
আশরাফ উদ্দীন খান
সম্প্রতি কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরাতুল হাদিসের সনদের স্বীকৃতি প্রদান করে একটি বিল পাশ করা হয়। স্বীকৃতি অর্জনের পরে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে এবং অব্যাহত থাকবে। একটি শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয় জড়িত থাকে। শিক্ষার্থীদের ইমান-আকিদা, মন-মনন গঠন করার পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন যোগ্যতা শাণিত করার বিষয় এখানে জড়িত থাকে। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাঝে ‘সাংস্কৃতিক ও অ্যাকাডেমিক সম্পর্ক’ সৃষ্টি হয়ে থাকে, নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক গভীর হয়ে থাকে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের আদান-প্রদান হয়ে থাকে। যার মাধ্যমে ব্যক্তি ও জাতীয় পর্যায়ে উন্নতি সাধিত হয়।
বর্তমান যুগ বিশ্বায়নের যুগ। বিশ্বায়নের এই যুগে নিজেকে শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখার সুযোগ নেই। তথ্য-প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থা অবাধ ও সহজ হওয়ার কারণে, মানুষ এখন লেখাপড়া, কর্ম-জীবিকা, ব্যবসা, চিকিৎসা, বিনোদনসহ আরো বিভিন্ন কারণে বিশ্বের একস্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরে বেরাচ্ছে। যার ফলে অতীতে যেখানে স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-আচরণের প্রাধান্য ছিল, এখন সেখানে স্থানীয় উপাদানের বদলে বৈশ্বিক বা আন্তর্জাতিক উপাদানের উপস্থিতি অনুভব করা যাচ্ছে। বিদেশে যাতায়াতের জন্যে জরুরী পাসপোর্ট তৈরিতে আন্তর্জাতিকভাবে অভিন্ন আইন ও নীতিমালার অনুসরণ করা হচ্ছে, সেই সাথে চিকিৎসা পদ্ধতি, ঔষধ উৎপাদন, খাদ্য, বস্ত্র উৎপাদনসহ সকল কাজে আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণ করা বর্তমান সময়ের জন্যে অনেকটাই জরুরী হয়ে পরেছে। যার বিঘ্ন ঘটলে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা ও বিড়ম্বনার সম্মুখীন হওয়া অতি স্বাভাবিক। মানুষ আজকে এক দেশের শিক্ষা অর্জন করে আরেক দেশে কর্ম করছে, এই অবস্থায় যদি শিক্ষা ব্যবস্থা ও সনদের মধ্যে ভিন্নতা থাকে তাহলে এই দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা বিষয়ক আদান-প্রদান সহজে হতে পারে না। তাই দেখা যায় যে, শিক্ষার বেলাতেও বিশ্বব্যাপী এক অভিন্ন নিয়ম ও নীতিমালা অনুসরণ করা হয়ে থাকে; অর্থাৎ শিক্ষাকাল, শিক্ষাপদ্ধতি, পাঠ্যবিষয়, গবেষণাপদ্ধতি ইত্যাদির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী এক অভিন্ন নিয়ম চালু রয়েছে। তাই বিশ্বায়নের এই পরিবেশে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে সেই সকল নিয়ম নীতির বাইরে চলার সুযোগ নেই।
মুয়াদালার ধারণা
