
গত ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মত পালিত হলো ‘হিজাব ডে’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের ১০ম ব্যাচের কয়েকজন ছাত্রীর উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়। ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগেরই একটি ক্লাশরুমে, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের প্রায় ২৫০ ছাত্রীর উপস্থিতিতে, আনন্দঘন পরিবেশে পালিত হয় ‘হিজাব ডে’। ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১ টা থেকে দুপুর ১.৩০ পর্যন্ত চলা এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ঢাবির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আব্দুর রশীদ। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন প্রফেসর ড. শামসুল আলম, প্রফেসর ড. মাসুদ আলম এবং এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর শেখ মুহাম্মদ ইউসুফ। আয়োজকদের পক্ষ থেকে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন ইসলামিক স্টাডিজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী মুনিরা রাহমান তাশফি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরণের আয়োজন নতুন। প্রথমও বটে। এই ঘটনাটি আমাদের বিদ্যমান সমাজে কিছু চিন্তাগত পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান রিপ্রেজেন্টেশন। মিডিয়ায় খুব ব্যাপকভাবে ঘটনাটি না আসলেও, আমরা মনে করি যে এটি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে হিজাবের প্রচলন বাড়ছে সত্য, কিন্তু সেটি কেন? এর ডায়মেনশন কী? আজ থেকে ২০ বছর আগে আমাদের সমাজে হিজাবকে যেভাবে দেখা হতো, আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সেই দৃষ্টিভঙ্গি কতটুকু বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক? আমাদের মেয়েরাই বা ব্যাপারটিকে কীভাবে দেখছেন? এসব ব্যাপারে কিছু আলো ফেলার জন্যেই এই আয়োজনের উদ্যোক্তাদের সাথে বেশ খোলামেলা আলাপ হয় ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের। সেই পুরো আলাপটিই তুহিন খানের মেধা ও পরিশ্রমে এখানে পাঠকদের জন্য পত্রস্থ হলো।
ঢাবিতে হিজাব ডে পালনের কোন ঐতিহ্য কি ছিল আগে? আপনাদের মাথায় এই কাজটি করার আগ্রহ ও উদ্দীপনা কীভাবে এলো?
জিন্নাতুন নূর মিতু : না, ঢাবিতে হিজাব ডে পালনের কোনো ঐতিহ্য আগে ছিল না। আমরা ঢাবি’র ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ১০ম ব্যাচের মেয়েদের উদ্যোগে এবার প্রথম ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে উদযাপন করলাম ঢাবিতে। এক্ষেত্রে আমাদের মূল প্রেরণা ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত নিউইয়র্কপ্রবাসী নাজমা খান— যিনি ২০১৩ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ‘ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে’ চালু করেছিলেন। স্কুল-কলেজে পড়াকালীন হিজাব পরার কারণে তাকে সহপাঠীদের অব্যাহত টীটকারি ও তিরস্কার সয়ে যেতে হয়েছিল।তাই তিনি মুসলিম নারীদের হিজাব পরার অধিকারের পক্ষে এই দিবসটি চালু করেছিলেন। আর তখন থেকেই প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় শতাধিক দেশের নারীরা এই দিবসটি পালন করে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় আমরাও ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে পালন করলাম।
‘হিজাব’ এখন সমাজে একটি ফেনোমেনা। সমাজে হিজাবের প্রচলন বাড়ছে। অনেকে ব্যাপারটিকে ফ্যাশন হিশেবেও দেখছেন। এ ব্যাপারে আপনাদের মতামত কী?
