জীবন চলছে যেমন পুরান ঢাকায়

কাজী মাহবুবুর রহমানঃ 

পুরান ঢাকা আমাদের রোমাঞ্চ ও পুলকের শহর। অগণিত গল্পের শহর। পুরান ঢাকার একটি বিশেষত্ব হল একই সাদৃশ্যের শত শত গলি। পথে হাটলেই চোখে পড়ে সব পলেস্তরা খসে যাওয়া পুরনো দালান। ব্যস্ত মুদি দোকান, কোলাহলে জেগে ওঠা কাঁচা বাজার, হকারের হাঁকডাক, ছেলেদের আড্ডা আর হাসিমুখো অগুনতি মানুষ।

সকালবেলা হাঁটতে বের হলে অন্যান্য আবাসিক এলাকাগুলির মত স্বাস্থ্য সচেতন শরীর চর্চায় ব্যস্ত মানুষ খুব একটা চোখে পড়ে না। বরং দেখা হয়ে যায় এ যুগের ভিস্তিওয়ালাদের সঙ্গে। কোনো কোনো রাস্তায় দেখা মেলে আধ্যাত্মিক পীর ফকিরদের । তারা পানিতে মাথা ধুইয়ে সারিয়ে দেয় অনেক অসুখ। মানুষও পরম বিশ্বাসে তাদের কাছে ভিড় করে।

একটু একটু করে পথঘাট জেগে উঠতে শুরু করে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কালো মাজন হাতে দাঁত মাজতে দেখা যায় আদি নিবাসীদের। তারপর জেগে ওঠে হোটেল ও খাবারের দোকান। মায়েরা বাচ্চাদের হাত ধরে নিয়ে যায় স্কুলে ও মাদ্রাসায়। কর্মব্যস্ত মানুষ কাজের জন্য ছুটতে শুরু করে।

সারাদিন গেলে আবার সন্ধ্যায় জমে যায় পথখাবারের দোকান, চা দোকানের আড্ডা। রাজনৈতিক গুজব আর অসংখ্য হাসি কান্নার গল্প। এ যেমন একটি সুখী পুরান ঢাকার দৃশ্য। তেমনি এর সঙ্গে রয়েছে বেহাল জনজীবনের অসংখ্য দুর্ভোগ।

পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্র লালবাগসহ অনেক জায়গায় যথাযথ পরিমাণে সিটি কর্পোরেশান প্রদত্ত ভাগাড় চোখে পড়েনা। ফলে নানা জায়গায় গড়ে উঠেছে বিপজ্জনক নর্দমা। এখানে ময়লা ফেলা কিংবা ময়লা পরিস্কার করার কোনো নিয়ম নেই। বেশীরভাগ জায়গাতেই নেই নির্ধারিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ফলে ময়লা জমে প্রায়ই দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আসে।এছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে মানুষের ঘরের উচ্ছিষ্ট ময়লা নিস্কাষণের জন্যও নেই কোন কার্যকরী ব্যবস্থা।

রাস্তাঘাটের বেহাল দশা সেই অনেকদিন থেকেই। সুয়ারেজের লাইনগুলি ময়লা জমে আটকে যাচ্ছে প্রায়ই। এর ফলে সামান্য বৃষ্টি হতেই রাস্তাঘাট হয়ে যাচ্ছে চলাচলের অযোগ্য। এলাকাবাসীদের সঙ্গে কথা বললে তাদের ভেতরের অসন্তোষ লক্ষ্য করা যায়। বছর বছর বিভিন্ন নির্বাচনের পদপ্রার্থী হয়ে নেতারা হাজারও আশ্বাস দিলেও কাজেরবেলায় তার কিছুমাত্রও বাস্তবায়িত হয়নি বলে তারা জানান।

পুরান ঢাকার অলিগলিতে রয়েছে বিভিন্ন ফ্যাক্টরি ও চামড়ার ট্যানারী। এদের অধিকাংশরাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার সরকারি নিয়মগুলি মানছেন না। হাজারীবাগ এবং তার নিকটবর্তী এলাকাগুলিতে তো চামড়ার দূর্ভোগ আছেই, এই দূর্ভোগ পিছু ছাড়েনি লালবাগ, ইসলামপুর, শহিদনগর এবং কামরাঙ্গিরচর বাসীদেরও।

সরকারী নিয়মনীতি থেকে দূরে এসব কর্মপ্রতিষ্ঠানগুলির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হল শিশুশ্রম।এরা অবলীলায় শিশুদের কাজে নিচ্ছে। অভিভাবকদের অবহেলায় শিশুরা যেমন অপরিণত বয়সে কাজ করার প্রয়াস পাচ্ছে, তেমনি এসকল কারখানা সংশ্লিষ্টরাও স্বল্পবেতনে শিশুদের নিয়োগ দিচ্ছে। এর ফলে এসকল শিশুরা যেমন শিক্ষার আলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, পাশাপাশি তাদের শিশু অধিকারও ক্ষুন্ন হচ্ছে।

শিক্ষা এবং উপযোগী কর্মসংস্থানহীন বেড়ে ওঠা এসকল শিশুদের ভবিষ্যত এক অনিশ্চিত ভয়াবহতার দিকে এগুচ্ছে। এরা খুব অল্পবয়সেই কৌতূহল কিংবা সঙ্গদোষ থেকে ঝুকে যাচ্ছে ভয়াল সব নেশার দিকে। আর এ সব কিছুই যেন হয়ে যাচ্ছে স্বাভাবিক নিয়মে। রাস্তায় ময়লা জমে থাকার, সে তো থাকবেই। ড্রেন থেকে মল উঠে এসেছে রাস্তায়, এ তো হবেই। শিশুরা শ্রম দিচ্ছে, অবসরে নেশা করছে এও যেন হওয়ারই ছিল।

এইরকম এক নির্বিকার অভ্যস্ততার ভেতর কেটে যাচ্ছে পুরানঢাকাবাসীদের দিন। মানুষের সচেতনতা নেই। প্রশাসন নির্বিকার। আর নির্বাচিত জননেতাগণ জানেনই না কী হচ্ছে সেখানে। কোনো সভ্য দেশের রাজধানীর এই ঐতিহ্যবাহী শহর এভাবে চলতে পারেনা।

আমরা পুরান ঢাকার সংকটগুলি সম্পর্কে জানি। চাইলেই এখানে প্রশস্ত হাইওয়ে করা সম্ভব নয়। কিন্তু যতখানি রাস্তা আছে তাকেও কি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়? আইন করে বিভিন্ন কারখানা ও ট্যানারিগুলিও কি পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব নয়?

আর শিশুদেরকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া তো রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আমাদের সদিচ্ছাতেই সব সম্ভব। মানুষের ভেতর সচেতনতা তৈরী, নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপ, এবং প্রশাসনের চাপ প্রয়োগই পুরাণ ঢাকাকে ফিরিয়ে দিতে পারে পুরান ঐতিহ্য।