ফিরে দেখা জামেয়া ইউনুসিয়া ট্রাজেডি : দোষীদের হয়নি বিচার

হামমাদ রাগিব 

আজ ১২ জানুয়ারি। তিন বছর আগে ২০১৬ সালের এই সময়টাতে বিবাড়িয়ার বড় মাদরাসাখ্যাত জামেয়া ইউনুসিয়ায় সংঘটিত হয়েছিল সন্ত্রাসী বাহিনীর নৃশংসতম তাণ্ডব। নৃশংসতার শিকার হয়ে শাহাদাত বরণ  করেছিলেন ইউনুসিয়ার এক তালিবুল ইলম। আহত হয়েছিলেন আরও অনেকে। তারপর বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছিলেন পুরো দেশের তওহিদি জনতা।

মিডিয়া বলছে, ছোট্ট একটি বাদানুবাদকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত। ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যারাতে শহরের জেলা পরিষদ মার্কেট এলাকায় রনি নামে এক মোবাইল দোকানদারের সঙ্গে ইউনুসিয়ার এক ছাত্রের কথাকাটাকাটি হয়। রনি ওই ছাত্রের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং অপমান করান চেষ্টা করেন। ফলে ইউনুসিয়ার আরও কিছু ছাত্র জড়িয়ে পড়েন এই বাদানুবাদে। স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে রনির ভালো সম্পর্ক থাকায় তিনি তৎক্ষণাৎ তাদেরকে ডেকে আনেন এবং তাদের সঙ্গে যোগ দেন মার্কেটের আরও কিছু উগ্র ব্যবসায়ী। বেঁধে যায় ত্রিমুখী সংঘর্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ এসে হাজির হয়। তারা রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে উভয়পক্ষকে থামাবার চেষ্টা করে। তবে ইউনুসিয়ার ছাত্রদের অভিযোগ, পুলিশ একতরফাভাবে মাদরাসা-ছাত্রদের ওপরই কেবল অ্যাকশন নিয়েছিল।

মাদরাসাটির মুহতামিম মুফতি মুবারকুল্লাহ সেসময় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, সংঘর্ষের খবর মাদরাসার নেতৃস্থানীয় উসতাদদের কাছে পৌঁছলে তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ছাত্রদের ফিরিয়ে আনেন মাদরাসায়। এবং মাদরাসার মূল গেট লক করে দেন। পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত হয়ে আসে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে মাদরাসার ছাত্ররা রাতের খাবার গ্রহণ করে ঘুমিয়ে পড়েন। নীরব-নিস্তব্ধ মাদরাসা।

রাত একটু গভীর হতেই ছাত্রাবাসের ঘুমন্ত ছাত্ররা ধড়মড়িয়ে ওঠে। ছাত্রাবাসের ক্যাচিগেটের তালা ভেঙে কারা যেন প্রবেশ করেছে। একটু সচেতন হতেই ছাত্ররা দেখে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা একদল লোক। তাদের সঙ্গে দেশীয় অস্ত্র-হাতে আরও কিছু সন্ত্রাসী। রুমের বাতি জ্বালাতে গিয়ে সুইচে হাত দিয়ে দেখে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন। কী ঘটতে যাচ্ছে ভালোমতো বুঝে ওঠার আগেই কোমলমতি ছাত্রদের ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত আর দিশেহারা হয়ে পড়ে তারা। কোনো কোনো ছাত্রকে ধরে মেঝেতে ফেলে জুতা ও বুট দিয়ে আঘাত করা হয়। গুলির আঘাতেও আহত হয় বেশ কিছু ছাত্র।

ছাত্ররা ভয় ও আতঙ্কে দিশেহারার মতো এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতে থাকে। কেউ কেউ আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে ছাত্রাবাসের ছাদে উঠে। ছুটন্ত এরকম এক ছাত্র ৮ম শ্রেণির হাফেজ মাসউদুর রহমান। হঠাৎ তার পিঠে এসে একটা গুলি বিঁধে। তিনি মাটিতে পড়ে যান। সন্ত্রাসীরা এসে তাঁকে বেধড়ক পেটায়।

ছাত্রদের অভিযোগ, সন্ত্রাসীরা মাসউদকে পিটিয়ে তিন তলা থেকে নিচে ফেলে দেয়। পরে রাত দুটোর সময় স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরদিন ১২ জানুয়ারি মঙ্গলবার এই নৃশংসতার খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে পুরোদেশের ধর্মপ্রাণরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। পুলিশের সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সন্ত্রাসীদের পুলিশি সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার তাপস রঞ্জন ঘোষ ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি আকূল চন্দ্র বিশ্বাসকে আপসারণসহ হামলায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি ওঠে সচেতন মহল থেকে। এ দাবিতে ইউনুসিয়ার মুহতামিম মুফতি মুবারকুল্লাহর নেতৃত্বে কওমি ছাত্র ঐক্যপরিষদের ব্যানারে ১৩ জানুয়ারি বুধবার সারাদেশে হরতালের ডাক দেওয়া হয়।

কিন্তু ১২ জানুয়ারি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মাদরাসার শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে চট্রগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মাহাবুবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ২ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করে। বৈঠকের পর মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা সাজিদুর রহমান হরতাল প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

বৈঠকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার এম এ মাসুদ, ১২ বডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নজরুল ইসলাম, র‌্যাব-১৪ এর অধিনায়কসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনায় কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ সহকারী পুলিশ সুপার তাপস রঞ্জন ঘোষ ও সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আকুল চন্দ্র বিশ্বাসকে প্রত্যাহারের দাবিসহ দায়ীদের অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের এসব দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।

সেই আশ্বাসের আজ ৩ বছর অতিক্রান্ত হলো। শহিদ মাসউদুর রহমানের রক্তের বিচার কি হয়েছে এই ৩ বছরে? জানতে চেয়েছিলাম জামেয়া ইউনুসিয়ার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি আবদুর রহিম কাসেমির কাছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মাদরাসাওয়ালারা মজলুম, মজলুমরা কি আর এই দেশে বিচার পায়? সেই পরিবেশ কি আছে? টঙ্গীতে হাজার হাজার ছাত্রের ওপর হামলা হলো, সরকার আশ্বাসের বাইরে কোনো কিছু করেছে?’

তো আপনারা পরবর্তী সময়ে কি আর প্রতিবাদ করেননি? বা কোনো খোঁজ-খবরও নেননি আপনাদের অভিযোগকৃত সেই পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যাপারে? এমন প্রশ্নের জবাবে মুফতি কাসেমি বলেন, ‘প্রতিবাদের কোনো পরিস্থিতি কি আছে বর্তমানের বাংলাদেশে? নিজের অধিকারের কথাগুলো বলারই তো কোনো সুযোগ নেই এখানে। পুলিশ অফিসারদের ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি অবশ্যই। পুলিশি তদন্তের রিপোর্ট তাদের পক্ষেই তৈরি করা হয়েছে, তাই তারা নিজেদের পোস্টে পুনঃবহাল হয়েছে। আমরা শহিদ মাসউদ-হত্যার বিচারের ভার আল্লাহর কাছে অর্পণ করে সবর করে নিয়েছি। একদিন হয়তো এই মাটিতেই এ রক্ত আর নৃশংসতার বিচার হবে। আমরা সেদিনের অপেক্ষায় আছি।’