‘মুয়াদালা’ একটি আরবি পরিভাষা, যার সাধারণ অর্থ সমতাবিধান করা। পারিভাষিকভাবে এই শব্দের উদ্দিষ্ট অর্থ হলো, সনদের সমতাবিধান। কোন শিক্ষার্থী যখন বাইরের কোন দেশ থেকে শিক্ষা অর্জন করে দেশে ফিরে আসেন তখন তিনি একটি সনদ অর্জন করে থাকেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী সেই সনদ দ্বারা দেশে কোন কাজ করতে বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করার উদ্দেশ্যে তাকে নির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেই সনদকে মূল্যায়ন করিয়ে নিতে হয়। অর্থাৎ এই স্বীকৃতি প্রদান করা হয় যে, অর্জিত সনদের মান নির্দিষ্ট সনদের সমান, কাজেই নির্দিষ্ট সনদের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী যা অর্জন করতে পারে, অর্জিত সনদ দ্বারাও তা অর্জন করা যেতে পারে। মুয়াদালা প্রদান করার সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই দিকে দৃষ্টিপাত করে থাকে যে, সনদ অর্জন করার জন্যে শিক্ষার্থীকে কি কি বিষয় অধ্যায়ন করতে হয়েছে এবং কি পরিমাণ সময় সেখানে ব্যয় করতে হয়েছে।
মুয়াদালা দুই ভাবে হতে পারেঃ এক. ব্যক্তিগতভাবে, দুই. প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। ব্যক্তিগতভাবে সম্পাদিত মুয়াদালা হচ্ছে কোন এক ব্যক্তির নিজের অর্জিত শিক্ষাসনদ নিয়ে কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে সেটাকে মুয়াদালা করিয়ে নেওয়া। এর মাধ্যমে তিনি সেই প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়তি উপকার গ্রহণ করতে পারেন বা উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করতে পারেন। আর প্রাতিষ্ঠানিক মুয়াদালা হচ্ছে ব্যক্তির স্থানে প্রতিষ্ঠান তার নিজের সনদকে মুয়াদালা করিয়ে থাকে, যার ফলে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে যারাই সেই সনদ অর্জন করবে তাদের সকলেই সেই মুয়াদালা থেকে উপকৃত হতে পারবে।
আমাদের দেশের মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একটি স্বপ্ন থাকে দারুল উলুম দেওবন্দের ইলমি পরিবেশ থেকে ইলম অর্জন করা, সেখানকার সুদক্ষ শিক্ষকমণ্ডলীর কাছ থেকে উপকৃত হওয়া। যেহেতু আমাদের দেশের কওমি মাদ্রাসাসমূহ দারুল উলুমের মানহাজের অনুসরণ করে থাকে, এবং শিক্ষাকাল ও মান মূল্যায়নের পদ্ধতি প্রায় অভিন্ন, তাই অতি সহজেই সনদ পেশ করার মাধ্যমে ও ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে সেখানে শিক্ষা অর্জনের সুযোগ লাভ করে থাকে। এখানেও যদি মানহাজ ও পদ্ধতির তারতম্য হয়ে থাকত তাহলে সনদের মুয়াদালা বা স্বীকৃতি প্রদানের পরেই একজন ছাত্র সেখানে ভর্তি হতে পারত।
মুয়াদালা-কর্তৃপক্ষ
বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুয়াদালা সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ থাকে, যাদের কাছে মুয়াদালার আবেদন পেশ করতে হয় এবং বিভিন্ন বিষয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন যে, মুয়াদালা প্রদান করা যায় কিনা। আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন’ (ইউজিসি) দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, যা মূলত সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে থাকে। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সমন্বয়, নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা ও বিকাশ ঘটানো। মুয়াদালা বা সমতায়ন বিষয়ক আবেদন ইউজিসির নিকট পেশ করা হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসাবে সমতা প্রদান বিষয়ক একটি চিঠির দিকে খেয়াল করা যাক। চিঠির বিষয়বস্তু ছিল: ‘আইন বিষয়ক বিদেশী ডিগ্রীর সমতায়ন প্রসঙ্গে’:
