শতাব্দী চুক্তি, ফিলিস্তিন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতিতে কী আছে?

জুনায়েদ ইশতিয়াকঃ 

ট্র্যাম্পের জামাই ও উপদেষ্টা জেরাড কুশনারের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক দল মধ্যপ্রাচ্যের সফর সম্পন্ন করেছে কয়েকদিন আগে। এই সফরে দলটি মিসর,জর্ডান, কাতার, সৌদি আরব ও ইজরাইলে বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে মূল আলোচ্য ছিল ফিলিস্তিন ও ইজরাইলিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তি বিষয়ে আলোচনা, যাকে সংবাদপত্রে শতাব্দী চুক্তি নামে অভিহিত করা হচ্ছে। অবশ্য সমালোচকরা একে  ফিলিস্তিনি সঙ্কট ও লড়াইকে বাতিল করে ইজরাইলি চিন্তা ও  প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাবনা হিসেবেই দেখছেন। এ বিষয়ে আরব সেন্টার ফর রিসার্চ এন্ড পলিসি স্টাডিস একটি সেমিনারের আয়োজন করে, সেই সেমিনারে উঠে আসে এই চুক্তির পূর্বাভাস।

শতাব্দী চুক্তি কী?

যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেনি, তবে পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের নানান সংবাদপত্রে যেসব বিবরণ ফাঁস হয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবনার মৌলিক দিক ও তার লক্ষ্যসমূহ উঠে এসেছে।

প্রস্তাবনায় বলা হয়, এখন থেকে ফিলিস্তিনি সঙ্কটকে জাতীয় সঙ্কট হিসেবে দেখা হবেনা, বরং রাজনৈতিক সঙ্কট হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। সে মোতাবেক আরব ও ইজরাইলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হবে। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন সংক্রান্ত বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়া হবে। এড়ানোর জন্য সৃষ্টি করা হবে আঞ্চলিক পরিবেশ ও আরব-ইজরাইলি সম্পর্কে নতুন সমীকরণ।

এই নতুন সম্পর্কের মাধ্যমে আরব রাষ্ট্রগুলোই হামাসসহ ফিলিস্তিনি পক্ষগুলোকে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিবে। প্রয়োজনে চাপ প্রয়োগ করবে। বিনিময়ে ফিলিস্তিনিরা পাবে অর্থনৈতিক সাহায্য ও বিনিয়োগ। কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো তৈরি করা হবে। এতে ফিলিস্তিনি জনগণের বিক্ষুব্ধতা প্রশমনের চেষ্টা করা হবে। এতে প্রধানত অর্থায়ন করবে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো।

এই প্রস্তাবনায় ফিলিস্তিনিদের মৌলিক দাবীগুলোর প্রতি আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কুদস, অধিকৃত অঞ্চল, সীমান্ত, শরণার্থী ও পানি, এসব বিষয় আলাদা করে আলোচনায় আসবেনা। এই বিষয়গুলোকে প্রস্তাবনায় আনতেই নারাজ যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে কোন রকম পর্যালোচনা ছাড়াই কুদসকে ইজরাইলের রাজধানী ঘোষণা করে সেখানে স্থানান্তরিত করা হয়েছে দূতাবাস।

এই চুক্তি অর্থনৈতিক
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ফিলিস্তিন সঙ্কট বিষয়ক সিদ্ধান্তকে সিদ্ধান্তকে নাকচ করে অর্থনৈতিক শান্তিকেই বানানো হচ্ছে সঙ্কট সমাধানের মূল ভিত্তি। কুশনার আল কুদসের সাথে সাক্ষাৎকারেও এ কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘ মার্কিন প্রশাসনের প্রস্তাবনা হচ্ছে, বেশ কিছু অর্থনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগে প্রণোদনা, এতে শুধু ফিলিস্তিন নয়, জর্ডান ও মিসরও শরীক থাকবে। ( আল কুদস ২৪/৬ / ১৮ )

মূলত এই প্রস্তাবনাটি শিমন পেরেজ সহ উগ্র ইহুদাবাদিদের চিন্তার বাস্তবায়ন, যারা মনে করে নিছক অর্থনৈতিক সমাধানের মাধ্যমেই ফিলিস্তিন সঙ্কট শেষ করা সম্ভব। এর শর্ত হিসেবে  আরব-ইজরাইলের সম্পর্ককে উন্নয়ন করতে হবে। এর মাধ্যমে আরবরাই ফিলিস্তিনিদের ক্ষোভ ও  ক্রোধ দমনের সচেষ্ট হবে, ইজরাইলকে আলাদা করে ভাবতে হবেনা।

