মুফতী আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে কেন মাসঊদ অনুসারীরা?

ওমর ফারুক:

মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসঊদ সম্পাদিত মাসিক পাথেয় পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়ার শিক্ষা সচিব ও উলুমুল হাদীস বিভাগের প্রধান দেশ বরেণ্য আলেম মুফতী আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ধর্মীয় অঙ্গনে চলছে নিন্দার ঝড়। মাওলানা মাসঊদ অনুসারী তরুণ মুফতীদের যৌথ বিবৃতিতে মুফতী আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে ধৃষ্টতা বলে মন্তব্য করছেন দেশের অনেক আলেম-উলামা, লেখক, ইসলামি চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা।

ঢাকার কলাতিয়ায় অবস্থিত মারকাযুদ দাওয়ার ‘দাওয়া ভবন’

মঙ্গলবার রাতে বিবৃতিটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই মাসঊদ অনুসারী আলেমদের নিন্দা করে আসছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় ধর্মীয় সমাজের প্রতিনিধিরা । তাবলিগ জামায়াতের একাংশের নেতা মাওলানা সা’দ কান্ধলভীকে নিয়ে মুফতী আব্দুল মালেকের দেয়া বক্তব্যের প্রেক্ষিতে  মাসঊদ অনুসারী আলেমরা এ বিবৃতি দিলেও তার ভাষা, শব্দ প্রয়োগ ও তাদের আক্রমনাত্মক মনোভাব নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় প্রশ্ন ও কৌতুহল। রহস্য দানা বাঁধছে বোদ্ধামহলে। অরাজনৈতিক ও নিভৃতচারী আলেম মুফতি মালেকের বিরুদ্ধে কেন ক্ষেপলেন  ফরিদ উদ্দীন মাসঊদের অনুসারীরা? প্রশ্নটির অনুসন্ধানের আগে জেনে নেওয়া যাক কী ছিল মুফতী আব্দুল মালেকের সা’দ কান্ধলভীকে নিয়ে দেয়া বক্তব্যে?

মারকাযুদ্ দাওয়াহ এর কুতুব খানার একাংশ

মোবাইল এপ্লিকেশন হোয়াটসঅ্যাপে আরব আলেমদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যের একাংশে মুফতী আব্দুল মালেক বলেছেন, ‘সাদ সাহেব তার বয়ান ও আলোচনায় প্রতিনিয়ত এমন নিত্যনতুন উদ্ভট বিষয় নিয়ে আসছেন, যা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মানহাজ, জমহুর উলামা, মুফাসসিরিন, ফুকাহা ও মুহাদ্দিসিনের মানহাজের পরিপন্থী। যার পরিপ্রেক্ষিতে শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা তার অনুসরণ-আনুগত্য জায়েয মনে করি না।’

এ অডিও বার্তাটি অনলাইনে ভাইরাল হওয়ার পরই ফাতেহ২৪ সহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টি প্রচারিত হয়। এ নিয়ে মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা এর সত্যতা নিশ্চিত করেন। মুফতী আব্দুল মালেকের এ বক্তব্য গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত না হলেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি এই মতই পোষণ করেন এবং ভবিষ্যতে আরও স্পষ্ট ও বিস্তারিত বক্তব্য দানের ইচ্ছাও রাখেন বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

বয়ানের মাঠে মাওলানা আব্দুল মালেক

মাওলানা সা’দ কান্ধলভীকে নিয়ে দীর্ঘদিন  ধরে গবেষণা করছেন এমন একজন প্রখ্যাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে  অনলাইনের একটি অনির্ভযোগ্য প্রতিষ্ঠান থেকে তরুণ মুফতিদের স্বাক্ষরিত  এমন অভিযোগ কি  করা যায়, নাকি এর আড়ালে বাস করছে অন্য কোনো মতলব? এ প্রশ্ন এখন সর্ব মহলের। মুফতি আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে পাথেয় অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত বিবৃতির উল্লেখযোগ্য অংশে বলা হয়,

‘দিল্লীর মাওলানা সা’দ কান্ধলবীর ব্যাপারে ‘উস্কানিমূলক’ ফতোয়া ছুড়ে দিয়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করলেন পাকিস্তানি চিন্তাধারার বাহক ও পাকিস্তানি চিন্তাধারা বাস্তবায়নের স্বপ্নে বিভোর আলেম মাওলানা আবদুল  মালেক। দারুল উলুম দেওবন্দ যেখানে এমন কোন কথা না বলে মীমাংসার চেষ্টা করে যাচ্ছে, সেখানে ‘দেওবন্দী চিন্তাধারার বিপরীতে গিয়ে’ ধৃষ্টতাপূর্ণ এমন আচরণে কোটি কোটি মুসলমানের মনে আঘাত দিলেন পাকিস্তানপন্থী এই আলেম। এর দ্বারা তিনি মূলত দারুল উলুম দেওবন্দ ও আকাবিরে দেওবন্দকেই প্রকারান্তরে অস্বীকার করলেন।’ এ বিবৃতিতে মাওলানা আবদুল মালেককে বৃটিশ বেনিয়াদের যুগে বৃটিশ এজেন্ডা বাস্তবায়নের আলেমদের সঙ্গেও তুলনা করেন। ‘জনস্বার্থে’ বিবৃতির নিচে উল্লেখ করা হয়েছে মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান, মুফতি মুমতাযুল হক, মুফতি আব্দুস সালামসহ ‘তথাকথিত’ ১৪ জন মুফতির নাম। যাদের অনেকেই মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসঊদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

