ফিরে দেখা দেশভাগ

নুরুন নবী ঃ

আগস্ট মাসের একটি সাধারণ আলোচনা হচ্ছে, ভারত উপমহাদেশ একসঙ্গে থাকলে সবচেয়ে বেশি ভালো হতো নাকি পৃথক হওয়ার কারণে ভালো হয়েছে। প্রতিবছরই কমবেশি এ আলোচনাটি হয়ে থাকে। এবারও হচ্ছে। প্রথম কথা হচ্ছে, ভারত উপমাদেশ আসলেই কি যুগ যুগ ধরে একক কোনো রাষ্ট্র ছিল, নাকি এটি পরবর্তীতে তৈরি হওয়া বিষয়?

বৃটিশ শাসনের আগে ভারত উপমহাদেশ নামে একক কোনো রাষ্ট্র ছিল না। বৃটিশ শাসন আমলেই ভারত নামক একক একটি রাষ্ট্রের শুরু এবং সেটাও পুরোপুরি বৃটিশ শাসনামলে না। ১৮৫৭ সালের পরের সময়টাতে বর্তমান ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, পুরোটা বৃটিশ শাসনাধীন আসে। ১৮৫৭ সালের আগের সময়টায় আসলে বাংলা বিহার, উড়িষ্যা বা পাশাপাশি অঞ্চলগুলো বৃটিশ শাসনের অধীনে ছিল।

মূলত বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করার কারণেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদ উন্নীত হয়। এরআগে মারাঠি, বাঙালি, পাঞ্জাবি, উড়িয়া এ ধরণের আলাদা আলাদা জাতিগোষ্ঠী বা আলাদা আলাদা পরিচয় ছিল। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করার কারণে সবার একটি কমন লক্ষ্য ছিল যে, তাদেরকে (বৃটিশদেরকে) এ ভূখণ্ড থেকে তাড়ানো প্রয়োজন। সেই প্রেক্ষাপটেই একটি ভারতীয় পরিচয় তৈরি হয়। এটি একেবারেই সাম্প্রতিক একটি বিষয়। বৃটিশদের আগে বিষয়টি এমন ছিল না।

মুঘল আমলও পুরোপুরি ভারতবর্ষ কেন্দ্রিক ছিল না। বাংলা বিহার, উড়িষ্যায় এখানে আলাদা সুলতানি রাজ শাসন ছিল। টিপু সুলতানরা দক্ষিণ ভারতে ছিল। কিংবা আমরা যদি আসামের কথা চিন্তা করি সেখানটা অহম রাজাদের শাসনাধীন ছিল। এটাও ভারতের অংশ ছিল না। এভাবে দেখলে বুঝবো, ব্রিটিশ শাসন আমলে ভারত একটি একক শাসনাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এবং ভারতবর্ষের উৎপত্তি হয়।

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে যে, আসলে কী আমরা একসঙ্গে থাকতে পারতাম? এটাও একটা বিষয়। এ বিষয়ে নানা বক্তব্য রয়েছে। আমরা যদি দেখি যে, ধীরে ধীরে একজন সেক্যুলার জিন্নাহ কীভাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদীতে পরিণত হয়েছেন। শুরুর দিকে কিন্তু জিন্নাহ হিন্দু মুসলিম মিলনে বিশ্বাসী ছিলেন। এবং লখনো প্যাক্ট ও দিল্লি চুক্তিসহ নানা ধরণের চুক্তি হয়েছে মুসলিম লীগের সঙ্গে কংগ্রেসের। কিন্তু সে চুক্তিগুলো বেশি দিন টিকেনি। কিছুদিন পরই দেখা যায় যে, কংগ্রেস এ চুক্তিগুলো অমান্য করা শুরু করেছে। এভাবে করে একটা অনাস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়। আমরা যদি বেঙ্গলের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো, জমিদারদের অত্যাচার নির্যাতন ছিল মুসলিম প্রজাদের ওপর ও নিন্মবর্ণের হিন্দুদের ওপর। ফলে এখানেও একটা অনাস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এসব অনাস্থাগুলো মেরামতের কাজ আসলে সেভাবে হয়নি। এ অনাস্তাগুলো দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে। একেবারেই শেষ দিন অবধি।