ফিলিস্তিন সঙ্কটের সমাধান নয় 

ফিলিস্তিনি সঙ্কটের কিছু নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি আছে। এর সমাধানে সত্তর বছর ধরে ফিলিস্তিনি সংগ্রাম চলছে। তারা আন্তর্জাতিক জালেমি ব্যবস্থার মোকাবেলা করছে, অধিকার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। যার অংশ হিসেবে তারা ইজরাইলের দখলকৃত ভূমি, মসজিদুল আকসা ও কুদসের অধিকার গ্রহণসহ শরণার্থীরা ফিরে আসার নিশ্চয়তার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা,  পানি, আকাশ পথ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ফিলিস্তিনিদের আলাদা করে জাতি ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী আকারে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, বরং আরব-ইজরাইলের সঙ্কট হিসেবে ফিলিস্তিনিদের অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে সঙ্কটকে আরব-ইজরাইলি সমঝোতায় শেষ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এতে ফিলিস্তিনের নতুন রাজধানী হবে আবু দীস এলাকায়, কুদস শহরে নয়। কয়েকটা এলাকা থেকে ইজরাইলীরা সীমিতভাবে দখল প্রত্যাহার করলেও বৃহত্তর অঞ্চলে দখলের বৈধতা গ্রহণ করা হবে চুক্তির মাধ্যমে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনে মুসলিম ও খৃস্টান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বে জর্ডানের ভূমিকা কমিয়ে উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহকে নিয়ে আসা হবে।

কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এই চুক্তি?

এই চুক্তি বাস্তবয়ায়নের লক্ষ্যে বিশেষ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে। জর্ডান ও মিসরের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল নয়, ফলে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য পশ্চিমা সাহায্য গ্রহণ করা ছাড়া উপায় নেই। ইতোমধ্যে কুশনারের প্রস্তাবে সায় দিয়েছেন মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ সিসি।

জর্ডান এখনো দ্বিমত পোষণ করলেও তার ওপর বাড়ছে চাপ। ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক চাপে দেশটির রাজনৈতিক অবস্থা টালমাটাল হয়ে গেছে। এরই প্রেক্ষিতে নেতানিয়াহু জর্ডান সফর করেছেন এবং অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যার প্রতিশ্রুতিতে মার্কিন প্রতিনিধি দলের মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষ করার একদিনের মধ্যেই জর্ডানের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন।

সৌদি ও ইমারাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে ভিন্নভাবে। সিরিয়া, ইরাক, ইয়ামান ও লেবাননের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শিয়াদের নিয়ন্ত্রণ, আইএসসহ উগ্রবাদী কিছু সংগঠনের উত্থান ও রাজনৈতিক ইসলামের বিপুল জনপ্রিয়তার যুগে সৌদি-ইমারাতের সার্বভৌমত্ব চূড়ান্ত আশঙ্কার মধ্যে আছে। বিশেষত আরব বসন্তের পর আরব অঞ্চলে লেগেছে গণতন্ত্র ও পরিবর্তনের হাওয়া, ফলে সৌদি-ইমারাতের রাজনৈতিক বৈধতা ও আঞ্চলিক প্রভাব দ্রুতই কমছে। আইএসবাদীদের হাতে কয়েকদিনেই দখলে গেছে ইরাক ও সিরিয়ার বিরাট অঞ্চল,রাজতান্ত্রিক সৌদি ও ইমারাত এর ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। পাশাপাশি শিয়াদের উত্থান তো আছেই। ইয়ামান থেকে নিয়মিত সৌদির গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আঘাত হাঞ্ছে শিয়াপন্থী হুথি বিদ্রোহীরা। এসব সঙ্কট সামনে রেখে সৌদি-ইমারাত  ইজরাইলের সাথে আপাতত বিবাদে যাওয়া যথাযথ মনে করছে না। বরং সাহায্য কামনা করছে। এজন্য তারা এই চুক্তির খরচ বাবদ একটা বড় অংশ ব্যয় করতে প্রস্তুতও রয়েছে।

এই আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে আরবদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের শতাব্দী চুক্তি মানতে বাধ্য করার চেষ্টা  করা হবে।