বুশরা জান্নাত সালেহ: আমাদের সমাজে হিজাবের প্রচলন লক্ষণীয়ভাবে বাড়ছে- এটা সত্য। অনেকেই ধর্মীয় মূল্যবোধে অনুপ্রাণিত হয়ে যেমন হিজাব পরছেন, তেমনি অনেকেই আছেন ফ্যাশন হিসেবেও হিজাব পরছেন। আমরা চাই সমাজে এবং দেশের সমস্ত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও হিজাবের প্রচলন বাড়ুক। কেননা এটা যেকোনো পরিবেশেই শালীনতা রক্ষা করে। তবে হিজাবকে কেবল ফ্যাশন হিসেবে দেখলে এর মূল উদ্দেশ্য ও মূল্যবোধ বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ কর্পোরেট বেনিয়ারা তাদের ব্যবসা ও মুনাফার উদ্দেশ্যে হিজাবকে কেবল ফ্যাশনের মধ্যে আবদ্ধ করতে চাইছে। কিন্তু হিজাব আল্লাহর হুকুম—এর উদ্দেশ্য হলো, নারীকে পুরুষের দৃষ্টিতে অনাকর্ষণীয় করে রাখা, যাতে পুরুষের লোলুপ ও কামুক দৃষ্টি থেকে সে রক্ষা পায়। কিন্তু ফ্যাশনের নামে হিজাব দিয়ে যদি নারীকে আকর্ষণীয় করে তোলার প্রয়াস নেওয়া হয়, তাহলে আমরা এহেন মুনাফাখোর কর্পোরেট স্বার্থযুক্ত ফ্যাশনকে প্রমোট করি না। আমরা সবসময়ই হিজাবকে শালীনতা ও নারীর রক্ষাকবচ হিসেবেই দেখি, তথাকথিত পুঁজিবাদী ফ্যাশনকে আমরা প্রমোট করি না।
পৃথিবীর অনেক দেশেই হিজাবের ব্যাপারে বর্ণবাদী রাষ্ট্রীয় আইন আছে, সামাজিক আচরণ আছে। ঢাবির স্টুডেন্ট হিশাবে আপনাদের কী মনে হয়, এখানকার অবস্থা কেমন? হিজাবের ব্যাপারে আমাদের ভার্সিটিগুলোর শিক্ষার্থী বা প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি কি যথেষ্ট ইতিবাচক?
মারিয়া হুসাইন: জ্বি, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো শীর্ষ উন্নত দেশসহ ইউরোপের প্রায় ১১টি দেশে হিজাব ও বুরকা নিষিদ্ধ করে আইন আছে এবং আইন লঙ্ঘন করলে জরিমানার বিধানও আছে। এটা নিঃসন্দেহে বর্ণবাদী আইন। কেননা অনেক খ্রিস্টান ধার্মিক মহিলারাও হেডস্কার্ফ পরিধান করেন। অর্থোডক্স ইহুদি নারীরাও মাথায় স্কার্ফ পরেন। তাদের ক্ষেত্রে তো এই আইন প্রযোজ্য নয়! তাছাড়া এ ধরনের আইন কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ নারী সে মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি বা হিন্দু হোক— তার ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে পোশাক পরার স্বাধীনতা ও অধিকার রয়েছে। কিন্তু ইসলামোফোবিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার দরুন ইউরোপের উপরোক্ত দেশগুলো মুসলিম নারীদের টার্গেট করে হিজাবকে ব্যান করে আইন করেছে। এটা শুধু যে বর্ণবাদী আইন তা-ই নয়, একইসাথে সেকুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এটা তাদের সেকুলার গণতান্ত্রিক নৈতিকতার বিচ্যুতিও বটে—কেননা কোনো সেকুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো নাগরিকের ধর্মীয় বিধিবিধান পালনে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করার কথা নয়।
যাই হোক, আমাদের ঢাবি ক্যাম্পাসে আগের তুলনায় হিজাবি মেয়েদের সংখ্যা বেড়েছে। এখানে হিজাবের বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে তেমন বাধা নেই। তাছাড়া হিজাব নারীর ব্যক্তিগত অধিকার ও পছন্দের ব্যাপার। এই স্বাধীনতা তার আছে। সো, এক্ষেত্রে কারো হস্তক্ষেপই কাম্য নয়। তাছাড়া আমাদের ডিপার্টমেন্টের স্যাররা আশ্বাস দিয়েছেন তারা আগামীবার আমাদেরকে এটা বৃহৎ পরিসরে করার জন্যে সহযোগিতা করবেন। আর আমাদেরও ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে আগামীবারের জন্য।
আপনাদের হিজাব ডে উদযাপন সম্পর্কে কিছু বলুন। কবে থেকে ভাবনাটা আপনাদের মাথায় এলো, এটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখলো কীভাবে?