‘জনাব,
উপর্যুক্ত বিষয়ে আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ পূর্বক জানানো যাচ্ছে যে, গত (…… ২০১৭) তারিখ কমিশনের বিদেশি ডিগ্রি সমতা বিধান কমিটির (…… তম সভার) সিদ্ধান্ত মোতাবেক কমিশন কর্তৃক ৩ বছরের আইন বিষয়ক বিদেশি ডিগ্রির সমতায়ন করার কোন সুযোগ নেই, কারণ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ৩ বছরের কোন আইন বিষয়ক কোন ডিগ্রি নেই। ……… কিন্তু একাডেমিক উদ্দেশ্যে ৪ বছরের আইন বিষয়ক অর্জিত বিদেশি ডিগ্রি কমিশনের সমতা বিধান কমিটি কর্তৃক সমতায়ন করা যেতে পারে বলে সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।…………………।’
এমনি ভাবে আরব দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘লাজনাতুল মুয়াদালা’ বা ‘মাকতাবুল মুয়াদালা’ নামক প্রতিষ্ঠান অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদের মুয়াদালার কাজ করে থাকে।
মুয়াদালার শর্তাবলী ও পদ্ধতি
মুয়াদালার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ের বিবেচনা করা হয়ে থাকে, তবে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে দেখা হয় তা হচ্ছেঃ ১.পাঠ্য বিষয়। ২. ক্রেডিট আওয়ার।
পাঠ্য বিষয় হচ্ছে, এই সনদ অর্জন করতে শিক্ষার্থী কী কী বা কোন কোন বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করেছে সেটা বিবেচনা করা। দেখা যায় যে, আমাদের দেশের কোন ছাত্র যদি চিকিৎসা বা প্রকৌশল বিষয়ে ভর্তি হতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর উত্তীর্ণ হতে হয়, তদ্রুপ কোন একটি প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোন স্তরে ভর্তি হওয়ার জন্যে সেই ব্যক্তিকে অবশ্যই সেই স্তরের উপযুক্ত হওয়ার জন্যে নির্ধারিত বিষয়ের পাঠ গ্রহণ করতে হয়। তাই এখানে পাঠ্য বিষয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, ক্রেডিট আওয়ার। এর সাধারণ অর্থ হচ্ছে নির্ধারিত ঘণ্টা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকাল সাধারণত সেমিস্টার হিসাবে ভাগ করা হয়ে থাকে। সাধারণত এক বছরে দুই সেমিস্টার। এক সেমিস্টার প্রায় চার মাস প্রলম্বিত হয়ে থাকে, এটাকে ১৫ সপ্তাহের সেমিস্টার হিসাবে ধরা হয়ে থাকে। ১৫ সপ্তাহের সেমিস্টারে কোন বিষয়ের ৫০-৬০ মিনিটের তাত্ত্বিক পাঠদানকে বুঝানো হয়ে থাকে। যদি কোন বিষয়ের ক্রেডিট আওয়ার হয়ে থাকে ১৫, তাহলে তার অর্থ হবে সেমিস্টারের প্রতি সাপ্তাহেই এক ঘণ্টার একটি তাত্ত্বিক ক্লাস থাকতে হবে। এখানে তাত্ত্বিক ক্লাস বলার উদ্দেশ্যে এই যে, সেই বিষয়ের ব্যবহারিক কোন ক্লাস থাকলে সেটা এই হিসাবের বাইরে আসবে এটা বোঝানো। সাধারণত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোন বিষয়ের জন্যে একটি নির্ধারিত পাঠকাল বা ক্রেডিট আওয়ার থাকে, যেমন কুরআনের তাফসির বিষয়ে কাউকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে একটা নির্ধারিত ক্রেডিট আওয়ার অবশ্যই দেখাতে হবে।