বেঙ্গলের বরিশালের যোগেনমণ্ডলের কথা আমরা সবাই জানি। তিনি ছিলেন নিন্মবর্ণের হিন্দুদের প্রতিনিধি ছিলেন। তিনিও পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন। একইভাবে জিন্নাহও পাকিস্তান আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি দেখেছেন, সামগ্রিকভাবে ভারতীয় মুসলমানরা সংখ্যালঘু। কোন কোন অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সব মিলিয়ে নয়। তাই এখানে গণতান্ত্রিকভাবে মুসলমানদের অধিকার রক্ষা সম্ভব না। এজন্যই জিন্নাহ সাংবিধানিক রক্ষা কবজের কথা বলতেন। এই সাংবিধানিক রক্ষা কবজের প্রস্তাবনা গৃহীত হলে অখণ্ড ভারতে তার কোন আপত্তি ছিলোনা।

সর্বশেষ আমরা দেখি ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান । যেটা ১৯৪৬ সালে ছিল। এটা ছিল ভারতকে সর্বশেষ ঐক্যবদ্ধ রাখার প্রচেষ্টা। এটা বৃটিশদের প্রস্তাবিত একটি ফর্মুলা ছিল। যে ফর্মুলায় বলা হয়েছিল যে, বর্তমান বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম নিয়ে একটি রাষ্ট্র, বর্তমান পাকিস্তান ও বাদবাকি পাঞ্জাব (যেটা ভারতের সঙ্গে বর্তমানে আছে) সেটা নিয়ে একটি রাষ্ট্র আর বাকি অংশ নিয়ে আরেকটি রাষ্ট্র। আর এ তিনটা রাষ্ট্র মিলে একটি ইউনিয়ন হবে। ভারতীয় ইউনিয়ন। অর্থাৎ একটা সেন্ট্রাল গভর্মেন্ট থাকবে। আর এর অধীনে তিনটি রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। যে মডেলটা এখন বৃটিনে রয়েছে। যেমন ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, নর্দান আয়ারল্যান্ড এবং ওয়েলস মিলে। হুবহু এ মডেল তারা প্রস্তাব করেছে। জিন্নাহ কিন্তু এ মডেলটাও মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু নেহরুর বিরোধিতার কারণে এ মডেল বাস্তবায়িত হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের কাছে পৃথক হওয়া ছাড়া কোনো সুযোগ ছিল না । যে কারণে মুসলমানরা বাধ্য হয়ে আলাদা হয়ে যায়।

সর্বশেষ বিষয়টি হচ্ছে যে, আলাদা হওয়ার পর কে কতটুকু লাভবান হয়েছে? এটা আসলে বিবেচনা করা একটু কঠিন। এটার উপসংহারে আসাও জটিল। আর ইতিহাসকে তো ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না। পেছনে গিয়ে এটাকে কারেকশন করারও কোনো সম্ভাবনা নেই । তারপরও আলোচনা হচ্ছে, চলছে।

একটি বিষয় সত্য যে, ৪৭ এ বিভাজনের কারণে বাংলাদেশের মানুষ এবং পাকিস্তানের মানুষ, বিশেষ করে বাংলাদেশের মুসলমানরা অবশ্যই অবশ্যই লাভবান হয়েছে। এটাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে রয়েছে। তাদের মাঝে নিজস্ব রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবেও এর একটা সুফল এখানকার মানুষ ভোগ করছে। তবে ভারতের মুসলমানরা ৪৭ এর কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলা যায়।

আমরা যদি একসঙ্গে থাকলে হয়তো ভারতে অবস্থানরত মুসলমানরা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস পেতেন। যেহেতু সংখ্যার দিক থেকে অনেক বেশি মুসলিম থাকতো। সে ক্ষেত্রে তাদের আত্মবিশ্বাসের বিষয়টা অনেক বেশি হতো। এখন যেমন তারা হীনমন্যতায় ভোগে বা অনেক সময় তাদের দেশপ্রেমের পরীক্ষাও দিতে হয়। ‘বিদেশি’ অভিযোগের শিকার হয় তারা। এ বিষয়গুলো তারা ভোগ করছে। একসাথে থাকলে হয়তো সংখ্যাগত বেশি হওয়ার কারণে তাদের মনের জোর অবশ্যই অনেক বেশি থাকতো। ভারতীয় সরকার থেকে দাবী আদায়ের ক্ষেত্রে আরও বেশি সুবিধা পেতো। কিন্তু অন্যদিকে বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মানুষ এখন যতোটা স্বাচ্ছন্দে আছে বা ভালো রয়েছে, তাদের একটা পরিচয় তৈরি হয়েছে সবকিছু মিলে এতে এটা অনেকটা ক্ষতিগ্রস্থ হতো। অর্থাৎ এর নানাদিক আছে।

অনুলিখন ঃ ওমর ফারুক

 

আগের সংবাদতুরস্কে ১৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে কাতার
পরবর্তি সংবাদঈদযাত্রায় ঘরে ফিরছে মানুষ, বাস টার্মিনাল- রেলস্টেশনে ভিড়