মুনীরা রহমান তাশফী : ২০১৪-তে যখন এই দিবস পালনের নিউজ পত্রিকায় দেখেছিলাম তখন-ই আমার ইচ্ছে জেগেছিলো যে আমাদের দেশেও তো আমরা এমনটা করতে পারি! সেসময়ের নিউজের যেই দিকটা আমাকে বেশী টাচ করেছিল সেটা হলো, ডেনমার্কের খৃস্টান সংবাদ পাঠিকারা সেদিন মুসলিম মেয়েদের সমর্থনে হিজাব পরে সংবাদ উপস্থাপন করেছিলো। তখন আমি টের পেয়েছি যে যেই হিজাবকে বাঙালি মেয়েরা সাধারণ ফ্যাশন হিসেবে নেয়- ইউরোপে সেটা পালন করাই দুঃসাহসের কাজ! তখন থেকেই স্বপ্ন দেখছিলাম মেয়েদের হিজাবের পক্ষে আওয়াজ তুলবো!
যখন ভার্সিটিতে আসলাম তখনও মনে মনে ইচ্ছেটা গোপন রেখেছিলাম। ফার্স্ট ইয়ারে কিছু করার প্রশ্নই আসেনা, সেকেন্ড ইয়ারেও কিছু করার কথা চিন্তা করতে পারিনি। থার্ড ইয়ারে এসে কাছের ফ্রেন্ডদের বললাম এমন একটা আয়োজন করলে কেমন হয় যেখানে বিশ্বব্যাপী হিজাবীদের সমর্থনে এই দিবসটাকে হিজাব আন্দোলনের পক্ষে নিয়ে আসবো?! সাথে সাথে ওরা সমর্থন দেয় এবং আমরা এই হিজাব ডে উদযাপনের স্বপ্ন দেখা শুরু করি তখন থেকেই। আর এ বছরে এসে আমাদের স্বপ্ন পূরণ হলো আলহামদুলিল্লাহ!
হিজাবের ব্যাপারে অনেক সেক্যুলার নারীবাদীর কিছু পপুলার ডিসকোর্স আছে। তারা বলে যে, এটি নারীর অধিকার হরণ করে। আপনাদের কী মনে হয়, হিজাব কি আসলেই নারীর অধিকারকে হরণ করে?
মুনীরা রহমান তাশফী: আমাদের দেশে হিজাবের ব্যাপারে নারীবাদীদের সেসব ডিসকোর্স কেবল আধুনিক অভিজাত উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেই পপুলার। এছাড়া অন্যান্য সাধারণ শ্রেণীর মধ্যে হিজাব পরিধানকে ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধ হিসেবেই চর্চা করা হয়। তা নাহলে সমাজে এখন হিজাবের প্রচলন বাড়ছে কেন?!
