারায় থাকতে বলেন। ছাত্ররা এক প্রকার জোর করেই পাহারার দায়িত্ব পালন করে।

আমাদের সাথী ইনাম ভাই। কাফিয়া থেকে দাওরা পর্যন্ত আমাদের সাথে পড়েছেন। এখন হাজীপাড়ায় উলুমুল হাদীস তৃতীয় বর্ষে আছেন। তিনি মূল সময়ে মাঠে ছিলেন। তার হাত এবং পায়ের হাড় ভেঙে দেয়া হয়েছে পিটিয়ে। গতকাল তার ভাইরা তার সঙ্গে দেখা করে এসে তার কাছ থেকে শোনা ঘটনার যে বিবরণ দিয়েছেন তা হচ্ছে, তারা গেইটের কাছে পাহারায় ছিলেন। গেইটের অপর পাশে সাদপন্থীরা। ভেতরে তারা।‌ তাদের হাতে পাহারার লাঠি ছিলো। সাদপন্থীরা বাইরে থেকে হইচই করছিলো। কিন্তু ভেতরে ঢুকতে সাহস করছিলো না। তখন তাবলীগের মুরুব্বিরা তাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে অনেকটা জোর করেই তাদের থেকে সব লাঠি জমা নিয়ে নেয়। (ফেসবুকে শেয়ার হওয়া এক পোস্ট থেকে জানা যায়, পুলিশ তাদেরকে লাঠি ফেলে দিতে অনুরোধ করছিলো। সম্ভবত পুলিশের কথায় আস্থা রেখেই মুরুব্বিরা লাঠি জমা নিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ সেই আস্থার মূল্য কিভাবে চুকিয়েছে সেই দৃশ্য তো আমাদের চোখের সামনেই।)

লাঠি জমা নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাদপন্থীদের সাহস বেড়ে যায়। তারা গেইট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং ছাত্রদের টার্গেট করে করে পিটানো শুরু করে। ওদের টার্গেট ছিলো মাদ্রাসার ছাত্ররা। টার্গেট করে করে পিটিয়েছে। ব্যাপকভাবে আহত হয়েছে আমাদের নিরস্ত্র ভাইয়েরা। সেই হতাহতের ব্যাপকতা কতটা ভয়াবহ সেটা তো আপনারা জানেনই।

ঘটনা দুইটা উল্লেখ করলাম নানারকম অনুচিত প্রতিক্রিয়ার কারণে। গতকাল থেকে আমরা বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যে প্রশ্নগুলো করে যাচ্ছি উপরের বিবরণের আলোকে এবার আসুন প্রশ্নগুলো আবার নেড়েচেড়ে দেখি।
মাদ্রাসার উস্তাদরা কি ছাত্রদের নিরস্ত্র অবস্থায় পড়ে পড়ে মার খাওয়ার জন্য ইজতেমার মাঠে পাঠিয়েছিলেন?
এর পেছনে কি তাদের কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ ছিলো? সর্বোপরি আহত পীড়িত ছাত্রদের প্রতি কি তাদের উস্তাদদের বিন্দুমাত্র দয়ামায়াও নেই, যতটা দয়া আপনি ফেসবুকে বিলি করে লাইক-কমেন্ট ব্যাবসা করছেন?

মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় খোঁজ নিয়ে দেখেন, যারা তাদের ছাত্রদের পাঠিয়েছে তারা ছাত্রদের সর্বাত্মক খোঁজ-খবরও রাখছে। আপনাদের মতো ফেসবুকে এসে সস্তা দরদ জাহির না করে তাদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটছে। চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে। তাদের দরদ আপনাদের চেয়ে কোনো অংশে কম না। তারা সেই দরদের প্রকাশ ফেসবুকে করেন না। করেন কর্মের মাধ্যমে।

গতকালের ঘটনার পর থেকেই একদল বুদ্ধিজীবী (?)-কে দেখা যাচ্ছে তারা ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বুদ্ধির বহর বিলিয়ে যাচ্ছেন। যে সময়ে ক্ষতের উপর মলম মাখার প্রয়োজন ছিলো তখন তারা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয়ার কাজে লিপ্ত হয়েছেন। ছাত্রদের প্রতি তাদের দরদ উথলে উথলে পড়তে শুরু করেছে।

যখন মিডিয়া একতরফাভাবে সাদপন্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ঘটনাটিকে ভিন্ন রূপ দেয়ার কাজে লিপ্ত, যখন বাইরের মানুষ এটাকে কওমী-তাবলীগ দ্বন্দ্ব মনে করে ভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন, তাবলীগের চলমান সংকটকে কেন্দ্র করে জনমনে অনেক ভুল ধারণা এবং ভুল বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে তখন তারা বাস্তবতা তুলে ধরার পরিবর্তে উল্টো বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছেন। অথচ উচিত ছিলো এখন অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে জোর আওয়াজ তোলা। বিশ্লেষণের জন্য তো গোটা জীবন পড়ে আছে।

সবশেষে একটা কথা বলি। তাবলীগের চলমান সংকট নিরসনে উলামায়ে কেরামের গৃহীত পদক্ষেপ যদি আপনাদের পসন্দ না হয় তাহলে আপনারা আপনাদের পছন্দের পরামর্শ শেয়ার করতে পারেন। দায়িত্বশীলদের কাছে সেই পরামর্শ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে পারেন। অন্তত জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেন। ব্যক্তি পর্যায়েও উদ্যোগ নিতে পারেন। কিন্তু আসল সমস্যা নিয়ে আপনাদের কোনো মাথাব্যথা নেই, উলামায়ে কেরামের প্রতি আস্থা নষ্ট করার কাজ আপনারা‌ দায়িত্বের সাথে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। এসব করতে থাকলে আমরা উলামাদের উপর আস্থা হারানোর আগে আপনাদের থেকে আস্থা হারাবো।