প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ হিফজ শিক্ষাধারায় কেমন প্রভাব ফেলছে?

ওমর ফারুক :

‘তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই উত্তম, যিনি কুরআন শিক্ষা করেন ও শিক্ষা দেন।’—আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের (সা.) চিরন্তন স্বীকৃতি ও ঘোষণাকে কেন্দ্র করেই শতাব্দীর পরে শতাব্দী ধরে চলছে কুরআন হিফজ ও প্রসারের ধারা। কুরআনের এ বাহকদের মর্যাদা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে সর্বাগ্রে। কেয়ামতের ময়দানে তাদের মর্যাদাও প্রথম কাতারে।

এমন মর্যাদা অর্জন ও আল্লাহর বাণীকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই কাজ করছেন কুরআনের হাফেজরা।। ব্যাপক প্রসারের লক্ষ্যে অংশ নিচ্ছেন প্রতিযোগিতায়। এ প্রতিযোগিতার ময়দানে বিশ্বময় শীর্ষ পর্যায়ের সাফল্য রাখছেন বাংলাদেশের হাফেজরা। বিশ্বদরবারে তুলে ধরছেন বাংলাদেশকে। দিনদিন এ সাফল্যের ধারা বেগবান হচ্ছে। তেলাওয়াতের মান ও সুরে বাংলাদেশের হাফেজরা সাফল্যের সাক্ষর রাখলেও হিফজ পরবর্তী শিক্ষায় তারা কতটা অগ্রসর হচ্ছেন বা এই ধরণের প্রতিযোগিতার দৌড় হিফজ শিক্ষাধারায় কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সে ব্যাপারে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদেরকে বা তাদের প্রতিষ্ঠানকে আত্মকেন্দ্রিক প্রচারণা ও মিথ্যার আশ্রয় নিতেও দেখা যাচ্ছে সম্প্রতি। এতে কি আল্লাহর কুরআনের মর্যাদা রক্ষা পাচ্ছে? এমন কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে ফাতেহ২৪-এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল দেশের দুটি শীর্ষ কুরআন প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার আয়োজক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে।

কথা হয় দেশের খ্যাতিমান হাফেজদের বৃহৎ সংগঠন ও প্রখ্যাত হাফেজ আব্দুল হকের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশন’র সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মাওলানা সাখাওয়াতুল্লাহর সঙ্গে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ দেশের হিফজ শিক্ষাধারার উন্নতিতে কেমন ভূমিকা রাখছে—এ বিষয়ে ফাতেহ২৪-কে তিনি বলেন, ‘পবিত্র কুরআনুল কারিমে আছে, ‘তোমরা ভালো জিনিসের প্রতিযোগিতা করো।’ কুরআনের চেয়ে ভালো জিনিস দুনিয়াতে আর কিছু হতে পারে না। এখন এই প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য যদি ভালো থাকে, নিয়ত যদি শুদ্ধ হয়, তাহলে এ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ছেলেদের পড়ার মান বাড়বে এবং এক এলাকার ছেলেরা অন্য এলাকার ছেলের পড়ার মান দেখে-শুনে নিজেদের ভুল-ত্রুটি শোধরাতে পারবে। এবং যাদের আরও উন্নত করা প্রয়োজন, তারা অন্য এলাকার ছেলেদের পড়ার মান দেখে নিজের মান উন্নয়ন করবে। এ নিয়তে এই প্রতিযোগিতা ভালো।’

‘কিন্তু কুরআন আল্লাহর বাণী। এ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যদি লোক দেখানো, নিজের বড়ত্ব প্রকাশ, নিজের রুপের প্রকাশ, বড় বড় অফার দিয়ে দুনিয়ামুখী করার প্রয়াস, ইত্যাদি করা হয়, তাহলে তা মন্দ দিক। কুরআনকে প্রতিযোগিতার মাঝ দিয়ে দুনিয়ামুখিতার দিকে নেওয়া বা কুরআনকে দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে বিক্রি করা, এটা কুরআনকে অবমাননা করার শামিল।’

কিন্তু এ প্রতিযোগিতা কী বাস্তবেই শিক্ষার্থীদের পড়ার মান উন্নত করছে বলে আপনি মনে করেন—এ প্রশ্নের জবাবে হাফেজ সাখাওয়াতুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের হুফফাজুল কুরআনও বাংলাদেশের ছাত্রদের পড়ার মান উন্নতকরণকল্পে কয়েকটা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তার মধ্যে অন্যতম প্রতিযোগিতা। আগে দেখা যেতো, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পড়ার মান তেমন একটা ভালো ছিল না। সিলেটে ভালো ছিল না বা উত্তরবঙ্গে ভালো ছিল না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তারা এ কথা স্বীকার করেছেন যে, আগের তুলনায় তাদের পড়ার মান এখন অনেক ভালো। হুফফাজুল কুরআনসহ নানা সংগঠনের প্রতিযোগিতার আয়োজন ও বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে তাদের পড়ার মান অনেক ভালো হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সফল। আমাদের এ ব্যাপক কুরআনের প্রচার-প্রসার দেখে বাংলাদেশে অনেকগুলো সংগঠন এখন প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু কার কী নিয়ত, আমার জানা নেই। কিন্তু তাদের অনেকেই আত্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে এফডিসির মতো জায়গায় গিয়েও কুরআনের প্রতিযোগিতা করে, যা আমাদের অনেক পীড়া দেয়। কুরআনের প্রতিযোগিতা যদি কুরআনের প্রচার-প্রসার ও আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য হয়, তা খুবই ফলপ্রসূ হবে ও মান বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু কুরআনের এ প্রতিযোগিতা যদি দুনিয়াবি কারণে হয়, লোভ-লালসার কারণে হয় বা আত্মপ্রচারের জন্য হয়, সেটা খুবই নিন্দনীয় ও আল্লাহপাক এর জন্য কোনো প্রতিদান তো দেবেনই না, বরং শাস্তির আশঙ্কা রয়েছে।’