অনেকে বলেছেন, তাদের কয়েকজন পরিচিত মুখ হলেও বাকীরা মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসঊদের এক লক্ষ মুফতির স্বাক্ষরিত জঙ্গিবাদবিরোধী ফতোয়ার মুফতিদের মতোই। এমন মুফতিদের ব্যবহার করে এ দেশে কীসের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসঊদ এ প্রশ্ন নিয়ে এখন উল্টো তার দিকেই আঙ্গুল তুলেছেন অনেকে।

তাৎক্ষণিক এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বিশিষ্ট লেখক ও ইসলামী চিন্তাবিদ শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘বাংলাদেশের দ্বীন ও ইলম চর্চার এক বরেণ্য মানুষ মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব। তাকে নিয়ে একটি মুখচেনা অঙ্গন যে ধৃষ্টতাপূর্ণ শব্দমালা উচ্চারণ করেছে, এর উৎস কোথায়? এতবড় দুঃসাহস এরা পেল কোন কেন্দ্র থেকে, জানতে মন চায়!

বেলা শেষে লালবাগ মাদরাসার মুহাদ্দিস ও ইসলামী ঐক্য জোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘দেশের বরেণ্য আলেম মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক সাহেব। তিনি সা’দ সাহেব সম্পর্কে যা বলেছেন আমি তাঁর সাথে একমত। তিনি সঠিক বলেছেন। রয়ে সয়ে, মার্জিত, শালীনতা ও ভদ্রতার সাথেই বলেছেন। তাকে নিয়ে একটি মহল যে ধৃষ্টতাপূর্ণ কথা বলছেন আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ধৃষ্টতা প্রদর্শনকারীদেরকে এ বিষয়ে গভীরভাবে কুরআন সুন্নাহ অধ্যায়ন করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

ইকবাল হাসান জাহিদ লিখেছেন, ‘ঢাকায় একটা গ্রুপ তৈরি হোক, যারা জনাব ফরিদ মাসউদ সাহেবকে তাঁর প্রতিষ্ঠানের বেয়াদবদের সম্পর্কে তাঁকে সতর্ক করে দেবেন। আশা করি তিনি বিষয়টা আমলে নেবেন। করণ সবকিছুর পরে তিনি একজন বরেণ্য আলেম। যারা এই ধৃষ্টতা যারা দেখিয়েছে তাদেরকে মুফতী আব্দুল মালিক সাহেবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাবেন।’

রুহুল আমীন নাগরি লিখেছেন, ‘মাওলানা আব্দুল মালেক বাংলাদেশের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তুক আলেম, ফকিহ। হক্কানী উলামায়ে কেরামের ভাষ্যকার। তিনি সম্প্রতি যে ফতোয়া দিয়েছেন,তা ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী। তার ফতোয়ায় বিশ্বের ৯৫ ভাগ মুসলমানের হৃদয়ের আকুতিই প্রতিফলিত হয়েছে। অতএব, যে বা যারাই বরেন্য এই আলেমের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন তারা ফেতনা সৃষ্টিকারী।’

মুফতী মালেকের পক্ষে এমন শত শত স্ট্যাটেস জয় জয় ধ্বনী উঠছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এটাই প্রমাণ করে এ দেশের আলেম উলামাদের হৃদয়ে কি আবেগের জায়গা নিয়ে তিনি আছেন। মুফতী মালেকের বিরোদ্ধাচারীদের রহস্য খুঁজতে আর কোনো প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে না। তবে  এর আড়ালে ফরিদ উদ্দীন মাসঊদের পরোক্ষ হাত রয়েছে বলে মনে করছেন অনেক বোদ্ধা মহল। কারণ সর্বশেষ রাত দশটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এখনো সাইট থেকে এ বিবৃতিতে তুলে নেয়নি মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসঊদ পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি। তবে কেন মাওলানা মাসঊদ ক্ষেপেছেন এ নিভৃতচারী আলেমের প্রতি?

মারকাযুদ্ দাওয়াহ এর কুতুব খানার একাংশ

এমন প্রশ্নে একটি সূত্র ফাতেহ২৪কে জানায়, মাওলানা মাসঊদ আগে থেকেই মাওলানা সা’দপন্থী ছিলেন। এটা নিয়ে বেশ গুঞ্জনও ছিল। কিন্তু মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পাথেয় অনলাইন সংস্করণ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হবার পর তার মুখোশ উম্মোচন হয়ে গেছে। বাংলাদেশে মাওলানা সা’দ বিরোধী আন্দোলনের সময় গণমাধ্যমে এ বিষয়ে কোনো কথাও বলেননি মাওলানা মাসঊদ। সেসময় এ প্রতিবেদক তার কাছে এ নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি নিজেই তাবলীগের কাজের সঙ্গে যুক্ত নন বলেও মন্তব্য করেছিলেন। দ্বিতীয়ত মাওলানা মাসঊদের অনেক কাজেরই পরোক্ষ সমালোচক ছিলেন মুফতি আব্দুল মালেক।মাওলানা মাসঊদের জঙ্গিবাদবিরোধী  এক লক্ষ মুফতির স্বাক্ষরিত ফতোয়ায় স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছিলেন মুফতি আব্দুল মালেক। এটাও ক্ষোভের কারণ হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া মাওলানা মাসঊদের পোপের সঙ্গে মেলামেশা এবং তার  ধর্মনিরপেক্ষতা ও জিহাদ বিষয়ক কিছু বক্তব্যে দ্বিমত করে নানান সময় মুফতী আব্দুল মালেক ঘরোয়া অনেক মজলিসে বক্তব্য দিয়েছেন।  এ কথাও কানে গিয়ে থাকতে পারে মাওলানা মাসঊদের। এসব কারণেই মাওলানা ফরিদ মাসঊদ মূলত মুফতী আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে পারেন বলে সূত্রটি দাবি করে।