কোন সনদের মুয়াদালা করার সময় পাঠ্য বিষয় যেমন দেখা হয় তেমনি এই বিষয়ে সে কী পরিমাণ সময় অধ্যায়ন করেছে সেটাও দেখা হয়ে থাকে। যদি উভয়টিই তাদের প্রতিষ্ঠানের মানে উত্তীর্ণ হয়ে থাকে তাহলে সেই সনদকে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। আর যদি না হয়ে থাকে তাহলে সেখানে দুই অবস্থার একটি হতে পারে: এক. মুয়াদালা অর্জন করতে ব্যর্থ হবে। দুই. মুয়াদালা অর্জন করার জন্যে কিছু সম্পূরক বিষয় বা ঘণ্টা দেওয়া হবে, অর্থাৎ কিছু বিষয় পাঠ্য হিসাবে দেওয়া হবে এবং সেই শর্ত পূরণ করতে পারলে তারপরেই মুয়াদালা সাব্যস্ত হবে। যেমন এইভাবে মুয়াদালা দেওয়া হয় যে, অমুক সনদের মাধ্যমে স্নাতকের তৃতীয় বছরে ভর্তি হতে পারবে তবে যদি নির্ধারিত কিছু বিষয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে।
সনদের ধারাথিকতা
বিশ্বব্যাপী প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পূর্বে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সনদ অর্জন করতে হয়; এর পরে পর্যায়ক্রমে অনার্স, মাস্টার্স, ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করতে হয়। এখানে পাঠ্য বিষয়ের সাথে সাথে সনদের ধারাবাহিকতার বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে আমাদের কওমি মাদ্রাসার সনদের এই ধারাবাহিকতা নিয়ে চিন্তা করা একটি জরুরি বিষয়। এই ব্যাপারে আলিয়া মাদ্রাসায় অতীতে কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। ‘বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা ও সমাজ জীবনে তার প্রভাব’ গ্রন্থের লেখক লেখেন, ‘ইতিপূর্বে পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন কড়াকড়ি বা ধারাবাহিকতা ছিল না, ফলে অনেকেই আলিয়া নেসাবের শ্রেণীসমূহের ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে সরাসরি আলিম, ফাজিল বা কামিল পরীক্ষায় অংশ নিত। অতঃপর বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা ও মাদ্রাসার শিক্ষিতদের সনদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নিয়ে কয়েক বছর আলাপ-আলোচনার পরে ৬/৬/১৯৮৮ তারিখে বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ৭১তম সভায় একটি বিশেষ ‘মানবিক সিদ্ধান্ত’ গৃহীত হয়। ফলে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত আলিম পরীক্ষা ব্যতীত ফাজিল ও ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দাখিল পরীক্ষা ছাড়া আলিম পরীক্ষার সনদ বৈধ বলে বিবেচিত হবে। (বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা ও সমাজ জীবনে তার প্রভাব: ড. মুহাম্মাদ আব্দুস সাত্তার, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা ও সেই সাথে আন্তর্জাতিক ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহেও একটি নির্ধারিত ধারাবাহিকতার অনুসরণ করা হয়ে থাকে। সেই হিসাবে দেখা যায় যে, সেখানে মাস্টার্স স্তরের আগে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরের পরীক্ষা ও সনদের ব্যবস্থা রয়েছে, যা ছাড়া মাস্টার্সের সনদ পরিপূর্ণ হতে পারে না। উপরের উদাহরণের মাধ্যমে এটা দেখানো হয়েছে যে, সরকারি মাদ্রাসাসমূহে এক পর্যায়ে এই বিষয়ে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল, সনদের ধারাবাহিকতা অনুসরণ না করার কারণে। এবং ‘মানসিক সিদ্ধান্ত’ গ্রহণ করে সেই সমস্যার সমাধান পেশ করা হয়েছিল।