হিজাব নারীর অধিকারকে হরণ তো করেই না, বরং হিজাবের উদ্দেশ্য হলো নারীকে সুরক্ষা দেওয়া। একটা প্র্যাকটিকাল উদাহরণ বলি, বেশ কিছুদিন আগে একটা সোশাল এক্সপেরিমেন্টাল ভিডিও দেখেছিলাম। যেখানে দেখা যায়, একটা তরুণী প্রথমে খোলামেলাভাবে ও টাইটফিট পোশাকে ফুটপাথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল। আর চলতিপথে অনেক পুরুষই তাকে বাজে ভাষায় টিজ করছিল। শুধু তাই নয়, সে হেঁটে যাওয়ার পর তার পেছন দিকে অনেক পুরুষই খারাপ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। কিন্তু এর পরের চিত্র হলো, ঠিক সেই একই নারী যখন হিজাব ও বুরকা পরে সেই একই ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে গেলো, তখন একজনও না তাকে টীজ করলো, আর না তার পেছন দিকে কেউ তাকিয়েছিল! এই সোশাল এক্সপেরিমেন্টই প্রমাণ করে হিজাব ও বুরকা প্রকৃতার্থেই নারীর শরীরের রক্ষাকবচ।
আসল ব্যাপার হলো, আমাদের নারীবাদীরা বাংলাদেশকে ইউরোপ ভেবে বসে আছেন। তাদের এহেন ইউটোপিয়ান পপুলার ডিসকোর্সগুলো এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে পাত্তা পাবে না, পাচ্ছেও না। তারা শুধু মুসলিম নারীদের হিজাবের ব্যাপারেই বিষোদ্গার করে থাকে। অথচ উপরেই আমরা বলেছি, হেডকভারিং শুধু যে মুসলিম নারীরাই পরে তা নয়। ধার্মিক প্র্যাকটিসিং খ্রিস্টান ও ইহুদি নারীরাও হেডকভারিং বা হেডস্কার্ফ পরেন। তাদের ক্ষেত্রে হেডকভারিং বলে, আর ইসলামে বলে হিজাব। জাস্ট নামের ব্যবধান।
আর আমাদের নারীবাদীদের আরেকটা পপুলার ডিসকোর্স হলো, হিজাব নারীদের বন্দি করে রাখে। পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে… ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ পৃথিবীতে অসংখ্য মুসলিম নারীর নজির আছে, যারা শিক্ষাদীক্ষায়, চিন্তাচেতনায় ও ক্যারিয়ারের সাফল্যে ঈর্ষণীয়ভাবে প্রাগ্রসর। যেমন, গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি ইতিহাসে প্রথম একজন মার্কিন হিজাবী নারী আমেরিকার একটি টিভিচ্যানেলে সংবাদপাঠিকা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন হিজাব নারীর অধিকার হরণ করে বা নারীকে বন্দি করে রাখে…ইত্যাকার ডিসকোর্সগুলো কতটা অযৌক্তিক!
অন্যদিকে, খ্রিস্টান ক্যাথলিক ধর্মপ্রচারক মাদার তেরেসার দিকে দেখুন। তিনি হেডকভারিং পরেই মানবতার কল্যাণে কাজ করে ১৯৭৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার, ১০৮০ সালে ভারতরত্ন এবং ১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রীডম পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। হিজাব বা হেডকভারিং তো এক্ষেত্রে তার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি! তাছাড়া ভূমধ্যসাগর থেকে শুরু করে ইউরোপীয়ান, মিডল ইস্টার্ন ও আফ্রিকান কালচারের মধ্যে খ্রিস্টান নারীদের জন্য হেডকভারিং বা হেডস্কার্ফকে প্রথা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের নারীবাদীরা কেবল মুসলিম নারীদের হিজাবকে টার্গেট করে ডিসকোর্স তৈরি করে, যাকে আমরা নিছক ইসলামোফোবিয়া হিসেবেই দেখি। হিজাব সমস্যা নয়, ইসলামের প্রতিই মূলত তাদের অস্বস্তি ও ঘৃণা।
হিজাবের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজে আপনারা কি কোন বর্ণবাদের শিকার হন? এগুলোকে আপনারা কীভাবে মোকাবেলা করেন?
