
ইফতেখার জামিল
আজ বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। পশ্চিমা সভ্যতার এই মানবাধিকার ধারণার প্রতি আমার বিশেষ আগ্রহ আছে। মানবাধিকারের নামে পশ্চিমারা কীভাবে অন্যদের উপর আগ্রাসন চালিয়েছে, সন্ত্রাসবাদ ও উপনিবেশ তত্ত্ব হালাল করেছে, সেটা আমার অজানা নয়। তবে তারা আধুনিক নগর ও নাগরিক ব্যবস্থায় তাদের নিজেদের রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে এই মানবাধিকার তত্ত্বের ভিত্তিতে নৈতিক ও আইনি লড়াই করার ক্ষেত্র তৈরি করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। এর ভিত্তিতেই পশ্চিমা ভণ্ড ও অসম বণ্টনব্যবস্থা ভিত্তিক রাষ্ট্রগুলোতেও নাগরিক মর্যাদা ও সুবিধা অনেক বেশী। আমি অনেক ইসলামপন্থীকে জানি, যারা মুসলিম দেশে এসে ইসলাম চর্চা ও প্রচার করতে আগ্রহী না।
আপনি বলতে পারেন, রাষ্ট্র তো নাগরিকদের অধিকার অবশ্যই দিবে, কেন দিবেনা? বাকী বাস্তবতা হচ্ছে, আধুনিক মানবাধিকার চর্চা বিস্তারিত হবার আগে এটা অত স্পষ্ট ছিল না। আমেরিকান ইতিহাসে সিভিল ওয়ারের সময় দক্ষিণপন্থী যারা ছিল, তারা সাদা-বর্ণের প্রাধান্যের ভিত্তিতে কালোদের অধিকার হরণের পেছনে যুক্তি দিয়েছিল। আঠারো আশির আগেও তাদের প্রশাসনিক নিয়োগ স্বচ্ছ ছিল না, প্রেসিডেন্টের হত্যার মাধ্যমে তারা এই অধিকার নিশ্চিত করে। আমেরিকান সংবিধানে স্বাধীনতার কথা থাকলেও সুপ্রিম কোর্ট ও রাজনীতিবিদরা নিয়মিত এর অপব্যবহার করেছেন।
Cherokee Trail of Tears নামে একটা বিখ্যাত ঘটনা আছে। রেড ইন্ডিয়ানদের রাষ্ট্রপতির আদেশে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। একইভাবে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে কালোদের সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখার রায় দেওয়া হয়। গত শতকের ষাটের দশকে ব্যাপক নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে কালোরা তাদের অধিকার ‘অনেকটা’ নিশ্চিত করে। অর্থাৎ একটা ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তারা নাগরিক অধিকারের পক্ষের নৈতিক ও আইনি যুক্তি প্রতিষ্ঠা করে। আমেরিকায় এখনো নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন হয়, তবে তাকে আইনি ও নৈতিকভাবে ব্যাখ্যাহীন বৈধতা দেবার সুযোগ কমে এসেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোরআন-হাদিসে কি কোন ঘাটতি আছে, ইসলামী ফিকাহে কি অধিকারের আলোচনা নেই? না ঘাটতি নাই। অধিকারের আলোচনাও আছে। তবে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রের বাইরে থাকায় ইসলামী ফিকাহ অনেকাংশে ইবাদাত ও নিকাহ-তালাকের আলোচনায় রুপান্তরিত হয়েছে।
ধরা যাক, কোন বিশেষ কারণে কোন দেশে একশো বছর বিবাহ নিষিদ্ধ থাকলো। এর প্রভাব কী হবে জানেন? মানুষ একশো বছর পর অনেক মাসায়েল বুঝবে না। অনেক নতুন পরিস্থিতি ও প্রশ্নের সৃষ্টি হবে। তখন তৈরি হবে এক নতুন বিশৃঙ্খলা। নতুন প্রশ্ন ও পরিস্থিতি ঠিকঠাক বুঝার চেষ্টা করা হবে না, অনেক নুসুস ও ফিকহি কাওয়ায়েদ-জাওয়াবেত টেনে এনে লাগানো সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ফলে অনেক হালাল হারাম হয়ে যাবে। অনেক উরফ-প্রচলন নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। শিথিলতা ও কঠোরতাপন্থীদের আলাদা দল হয়ে যাবে।
