জীবন গড়ার দহলিজে (২) ।। আবদুল্লাহ আল মাসউদ

আবদুল্লাহ আল মাসউদ

ঘন সবুজে ঘেরা এক গ্রামে জন্মে আমি বেড়ে উঠেছি। নারিকেল আর সারিসারি সুপারি বাগানের মধ্যিখানে গড়ে উঠেছিলো গ্রামের সব বাড়ি-ঘর। সারাদিন বনবাদাড়ে ঘোরাঘুরি করা, পাখির বাসা খুঁজে বেড়ানো আর বর্ষায় বিলের স্বচ্ছ পানিতে শাপলা-শালুক কুড়ানোতে ছিলো আমার শৈশবের প্রাথমিক দিনগুলো মোড়া। সকাল হতো সূর্যের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে, সন্ধ্যা হতো নীড়ে ফেরা পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ শুনে।

গ্রামের মধ্যিখানে জীর্ণ-শীর্ণ একটি দালানে ছিলো আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়। একদিন সকালে ছোট মামা আমাকে নিয়ে ভর্তি করে দেন সেই স্কুলে। হেডমাস্টার মাথার উপর দিয়ে হাত নিয়ে অন্য পাশের কান ধরার পরীক্ষা দিতে বলেন! এতে নাকি সাত বছর হয়েছে কি না নিশ্চিত হওয়া যায়! আমার উৎসাহী মামা কান টেনে বড় করে সেদিন আমাকে পরীক্ষায় উতরে যেতে সাহায্য করেন। এই ছিলো স্কুল-জীবনের শুরু।

এর আগে সকালের মক্তবে অবশ্য কিছু দিন আলিফ-বা-তা-সা পড়েছিলাম। আব্বু থাকতেন ঢাকায়। টিকাটুলির হাটখোলা রোডে ছিলো তাঁর মুদি-দোকান। কিছু দূর সামনেই টিকাটুলি জামে মসজিদ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আব্বুর সেখানেই পড়া হতো। এই মসজিদেরই দোতলায় ছিলো একটি হিফজখানা। ছোট-ছোট ছেলেদের কুরআন তিলাওয়াতে সবসময়ই মুখরিত থাকতো সেখানটা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাত্ররা নিচতলায় মসজিদে এসে পড়তো। নামাজের সময় হলেই তারা নেমে আসতো জান্নাতের পাখি হয়ে। সারিবদ্ধভাবে। একজনের পর অন্যজনে। আগত মুসুল্লিরা মুগ্ধ নয়নে দেখতেন তাদের। দেখতেন আমার আব্বু্ও। তাঁর হৃদয়-মন অন্যরকম ভাবালুতায় হারিয়ে যেতো। তিনি কল্পনায় নিজের ছেলেকেও তাদের ভেতর খুঁজে পেতে চেষ্টা করতেন।

অনেকদিন পরপর আব্বু বাড়ি আসতেন বেড়াতে। সন্তানদের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা লালন করা সত্ত্বেও কেন যেন আমরা ভাই-বোনরা আব্বুকে খুব ভয় করতাম। যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতা হয়তো আমাদের মধ্যে তৈরি করে দিয়েছিলো অদৃশ্য কোনো দেয়াল। সেই দেয়াল ভেদ করে ভালোবাসাগুলো কাছাকাছি হতে পারতো না কখনও। আব্বুর থেকে তাই দূরে-দূরে থাকতাম। যত দিন তিনি বাড়ি থাকতেন, আমি হয়ে যেতাম ভিন্ন কেউ। শুধু খাবারের সময়টাতে তার মুখোমুখি হতাম। ঠিক সে সময়েই তিনি তার হৃদয়ে অঙ্কিত স্বপ্নের ডালি খুলে বসতেন। গল্প করতেন আমাদের সাথে। শোনাতেন তার দেখা সেই জান্নাতি পাখিদের কথা : কীভাবে তারা সুশৃঙ্খলভাবে নামাজে আসে, কীভাবে সুমধুর কণ্ঠে কুরআনের তিলাওয়াত করে—সেইসব। আমি ও আমরা মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকতাম তাঁর দিকে। কল্পনার পাখায় ভর করে নিজেকে আমি দেখতে পেতাম সেই সারিবদ্ধ জান্নাতি পাখিদের কাতারে।