বহির্বিশ্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্য বিষয়ের সাথে একটি তুলনা
আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে মুয়াদালা করার জন্যে একটি জরুরি শর্ত বা লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, পাঠ্য তালিকার সাথে মিল থাকা। যাদের সাথে মুয়াদালা করা হচ্ছে সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্য বিষয়ের সাথে মুয়াদালা করতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের পাঠ্য বিষয়ের সাথে মিল থাকা জরুরী। ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, যদি এই ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তারতম্য থাকে তাহলে সেখানে মুয়াদালা সম্পন্ন হওয়া জটিল হয়ে যায়। অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্য বিষয়ের ধরণ ও বিন্যাস কেমন হয়ে থাকে সেই বিষয়ে একটু সাধারণ ধারণা লাভের উদ্দেশ্যে সামনে আমরা আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শারিয়াহ ইসলামিয়াহ’ ও ‘উসুলুদ দ্বীন’ (ধর্মতত্ত্ব) অনুষদের পাঠ্য বিষয়ের সাথে তুলনা করে দেখি যে, এই দুই পাঠ্য বিষয়ের সাথে আমাদের পাঠ্য বিষয়ের কী পরিমাণ মিল বা পার্থক্য বিদ্যমান আছে। এর মাধ্যমে মুয়াদালার ব্যাপারে কিছুটা ধারণা লাভ করতে পারি।
অনার্স বা স্নাতক স্তরে ‘শারিয়াহ ইসলামিইয়াহ’ ও ‘উসুলুদ দ্বীন’ এর শিক্ষাকাল হচ্ছে চার বছর মেয়াদী। ‘শারিয়াহ ইসলামিয়া’র চার বছরের পাঠ্য বিষয় (মোটামুটি) নিম্নরুপ:
১. কুরআন (হিফজ)
২. ফিকাহ
৩. উসুলে ফিকাহ (হানাফি ও গাইর হানাফি)
৪. উসুলে ফিকাহ বিষয়ে গবেষণা
৫. ফিকাহ বিষয়ে গবেষণা
৬. আয়াতুল আহকাম
৭. হাদীস আহকাম
৮. তারিখে তাশরিহ
৯. উলুমে হাদীস
১০. নাহু-সরফ
১১. ইংরাজি
১২. তাওহীদ
১৩. তুলনামূলক ফিকাহ
১৪. তুলনামূলক ফিকাহ বিষয়ে গবেষণা
১৫. ইসলামি পারিবারিক আইন
১৬. আধুনিক ফিকাহ বিষয়
১৭. আধুনিক ফিকাহ বিষয়ে গবেষণা
১৮. মানাহিজু–দাওয়াহ
১৯. কাওয়াইদুল ফিকাহ
২০. কাওয়াইদুল ফিকাহ বিষয়ে গবেষণা
২১. বালাগাত
‘উসুলুদ দ্বীন’ অনুষদের প্রথম দুই বছর সাধারণ, আর পরের দুই বছর অর্থাৎ তৃতীয় ও চতুর্থ বছর হচ্ছে তাখাসসুস বা বিষয়ভিত্তিক। তৃতীয় বছর থেকে তাখাসসুস ভাগ হয়ে যায়, তখন সেখানে চারটি বিভাগের যে কোন একটি বিভাগে অধ্যায়ন করা যায়। সেই চারটি বিভাগ হচ্ছে:
১. তাফসির ও উলুমে কুরআন
২. হাদিস ও উলুমে হাদিস
৩. আকিদা ও দর্শন
৪. দাওয়াহ ও ইসলামি সংস্কৃতি
প্রথম দুই বছরের পাঠ্য বিষয় (মোটামুটি) নিম্নরুপ:
১. তাওহীদ
২. তাফসির
৩. কাসাসুল কুরআন
৪. হাদিস
৫. উলুমে হাদিস
৬. উসুলে দাওয়াহ
৭. তাসাওয়ুফ
৮. মিলাল নিহাল
৯. ইংরাজি
১০. শুবুহাত হাওলাল কুরআন
১১. আরবি আদাব
১২. বালাগাত
১৩. তাইয়ারাত ফিকরিইয়াহ
১৪. নুযুম
১৫. আখলাক
তাফসির বিভাগের ৩য় ও ৪র্থ বর্ষের পাঠ্য তালিকা হলো:
১. তাফসির তাহলিলি
২. তাফসির মাউদুয়ি
৩. মানাহিজ মুফাসসিরিন
৪. হাদিস
৫. খিতাবাহ
৬. তাসাওয়ুফ