এর একটা দৃষ্টান্ত হচ্ছে, মাওলানা মওদুদির মত মেধাবী ও মুখলিস মানুষ রাজনীতির সাথে ধর্মের সম্পর্ক ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আল্লাহর সিফাতের সাথে মিলিয়ে এমন আলোচনা করেছেন, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমরা মেনে নিতে পারেননি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, শাইখ আলবানী মওদুদিকে সমর্থন করেছিলেন। যদিও বর্তমানে মুখতার শানকিতি, মু’তাজ খতীব ও মুহাম্মদ জাবরুন বলছেন, তার অবস্থানে বেশ সমস্যা ছিল। ফলে একদিকে যেমন অনেক আলেম ফিকাহ ও ইসলামকে সীমিত করে ফেলছেন, আবার অন্যদিকে মওদুদির মত অনেকে ভুল ব্যাখ্যা করছেন।
যেহেতু গত কয়েক শো বছর এ অঞ্চলে শক্তিশালী কোন মুসলিম রাষ্ট্র ছিল না, তাই আধুনিক নগর ও নাগরিক অধিকারের ইস্যুতে আলেমরা চিন্তার চর্চায় পিছিয়ে পড়েছেন। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বয়ানের মধ্যেও উপনিবেশী আমলের রাষ্ট্র-প্রতিরোধী বক্তব্য অনেক গালেব, রাষ্ট্রের প্রতি তাদের তৈরি হয়েছে একরকম দূরত্ব ও হতাশা। শুধু ভয়, হতাশা ও ঘৃণার মধ্য দিয়েই তারা রাষ্ট্র প্রশ্নের মোকাবেলা করছেন। অনেক আশাবাদী কথা আছে নিশ্চয়। নয়তো নির্বাচনে যাওয়া ও রাষ্ট্রে অংশগ্রহণ সম্ভব ছিলোনা। তবে এর কোন শক্তিশালী একাডেমিক ভিত্তি নেই।
কিছুদিন আগে আমার এক মাদরাসায় আধুনিক সময়ে ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা বিষয়ক একটা আলোচনা পেশ করার সুযোগ হয়েছিল। দেখছিলাম, ছাত্ররা আমার কিছু কথায় সংশয় প্রকাশ করছে। আমি বললাম, যদি এগুলোর সাথে দ্বিমত করো, তাহলে তোমাদের হুজুররা যা করছেন, তার সাথে কীভাবে একমত হও?
মোটকথা একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই দূরত্বে জায়গা করে নিয়েছে ভয়, হতাশা ও ক্লান্তি। ইসলামপন্থীরা কোন ইতিবাচক নাগরিক আন্দোলনে শরীক হতে পারছেন না। বাংলাদেশের মতো একটা মুসলিম রাষ্ট্রেও ক্ষমতার তর্কে মুসলিম আত্মপরিচয় ও আকিদার মতো বিষয় নির্বাচনী আলোচনার বিষয়ে রুপান্তরিত হচ্ছে। আমাকে ভোট দিলে রসূল ভোট পাবের মতো বক্তব্য তৈরি হচ্ছে। ফলে এখানে সেকুলারিজমের প্রাসঙ্গিকতা তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ আপনি যখন ক্ষমতার তর্কে নির্দিষ্ট দিকে অনেক বেশী জোর দিবেন, তখন বিপরীত দিকে যাবার লোকও তৈরি হবে। মাঝখান দিয়ে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন গায়েব হয়ে যায়।
মানুষের নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে ইসলামপন্থীদের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পায় না। ফলে তাদের সমর্থনও করে না। এসব দিক থেকে ভাবলে আমাদের মানবাধিকার চর্চার দিকে আরও বেশী মনযোগী হওয়া জরুরী উঠে। যেভাবে ইসলামী ব্যাখ্যার মাধ্যমে আধুনিক অর্থনীতির সীমিত প্রয়োগ সম্ভব হয়েছে, তেমনি মানবাধিকারের চর্চা করাও সম্ভব। এবং জরুরী।
