স্বীকৃতির সাতকাহন: ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল।। ইফতেখার জামিল

ইফতেখার জামিল

দুই হাজার সতেরো সালের ১১ এপ্রিল রাতে গণভবনে কওমি মাদরাসার আলেম-ওলামাদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি দেন। কওমি মাদরাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে ও দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতিগুলোকে ভিত্তি ধরে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান করে ওই বছরের ১৩ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে এ বিষয়ে আদেশ জারি করা হয়। পরবর্তীতে নানা ধাপ পেরিয়ে প্রশাসনিক আদেশটি আইনেও রুপান্তরিত হয়। তবে এই স্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে নানারকম আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আলেম সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী নেতৃত্বের অধিকাংশের সমর্থনে এই দাবী উপস্থাপিত হলেও এ নিয়ে নানারকম প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। স্বীকৃতির পক্ষ-বিপক্ষের বাদবিবাদ নিয়ে এই লেখায় আলোকপাত করবো।

দারুল উলুম দেওবন্দ ও ব্রিটিশ সরকারের সাথে সম্পর্ক

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মুসলমানরা যে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালাচ্ছিল, ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবে পরাজিত হবার মধ্য দিয়ে সেই প্রতিরোধ যুদ্ধের গতি স্তিমিত হয়ে যায়। ভারত উপমহাদেশে মুসলমানের দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এখানে টিকে থাকার মানে শুধু দৈহিকভাবে বেঁচে থাকা নয়। নিজস্ব শিক্ষা, সংস্কৃতি , আদর্শ, নৈতিকতা ও সমাজব্যবস্থা ধরে রাখার মাধ্যমেই কোন জাতি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা পৃথিবীর অনেক দেশ দখল করে এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি পরিবর্তন করে ফেলতে সক্ষম হয়। এ কারণেই এখন অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইনের সাথে অন্য দশটা পশ্চিমা রাষ্ট্রের পার্থক্য করা কঠিন। ফলে, এ পরিস্থিতিতে ভারত উপমহাদেশে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার লক্ষ্য নিয়ে ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে  ১৮৬৬ সালে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবি তাদের প্রধান ছিলেন। অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা রশিদ আহমেদ গাঙ্গোহি ও হাজি সাইদ আবিদ হুসাইন। এখান থেকেই দেওবন্দি ধারার সৃষ্টি হয়।

ব্রিটিশ সরকারের সাথে আলেমদের কোন ইতিবাচক সম্পর্ক ছিল না। ব্রিটিশ সরকারকেও দেওবন্দি ধারা দখলদার হিসেবে বৈধ সরকার মনে করত না, ভারত উপমহাদেশকে দারুল হারব বা শত্রু নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র বলে আখ্যায়িত করতো। পশ্চিমা ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চায় দেওবন্দের তীব্র বিরোধিতা জারি ছিল।এসব কারণে ব্রিটিশ সরকারও শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেওবন্দকে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে মাদরাসা শিক্ষিতরা আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ে। তবে আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়লেও ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য ও স্বতন্ত্রতা রক্ষায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত জোরালো ছিল, এতে সন্দেহ নেই। হিন্দুদের মধ্যে ব্যাপকভাবে পশ্চিমা সংস্কৃতি ঢুকে গেলেও মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যাপকভাবে টিকে ছিল। এর ফলশ্রুতিতেই স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের দাবী জোরালো হয়ে উঠে। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগের জন্ম হয়। নানাধাপ পেরিয়ে আলেমদের সমর্থনে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

পাকিস্তানঃ অনেক প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আলেম-উলামা ও সাধারণ মুসলমান শ্রেণীর সমর্থন ও সক্রিয়তায়। তবে এর মধ্যে অনেক ধারা-উপধারার উপস্থিতি ছিল। আলেম-উলামা-ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের পাশাপাশি মুসলিম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী অনেকেও পাকিস্তান আন্দোলনে সমর্থন জানান। মুসলিম জাতীয়তাবাদীরা ইসলামী সংস্কৃতি ও শিক্ষায় পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাসী না হলেও মুসলমানদের স্বতন্ত্র ভূখণ্ড দরকার বলে মনে করতো। এর বাইরে বামপন্থী ও বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের ধারা মনে করতো স্বতন্ত্র মুসলমানি ভূখণ্ড সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্ম দিবে। ফলে তারা এর বিরোধী ছিল। দেশবিভাগের পর এই পক্ষগুলোর মধ্যে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের একাংশের সাথে বাম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের যোগাযোগ তৈরি হয়। মুসলিম লীগ দেশবিভাগের পরে আলেমদের পরামর্শ মোতাবেক রাষ্ট্রের পুনর্গঠন না করে ব্রিটিশ শিক্ষিত সমাজ, আমলা ও কর্মচারীদের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে থাকে। এতে বাম-জাতীয়তাবাদী ধারার উত্থান ঘটে। আলেমদের সামনে নতুন সমীকরণ চলে আসে। এতদিন শুধু ব্রিটিশ বিরোধিতা ও ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখাই তাদের মূল দায়িত্ব ছিল, তবে এখন সামনে চলে আসে মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ক্ষমতার রাজনীতি।

দেশবিভাগ পরিকল্পিত ছিল না বলে আলেমদের কাছেও অনেক প্রশ্নের উত্তর ছিল না। নতুন রাষ্ট্রে কীভাবে আইন প্রণয়ন হবে, শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে এবং প্রশাসনিক পদায়ন কীভাবে হবে, এসব বিষয়ে কোন সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত আলেমরা নিতে পারেননি। কেননা আলেমরা এই নতুন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। দেশবিভাগ এত দ্রুত ঘটে যায় যে, গুছানোর খুব বেশী সময় কেউই পায়নি। পাকিস্তানের দুই অংশে সর্বপ্রথম পতাকা উত্তোলন করেন দেওবন্দি দুই আলেম। পশ্চিম পাকিস্তানে মাওলানা শাব্বির আহমদ উছমানি ও পূর্ব পাকিস্তানে জুফার আহমদ উছমানি। তবে কিছুদিনের মধ্যে ব্রিটিশ শিক্ষিত সমাজ, আমলা ও কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় রাষ্ট্র। বিরোধিতায় চলে আসে বাম-জাতীয়তাবাদীরা। ফলে আলেমদের রাষ্ট্রীয় ও বিরোধী, কোন শক্তির প্রতিই স্পষ্ট সমর্থন ছিল না। আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামো ও নতুন আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আলেম সমাজের পক্ষে খুব বেশী কিছু করার সুযোগও কম ছিল।

এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বর্ণনা করতে চাই। ঘটনাটি প্রতীকি হলেও এর তাৎপর্য অনেক। পূর্বপাকিস্তানে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলনকারী আলেম মাওলানা জুফার আহমদ উছমানি পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী বিভাগ ও ঢাকা আলিয়ায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে কয়েক বছরের মধ্যে বুঝতে পারেন, তিনি যেমন শিক্ষাব্যবস্থা চেয়েছিলেন, সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা আলিয়ায় পাওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি কয়েকজন স্থানীয় আলেমের সহযোগিতায় জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। দেশবিভাগের প্রতিশ্রুতিতে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম কিছুটা শিথিল হবে মনে হলেও আলেম সমাজের নামতে হয় মুসলিম সমাজের গৃহকোন্দল ও ক্ষমতার রাজনীতির জটিলতায় ইসলামী শিক্ষা রক্ষা ও প্রতিনিধিত্বকারী আলেম তৈরির নতুন সংগ্রামে। (চলবে…)

লেখকঃ আলেম ও বিশ্লেষক