এর মাধ্যমে কুরআন শিক্ষায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে আপনি মনে করেন কি না—এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তা মনে করি না। আমরা যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করি, তাদের মাঝে এ ধরনের মানসিকতা থাকলেও আমাদের চেষ্টায় তারা এসব থেকে বের হয়ে এসেছেন। আমরা বোঝানোর চেষ্টা করি, হিফজ পড়েই যেন একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার আলো শেষ না হয়ে যায়। তাকে একজন আলেম বানানোর জন্যও আমরা উৎসাহ দিয়ে থাকি এবং কোনো দুনিয়াবি কাজেও যেন এ কুরআন ব্যবহার না হয়, এসব বোঝানোর চেষ্টা করি। সবাই যদি এভাবে চলে, তাহলে আশা করে কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে না।’

দেশের বাইরে যারা সাফল্য রাখছেন, তাদেরকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? তিনি বলেন, ‘তাদের মধ্যে দুই রকমের লোকই রয়েছে। আজ থেকে কয়েক বছর আগে মরহুম মুহাম্মদ নুরুদ্দীন সাহেবের ছেলে ফাহীম আব্দুল্লাহ দুবাইয়ে সারা বিশ্বের মধ্যে হিফজে দ্বিতীয় ও তেলাওয়াতের মানে প্রথম হয়েছিল। আমি মনে করি, তার বাবা ও তার অভিভাবকরা দুনিয়ার কোনো লোভ-লালসার জন্য তাকে সেখানে পাঠায়নি। তার মেধার কারণে তাকে সেখানো পাঠিয়েছিল। সে ছেলে এখন আলেম হয়ে মাদরাসার খেদমতে লেগে আছে। কিন্তু পাশাপাশি এমন দু-একজন প্রতিযোগীও আছে, যারা সুনাম কামানোর পরে আর এ লাইনে সঠিকভাবে অগ্রসর হতে পারেনি। এটার দু রকম প্রতিক্রিয়াই রয়েছে। ইতিবাচকও নেতিবাচকও।’

তাদের উদ্দেশ্যে আপনি কিছু বলবেন? ‘প্রত্যেককেই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঠিক রেখে আল্লাহর কুরআনকে প্রচার ও তুলে ধরা উচিত। আল্লাহর কুরআনকে যাতে কোনো রকম অবমাননরা না করা হয়, এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে ও প্রচার করতে হবে। কুরআনকে আল্লাহপাক বিক্রি করতে না করেছেন। কুরআনকে বিক্রি করলে আল্লাহ পাক এর বদলা দেবেন না’, তিনি বলেন।

কথা হয়েছিল পিএইচপি কুরআনের আলো সংগঠনের সেক্রেটারি মুফতি মহিউদ্দীনের সঙ্গেও। তিনি মান বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বলেন, ‘এতে তো সন্দেহ নেই বাংলাদেশে আগের তেলাওয়াতের মান ও বর্তমান তেলাওয়াতের মান এক নয়। একসময় আমরা হাফেজদের তারাবিতেই সীমাবদ্ধ রাখতাম। কিন্তু এখন তেলাওয়াতের মান এত বেশি যে, তারা বহির্বিশ্বে ১০৩ দেশের মাঝেও কুরআন তেলাওয়াতে বিজয় লাভ করে। এতে তারা কুরআনকে বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং বিশ্বও বাংলাদেশকে জানতে পারছে। এছাড়া এখন বাংলাদেশের ছেলেদের কুরআন তেলাওয়াতের মান এত উন্নত ও মধুরকণ্ঠী যে, বিভিন্ন দেশও বাংলাদেশের সুর নকল করে। যেমন আগে আমরা সুদাইসি সুর ও কাবা শরিফের ইমামদের সুর নকল করতাম। এখন দেখা যায়, আমাদের নাজমুস সাকীবের মতো স্টার হাফেজদের সুর বিশ্ব নকল করে। এ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সাহসী হচ্ছে ও উৎসাহ পাচ্ছে। যে কারণে বাংলাদেশে তেলাওয়াতের মান এত উন্নত ও এত চমৎকার, যেটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে অন্তত উঁচু করে তুলতে পারছে। হাফেজরা হচ্ছে চমৎকার মেধার অধিকারীও। তাদের চমৎকার মেধার কারণে যদি সরকার তাদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ করে দিত, তাহলে তারাই হত জগতের শ্রেষ্ঠ ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার ও এক নাম্বার শিক্ষাবিদ। তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও প্রয়োজন।’

কিন্তু অনেকে তো প্রতিযোগিতার ফলাফল নিয়ে মিথ্যাচার ও নিজ প্রতিষ্ঠানকে বিজয়ী করার জন্য প্রতারণারও আশ্রয় নিচ্ছে, তাদের বিষয়ে কী বলবেন? এ বিষয়ে মুফতি মহিউদ্দীন বলেন, ‘মিথ্যার আশ্রয় যারা নেবে, তাদের প্রতি আমাদের ধিক্কার ও তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তিও পাবেন। অনেকে হেরে গেলে এটা সহজে মেনে নিতে পারেন না। এটা তাদের মানসিক সমস্যা। এমন কেন করবে? প্রতিযোগিতা মানেই তো হার-জিত। এটা তাদের নৈতিক অবক্ষয়ও। তাদেরকে আল্লাহর কুরআনকে অপব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে; না হয় তাদের দুনিয়াবি ও পরকালীন শাস্তি ভোগ করত হবে।’