মুনীরা রহমান তাশফী : আমরা হিজাবধারী মেয়েরা বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিক হওয়ায় এখানে সাধারণত বর্ণবাদের শিকার হওয়ার ঘটনা খুব কম। তবুও হিজাবের প্রতি এখানে বর্ণবাদী আচরণ একেবারেই নেই- তা বলা যাবে না। মূলত আমাদের এখানে একশ্রেণীর ঘৃণাজীবী সেকুলাররাই হিজাবের প্রতি বর্ণবাদী আচরণ করে থাকেন। তারা যেই মুখ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা ও উদার অসাম্প্রদায়িকতার বাণী কপচান, আবার সেই মুখ দিয়েই তারা হিজাবের প্রতি ঘৃণামূলক বক্তব্য দেন। আমরা এমন সঙ্কীর্ণমনা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড সেকুলারদের এড়িয়ে চলি। এদের সাথে বাদানুবাদ করাও অর্থহীন। এরা অতি গোঁড়া ঘৃণাজীবী সেকুলার। ইসলামের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোই এদের কাজ।
বছরের একটি দিনকে নির্দিষ্ট করে ‘হিজাব ডে’—এভাবে ব্যাপারটা উদযাপনের ইতিবাচক দিকগুলি কী কী বলে আপনাদের মনে হয়?
রিজওয়ানা শারমিন রীতি: হিজাব ডে-কে আমরা অন্যান্য ডে বা দিবসের মতো মনে করি না। এটা নিছক একটা দিবস মাত্র নয়। এর একটা বৈশ্বিক পলিটিকাল আবেদন আছে। মডার্ন দুনিয়ায় মুসলমানদের জন্য কয়েকটি দিবস পালনের বৈশ্বিক রাজনৈতিক গুরুত্ব ও আবেদন আছে। যেমন- আল কুদস দিবস ও নাকবা দিবস। তেমনি হিজাব দিবসকেও আমরা মুসলিম নারীদের জন্য অধিকার আদায়ের লড়াই হিসেবেই দেখি। হিজাব নারীর অধিকার এবং ফ্রীডম অব চয়েসও।
উপরে আমরা বলেছি, ইউরোপের প্রায় ১১টি দেশে হিজাবকে ব্যান করে বর্ণবাদী আইন করা হয়েছে। এতে করে মুসলিম নারীদেরর অধিকার হরণ করা হয়েছে। এছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায়ই হিজাবধারীরা বর্ণবাদী আক্রমণ ও হামলার শিকার হচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে সেইসব নিপীড়িত ও বর্ণবাদী আচরণের শিকার হিজাবধারী বোনদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে তাদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আমরাও ঢাবিতে এবার প্রথম ‘বিশ্ব হিজাব দিবস’ উদযাপন করলাম।
সুতরাং, একে নিছক আর দশটা দিবস পালনের সাথে তুলনা করলে বোকামি হবে। এই দিবসের মাধ্যমে আমরা যেই মেসেজটা ছড়িয়ে দিতে চাই, তা হলো- ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে’র এই আন্তের্জাতিক স্লোগান: ‘হিজাব ইজ মাই ফ্রিডম’, ‘হিজাব ইজ মাই প্রটেকশন’ ‘হিজাব ইজ মাই চয়েস’ ‘হিজাব ইজ মাই কভার’। অধিকার আদায়ের চেতনায় ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে বিশ্বব্যাপী মুসলিম নারীদের মধ্যে আন্তর্জাতিক একাত্মতা ও ঐক্যবোধ জাগিয়ে তোলে। তাই এটি নিছক দিবস উদযাপনকে ছাড়িয়ে ব্যাপক বৈশ্বিক আবেদনও সঞ্চার করে।
হিজাব ডে পালন নিয়ে আপনারা কি কোন বিরুপ বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছিলেন?
মানসুরা জাহান : জ্বি, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যখন হিজাব ডে উদযাপনের জন্য ইভেন্ট ক্রিয়েট করে প্রচার করেছিলাম। তখন সেকুলার বাম ঘরানার অনেকেই এটা নিয়ে ট্রল করেছিল- এতে আমরা কষ্ট পেয়েছিলাম। অন্যদিকে, কিছু ইসলামিকও এ ব্যাপারে দ্বিধান্বিত ছিলেন, কারণ আমাদের মনে হয়েছে তারা সম্ভবত এর বৈশ্বিক রাজনৈতিক আবেদন ও গুরুত্বটা ধরতে পারেননি। উপরে আমরা সেটা ব্যাখ্যা করেছি। আশা করি একসময় তারা সেটা বুঝবেন।
হিজাবের ব্যাপারে সামাজিক যেসব ট্যাবু বা বর্ণবাদ এগুলো কি আগের চে কমেছে না বেড়েছে বলে আপনাদের ধারণা?