৭. তাজবিদ
৮. উলুমে কুরআন
৯. তাবশির ও ইসতিশরাক
১০. তাখরিজ
১১. উসুলে ফিকাহ
১২. ই’যাজুল কুরআন
১৩. মিলাল নিহাল
১৪. উলুম কুরআন
হাদীস বিভাগের ৩য় ও ৪র্থ বর্ষের পাঠ্য তালিকা এই:
১. মুসতালাহুল হাদীস
২. হাদিস মাওদুয়ি
৩. হাদিস তাহলিলি
৪. মানাহিজুল মুহাদ্দিসিন
৫. তাফসির মাওদুয়ি
৬. তাসাওয়ুফ
৭. ওসায়িল তাবলীগ
৮. শুবুহাত
৯. কাযায়াহ ফিকহিয়াহ
১০. দাখিল
১১. উসুলে ফিকাহ
১২. মিলাল নিহাল
১৩. তাখরিজ
১৪. তাবশির ইসতিশরাক
১৫. সিরাহ
১৬. শুবাহুল হাদিস
আকিদা ও দর্শন বিভাগের ৩য় ও ৪র্থ বর্ষের পাঠ্য তালিকা:
১. তাওহীদ
২. ইসলামি দর্শন
৩. ফিরাক ইসলামিয়াহ
৪. মানহিজুল মুফাসসিরিন
৫. মানাহিজুল মুহাদ্দিসিন
৬. গ্রীক দর্শন
৭. তাইয়ারাত ফিকরিয়াহ
৮. মনোবিজ্ঞান
৯. কাযায়াহ ফিকহিয়াহ
১০. পাশ্চাত্য দর্শন
১১. নুসুস
১২. তাবশির ইসতিশরাক
১৩. তাফসির মাওদুয়ি
১৪. তাখরিজ
১৫. তাসাওয়ুফ
দাওয়াহ বিভাগের ৩য় ও ৪র্ত বর্ষের পাঠ্য তালিকা:
১. তাইয়ারাত ফিকরিয়াহ
২. তাফসির মাওদুয়ি
৩. মানাহিজ মুহাদ্দিসিন
৪. মানাহিজ মুফাসসিরিন
৫. মানাহিজ দাওয়াহ
৬. তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব
৭. খিতাবাহ
৮. ওসায়িল তাবলীগ
৯. তারিখে দাওয়াহ
১০. ইসলামী দর্শন
১১. আধুনিক যুগের দাওয়াহ
১২. তাবশির ইসতিশরাক
১৩. তাখরিজ
১৪. খিতাবাহ
১৫. উসুলে ফিকাহ
১৬. তাসাওয়ুফ
উপসংহার
উল্লেখিত ‘শারিয়াহ ইসলামিয়াহ’ অনুষদের পাঠ্য বিষয়ের দিকে যদি খেয়াল করা হয় তাহলে দেখা যাবে, সেখানে এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচীতে হুবহু সেই নামে বিদ্যমান না থাকলেও, মূল বিষয়গুলো আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পাঠদান করা হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসাবে ইসলামি পারিবারিক আইন বিষয়টির কথা ধরা যাক, যদিও এই বিষয়টি এই নামে আমাদের পাঠ্য বিষয়ে নেই, কিন্তু মূল বিষয়টি ‘ফিকহুল মুয়াশারাহ’ শিরোনামে ফিকাহর কিতাবে পড়ানো হয়ে থাকে; তেমনিভাবে ফিকাহ ও উসুলে ফিকাহর মূল বিষয় বিদ্যমান থাকলেও সেটাকে মাজহাবভিত্তিক ফিকাহ ও তুলনামূলক ফিকাহ, বা ‘উসুলে ফিকাহ’ (হানাফি ও গাইরে হানাফি) এই শিরোনামে পড়ানো হচ্ছে না। তবে এর বাইরে আরো কিছু বিষয় এখানে আছে যা আমাদের সিলেবাসে পাঠ্য বিষয় হিসাবে পড়ানো হয় না, অথচ বিষয়গুলো ফিকাহ শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জনের জন্যে অনেক জরুরি।
উল্লেখিত পাঠ্যসূচীতে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। সেখানে মূল বিষয়ের বাইরে, সাধারণ বিষয় হিসাবে কিছু সাবজেক্ট দেখা যায়, যেমন: শরিয়াহ বা উসুলুদ দ্বীন অনুষদে নাহু-সরফ, তাওহীদ, ইংরাজি ও বালাগত ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। কারণ শরিয়াতের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এই সকল বিষয় সরাসরি সম্পর্ক রাখে না। কিন্তু ইসলামি ও আরবি বিষয় হওয়ার কারণে এ সকল বিষয়ের জরুরত অনুভব করা হয়। এর বাইরে আর যে সকল বিষয় আছে—ফিকাহ, উসুলে ফিকাহ, তারিখে তাশরিহ, আয়াতে আহকাম, হাদিসে আহকাম, তুলনামূলক ফিকাহ, কাওয়াইদুল ফিকাহ, আধুনিক বিষয়ে ফিকহি আলোচনা—এই সকল বিষয়ে শরিয়তের বিধিবিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জন করা একজন তালেবে ইলমের জন্যে অবশ্যই জরুরি বিষয়।
