
বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে র্যাগিংয়ের নামে নবীন শিক্ষার্থী-নিপীড়নের এক নোংরা সংস্কৃতি ঘাঁটি গেড়ে বসেছে বহুদিন ধরেই।
মূলত, নবীন শিক্ষার্থীদের সাথে সিনিয়রদের পরিচিত হওয়ার নাম করে নবীনদের উপর নানা রকমের শারীরিক-মানসিক নিপীড়নকে নাম দেয়া হচ্ছে র্যাগিং হিসেবে। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা, আইন প্রয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসনের উদাসীনতা ইত্যাদি কারণে এ অপসংস্কৃতিটি বন্ধ হচ্ছে না কিছুতেই। বরং তীব্রতা বাড়ছে দিনকে দিন। র্যাগিংকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটা হিংস্র ঘটনার খবর প্রায়ই দেখা যায় গণমাধ্যমে। ব্যাতিক্রম নয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও।
তবে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে র্যাগিং বন্ধে যে উদ্যোগটি নেয়া হয়েছে তা কালচারাল পলিটিক্সের দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিভাগটির ৪৮ ব্যাচের নবীন শিক্ষার্থীদের আগমন উপলক্ষে ৪৭ ব্যাচের পক্ষ থেকে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি আয়োজন করা হয়েছে রাখিবন্ধন উৎসবের। বিভাগটির নোটিশ বোর্ডে টানানো এ সংক্রান্ত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, র্যাগিংয়ের বিকল্প হিসেবে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। উৎসবের দিন সব ব্যাচের শিক্ষার্থীদের উপস্থিত থাকতেও বলা হয়েছে নোটিশে।
রাখীবন্ধনের ইতিহাস সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে
রাখীবন্ধনের প্রথম সূচনা ঠিক কবে হয়েছে তা এখন নির্ভুলভাবে জানা কঠিন। এ নিয়ে রয়েছে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি। তবে পৌরাণিক এক কাহিনি থেকে জানা যাচ্ছে, দেবতা ও অসুরদের সংগ্রামে দেবতারা পরাজিত হলে, দেবরাজ ইন্দ্র জয়লাভের পথ খুঁজতে দেবগুরু বৃহস্পতির কাছে যখন যাচ্ছিলেন, সেইসময় ইন্দ্রের পত্নী ইন্দ্রানী দেবরাজকে জানালেন অসুরদের পরাজিত করার উপায় তার জানা আছে। আর সেই উপায় হিসাবে পরদিন শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমাতে ইন্দ্রানী স্বামীর হাতে বেঁধে দিয়েছিলেন ‘রক্ষাকবচ’। এবার ইন্দ্র অসুরদের পরাজিত করতে সমর্থ হলেন। এই রক্ষাকবচটি ছিল একটি ‘রাখী’। এরপর থেকে রাখীবন্ধন ধর্মীয় উৎসবের মর্যাদা পায়।
বাঙালি মুসলমানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে রাখীবন্ধন উৎসব
ধর্মীয় উৎসব কখনও কখনও যে নিরীহ ধর্মীয় রূপ ছাড়িয়ে রাজনৈতিক রূপও ধারণ করতে পারে তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের ডাকে রাখীবন্ধন উৎসবের কর্মসূচি পালন। ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর কোলকাতার সাবিত্রী লাইব্রেরি স্বধর্ম সমিতির বিশেষ অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ সভাপতির ভাষণে প্রস্তাব রাখেন–১৬ অক্টোবর থেকে বঙ্গভঙ্গ আইন কার্যকর হলে সেদিন কোনো বাড়িতে রান্নাবান্না হবে না। পালিত হবে রাখীবন্ধন উৎসব।
বঙ্গভঙ্গের ফলে মূলত প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হন বাঙালি মুসলমানরা। আর একচ্ছত্র কর্তৃতব হারান কলকাতা কেন্দ্রিক উঁচু শ্রেণীর হিন্দু রাজনীতিবিদ, জমিদার, ব্যবসায়ী, আইনজীবিরা। ফলে তারা এটিকে শুরু থেকেই মেনে নেননি। এদের সম্মিলিত তীব্র আন্দোলনে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করে ব্রিটিশ সরকার। এতে ক্ষতির শিকার হন বাঙালি মুসলমানরা।
র্যাগিং-বিরোধী প্রচারণার নামে এমন একটি সাম্প্রদায়িক ও ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত উৎসবকে দেশের প্রথম সারির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও ঐতিহ্য পরিপন্থী মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