মুনীরা রহমান তাশফী : আমাদের দেশের একশ্রেণীর ইসলামবিদ্বেষী সঙ্কীর্ণমনা সেকুলাদের কথা বাদ দিলে হিজাবের প্রতি ট্যাবু বা বর্ণবাদ দেশের আর কোথাও তেমন দেখি না। কারণ আমাদের তৃণমূল সমাজ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ হওয়ায় হিজাব বা বোরকার প্রতি সবসময়ই শ্রদ্ধাশীল ও আন্তরিক। আর ইউরোপসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে হিজাবের প্রতি বর্ণবাদী আচরণের ঘটনা যেমন বাড়ছে, তেমনি এর সমান্তরালে ভিকটিম হিজাবধারীদের প্রতিও সহানুভূতি ও বিপুল সমর্থন দেখা গেছে।
যেমন, ব্রিটেনের একটি নামকরা সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ফোর নিউজে ফাতিমা মাঞ্জি নামে একজন হিজাবধারী মুসলিম উপস্থাপিকা সংবাদ পাঠ করে থাকেন। বিগত ২০১৬ সালে ব্রিটেনের দ্যা সান পত্রিকার কলামিস্ট ও সাবেক সম্পাদক কেলভিন ম্যাকেঞ্জি ঐ হিজাবধারী সংবাদপাঠিকাকে আক্রমণ করে দ্যা সান পত্রিকায় একটি কলাম লিখেছিলেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, “চ্যানেল ফোর নিউজের কী দরকার একজন হিজাবপরুয়া উপস্থাপিকাকে দিয়ে সংবাদ পাঠ করানোর?” তার এই বর্ণবাদী কলাম ও আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন বিশ্বের অনেক বড় বড় রাজনৈতিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। তারা ফাতিমা মাঞ্জির অধিকারের পক্ষে তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এছাড়া এমন আরো অনেক উদাহরণ আছে, হিজাবধারীরা বর্ণবাদী আচরণের শিকার হলে তাদের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করে বিশ্বজুড়ে বিবেকবান ও উদারচেতা মানুষজন তাদের অধিকারের পক্ষে পাশে দাঁড়িয়েছে। হিজাবের প্রতি ট্যাবু ও বর্ণবাদী আচরণ যতই বাড়ছে, ততই তা নিন্দিত ও সমালোচিতও হচ্ছে।
ভার্সিটিতে বা এ ধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাবের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের মোকাবেলা করে হিজাবপরুয়া নারীরা কীভাবে নিজেদের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে? এজ আ ভার্সিটি স্টুডেন্ট, এ ব্যাপারে আপনাদের মতামত ও পরামর্শ কী?
সাবাবা তাহেরা তাবাসসুম : ভার্সিটির স্টুডেন্ট হিসেবে এক্ষেত্রে আমরা বলবো, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাবধারী কোনো ছাত্রী বর্ণবাদের শিকার হলে তা যেন সে চেপে না রাখে। সোশাল মিডিয়ায় কটূক্তিকারী ও আক্রমণকারীর পরিচয় প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানিয়ে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরার পরামর্শ দিচ্ছি আমরা। কারণ এখন সোশাল মিডিয়ার যুগ। প্রতিবাদ শুরু হোক এখান থেকেই, যা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। তখন ব্যাপক নিন্দা ও প্রতিবাদের মুখে বর্ণবাদী আক্রমণকারীরা ক্ষমা চাইতে বাধ্য হবে। এভাবেই প্রাথমিকভাবে নিজেদের অধিকার রক্ষার লড়াই শুরু হোক।
আপনাদের সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আমাদের সকলের পক্ষ থেকে ফতেহ টোয়েন্টিফোর ডটকমকেও ধন্যবাদ।