উসুলুদ দ্বীনের পাঠ্য বিষয়ের ব্যাপারেও একই কথা বলা যেতে পারে। এই পাঠ্য বিষয়ে একাধিক বিষয় বিদ্যমান যা আমাদের পাঠ্যসূচীতে রাখা হয়নি। অথচ কুরআন, হাদিস, আকিদা, দাওয়াহর ক্ষেত্রে এই সকল বিষয়ের জরুরত অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। উসুলুদ দ্বীনের পাঠ্য বিষয়ের মধ্যে উসুলে দাওয়াহ, শুবুহাত হাওলাল কুরআন, তাইয়ারাত ফিকরিয়াহ, নুযুম, তাফসিরে তাহলিলি, তাফসিরে মাওদুয়ি, হাদিসে তাহলিলি, হাদিসে মাওদুয়ি, মানাহিজুল মুফাসসিরিন, মানাহিজুল মুহাদ্দিসিন, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, দাওয়াতের ইতিহাস, ইসতিশরাক বা প্রাচ্যবাদ, ই’যাজুল কুরআন, দাখিল (তাফসীরের কিতাবে যে সকল অনির্ভরযোগ্য বিষয় অনুপ্রবেশ করেছে), মানাহিজ দাওয়াহ ইত্যাদি বিষয়গুলো আমাদের মাদ্রাসাসমূহের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
হাইয়াতুল উলইয়ার শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বীদের পক্ষ থেকে বহির্বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে মুয়াদালা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে, বা এই বিষয়ে চিন্তা ফিকির করা হচ্ছে মর্মে খবর পাওয়া যাচ্ছে, এটা অবশ্যই সব তালেবুল ইলমের জন্যে খুশির খবর। মুয়াদালার জন্যে প্রতিষ্ঠানের ভিন্নতার কারণে আরোপিত শর্তাবলীর মধ্যেও ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক, যেটা মুয়াদালা সম্পন্ন করার সময় অবশ্যই পূরণ করতে হবে। এখানে মুয়াদালার ফিকিরের সাথে সাথে আরেকটি বিষয়ের দিকে মনোযোগ আকৃষ্ট করতে চাই, আর সেটা হলো, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উলুমে ইসলামিয়ার ক্ষেত্রে কী ধরণের মানহাজ অনুসরণ করা হচ্ছে, বা তাদের শিক্ষাকালের বিন্যাস ও ধারাবাহিকতা কী ধরণের, এই সকল বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে এর মধ্যে থেকে যেটা আমাদের জন্যে উপকারী ও অনুসরণযোগ্য সেই সকল বিষয় আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করার ব্যাপারে ফিকির করা দরকার। প্রয়োজনে এই ব্যাপারে কমিটি বা ‘লাজনাহ’ গঠন করে আলোচনা ও পর্যালোচনা শুরু করা যেতে পারে।
এই অবস্থায় সহজেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, শুধুমাত্র মুয়াদালার উদ্দেশ্যেই নয়, বরং যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে উপযুক্ত আলেম ও দায়ী তৈরি করার জন্যে আমাদেরকে যুগের দাবী অনুযায়ী পাঠ্য বিষয় ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখে নতুনত্বকে যুগের দাবী ও চাহিদা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে, আবার অনেক বিষয় আছে যা তুরাসে বিদ্যমান থাকলেও বর্তমান যুগে নতুন নাম ও রুপে গ্রহণ করার জরুরত দেখা যাচ্ছে। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে আমাদের কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার ধারায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক
