নির্বাচনী মাঠে ঐতিহ্যবাদী ইসলামপন্থী প্রার্থীদের অবস্থান কতটা সম্ভাবনাময়?

হামমাদ রাগিব

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ৭০টি ইসলামি দল এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্যে আছে ঐতিহ্যবাদী ইসলামপন্থী বেশ কয়েকটি দল। দুই জোটে থাকা ইসলামি দলের বাইরে ভোটের মাঠে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সবচেয়ে সক্রিয়। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসনেই দলটি নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে। কিন্তু পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে ২৯৮ আসনের কোনো একটাতেও তাদের প্রার্থী বিজয়ী হবার সম্ভাবনা খুব একটা নেই। তারপরও ভোটের মাঠে তাদের প্রচারণা উল্লেখ করার মতো।

ঐক্যফ্রন্টে থাকা ইসলামি দলগুলোর মধ্যে যাঁরা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন, তাদের মধ্যে নির্বাচনী মাঠে সবচেয়ে এগিয়ে সিলেট-৫ আসনের প্রার্থী জমিয়ত নেতা মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক। স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক বিপুল ভোটে জয়ী হবেন এ আসন থেকে। ঐক্যফ্রন্টে থাকা সবক’টি দল নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে উবায়দুল্লাহ ফারুকের পক্ষে।

সিলেট-২ আসনে খেলাফত মজলিস নেতা মুনতাসির আলী দলীয় প্রতীক ঘড়ি নিয়ে লড়ছেন। সিলেট-২ আসনটি বিএনপির গুম হওয়া নেতা ইলিয়াস আলীর। ইলিয়াস আলীর অনুপস্থিতিতে এ আসনে ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন মুনতাসির আলী। কিন্তু ঐক্যফ্রন্ট মনোনয়ন দেয় ইলিয়াস আলীর স্ত্রী লুনাকে। মহাজোটের প্রার্থী বর্তমান এমপি ইয়াহইয়া চৌধুরীর এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাই কোর্ট লুনার প্রার্থিতা স্থগিত করে দেয়। এখন পর্যন্ত এ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেনি হাইকোর্ট। অবশেষে যদি লুনা নির্বাচনো অংশগ্রহণ করতে না পারেন, তবে মুনতাসির আলীর বিজয় সুনিশ্চিত বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। কারণ, ইয়াহইয়া চৌধুরী জাতীয় পার্টির হওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা এ আসনে মহাজোটের প্রার্থী মনোনয়নে সন্তুষ্ট নয়। ফলে নির্বাচনী মাঠে তাদের অনেকেই নিষ্ক্রিয়। অনেকে আবার কাজ করছেন মুনতাসির আলীর পক্ষে।

সিলেট-৩ আসনে খেলাফত মজলিস দলীয় প্রতীকে মনোনয়ন দিয়েছে মাওলানা দেলোয়ার হোসাইনকে। তাঁর বিপরীতে আছেন ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত বিএনপি নেতা শফি চৌধুরী এবং মহাজোট মনোনীত আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমান সাংসদ মাহমুদুস সামাদ কয়েস। উভয় জোটের বিপরীতে থেকেও দেলোয়ার হোসাইনের অবস্থান এ পর্যন্ত বেশ শক্তিশালী। তবে শেষ পর্যন্ত বিজয়ের মালা কার গলায় যাবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয়রা।

হবিগঞ্জ-২ আসনে ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন খেলাফত মজলিস নেতা মাওলানা আবদুল বাসিত আজাদ। স্থানীয় ভোটাররা ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে জানিয়েছেন, এ আসনে আবদুল বাসিত আজাদের অবস্থান শক্তিশালী। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা প্রবল। স্থানীয় বিএনপি নেতা ডা. জীবন, যিনি এ আসনে ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন, বিভেদ ভুলে এখন তিনিও কাজ করছেন আবদুল বাসেত আজাদের পক্ষে।

হবিগঞ্জের আরেকটি আসন হবিগঞ্জ-৪ থেকে ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন খেলাফত মজলিস নেতা অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদের। তবে তাঁর অবস্থান এখনও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা এখনও তাঁকে ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি। তাই নির্বাচনী মাঠে তাদের অনেকেই নিষ্ক্রিয়।

সুনামগঞ্জ-৩ আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী জমিয়ত নেতা অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী। তাঁর বিপরীতে মহাজোট মনোনীত মোহাম্মদ আবদুল মান্নান।

মোহাম্মদ আবদুল মান্নান নৌকা প্রতীকে ও জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম নেতা মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে লড়বেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ এই আসনে সাংসদ নির্বাচিত হন।

২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল আবদুস সামাদ আজাদ বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেলে ওই বছরের ২০ জুন উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে অংশ নেয়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাবেক সচিব মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ও নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী যুবলীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য নজরুল ইসলাম এবং চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ৪৪ হাজার ৭০১ ভোট পেয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন শাহীনুর পাশা চৌধুরী। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান পান ৩৮ হাজার ৩০১ ভোট।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। ২০–দলীয় জোটের প্রার্থী জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের নেতা শাহীনুর পাশা ৫৬ হাজার ৭৬৫ ভোট পান। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ২০–দলীয় জোট অংশ না নেওয়ায় এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ৫০ হাজার ৪৩৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।

আসন্ন নির্বাচনে মাওলানা শাহীনুর পাশার পক্ষে বিএনপির নেতা-কর্মীরা মাঠে সক্রিয় থাকলেও ফলাফলের ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদী নন স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের অনেকে।

যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসন থেকে ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়নে নির্বাচন করছেন জমিয়তের একাংশের শীর্ষ নেতা মুফতি ওয়াক্কাস। কিন্তু স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা এ মনোনয়নে ভীষণ ক্ষুব্ধ। তাঁরা মুফতি ওয়াক্কাসকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। বিএনপি নেতা-কর্মীদের এই বৈরি অবস্থানের কারণে খানিকটা কোনঠাসা হয়ে আছেন মুফতি ওয়াক্কাস। তারপরও এলাকায় জনপ্রিয়তার কারণে ফলাফলের ব্যাপারে খুব আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন একাধিক জমিয়ত নেতা।

এ ছাড়াও ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত মজলিস দলীয় প্রতীকে বেশ কয়েকটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। কিন্তু জয়ী হয়ে সংসদ পর্যন্ত যাবেন—এমন আশাবাদ আপাতত তাঁদের কারও ব্যাপারেই করা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করছেন পর্যবেক্ষকরা।

আগের সংবাদনির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই : ইসি সচিব
পরবর্তি সংবাদখালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না