একবার, দুইবার, বারবার এমন গল্প শুনে শুনে আমার হৃদ-রাজ্যে অঙ্কুরিত কল্পনার গাছটা দিনদিন ডালপালা বিস্তার করে বেশ শক্তপোক্ত গাছে পরিণত হলো। কল্পনার ডানায় ভর করে দেখতাম, পানজাবি গায়ে চড়িয়ে টুপি মাথায় আমিও হাঁটছি সেই নুরানি কাফেলায়। ছোট-ছোট পা ফেলে প্রতি ওয়াক্ত নামাজে যাচ্ছি মসজিদের আঙিনায়। দিন যত গড়িয়েছে কল্পনার এসব দৃশ্য আমার ভেতরে মাদরাসায় ভর্তি হবার স্পৃহাকে ততণ শানিত করেছে । ক্লাস ওয়ান শেষ করে যখন টু-তে উঠি, তখন আমার রোল এক। ক্লাসের ক্যাপ্টেন আমি। পড়াশোনায় বেশ ভালো। শিক্ষকরা বেজায় খুশি আমার ওপর। দেখতে দেখতে স্কুলের আঙ্গিনায় আরও একটা বছর পার করে ফেললাম।

বার্ষিক পরীক্ষায় যথারীতি প্রথম হয়ে ক্লাস টু থেকে থ্রিতে উঠলাম। মনের ভেতর কেবলই আকুপাকুভাব অনুভব করি। স্কুলের এই চত্বর আমাকে আর টানছিলো না। হৃদয়ের ক্যানভাসে আঁকা স্বপ্নটা সত্যি হবে কবে, সে প্রতীক্ষায় প্রহর গুনি। একদিন আম্মুকে মুখ ফুটে বলে ফেলি ঢাকা যাবার কথা। আমি মাদরাসায় ভর্তি হবো। স্কুলের এই পড়া আর আমাকে টানছে না। আমি হাফেজ হবো। কুরআনের আলো বুকে ধারণ করবো। আমি আলেম হবো। ইলমের অন্বেষণে নিজেকে ব্যাপ্ত করবো। আম্মুও জানতেন আব্বুর আগ্রহের কথা। আব্বু যে খেতে খেতে মাদরাসার সেই জান্নাতি পাখিদের গল্প শোনাতেন এবং তাদের ভেতর নিজের ছেলেকেও কল্পনায় খুঁজে পেতে চেষ্টা করতেন, এটা আম্মুর অজানা ছিলো না। তিনি অমত করেননি। আমার ফুফাতো ভাইয়ের পরিবার যেদিন ঢাকা আসে ওদের সাথে, ছোট্ট আমিও পাড়ি জমাই ইটপাথরের এই শহরে। নিয়নবাতির তলে নিজেকে আবিষ্কার করি এক নতুন রূপে।

ওদিকে স্কুলের শিক্ষকরা বারবার তাড়া দিচ্ছিলেন আম্মুকে, তিনি যাতে আমাকে ফিরিয়ে আনেন। শুনেছিলাম, ক্লাস শুরু হবার আগে আমার জন্য আলাদা একসেট বই-ও রেখে দিয়েছিলেন প্রিয় শিক্ষকেরাও। আমার ফিরে আসার ক্ষীণ আশা তখনও হয়তো জাগরূক ছিলো তাদের মনে। কিন্তু আমি তো আসলে তখন সেই ধূপছায়াকাল ফেলে আরেক নতুন সকালের কাছে হাঁটু গেড়ে বসেছি…

পরদিন আব্বুর হাত ধরে ছোট ছোট পা ফেলে আমি টিকাটুলির মসজিদে গেলাম। এত দিন কল্পনায় যে দৃশ্য সতত ভেসে বেড়াতো, এবার তা বাস্তব হয়ে দেখা দিলো সামনে। নানান রঙের জামাপরা আমার বয়সী কত কত ছেলে সারি বেঁধে মসজিদে প্রবেশ করছে। সবার মুখে মিটিমিটি হাসির ছোঁয়া; এ ওর সাথে গল্প করছে, কেউবা আবার খুনসুটি করছে; কয়েকজন চুপচাপ গম্ভীর। আমি বিমুগ্ধ নয়নে তাদের দেখে গেলাম। মনে হচ্ছিলো, আমি ঠিকঠিক জায়গাতেই এসেছি। স্কুলের বারান্দার চেয়ে মসজিদের এই চত্বরটাই আমার জন্য বেশি আনন্দের, ঢের সুখের।

আব্বু জানালেন, আজই আমাকে নিয়ে যাবেন ভর্তি করতে। আমি বেশ পুলক অনুভব করছিলাম। একটু একটু রোমাঞ্চিতও হচ্ছিলাম—নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ, অচেনা মানুষজন, কেমন যে হবে, কে জানে! অপেক্ষায় থাকলাম। বারবার নিজেকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম, কখন আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ?…

(চলবে…)

লেখক : আলেম ও অনুবাদক

আগের কিস্তি 

প্রথম কিস্তি, জীবন গড়ার দহলিজে 

আগের সংবাদঅর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র : ইরান
পরবর্তি সংবাদএরশাদের বিশেষ সহকারী হলেন রুহুল আমিন হাওলাদার