
রাগিব রব্বানি
উলামায়ে কেরামের সঙ্গে তাবলিগ জামাতের বিতর্কিত আমির মাওলানা সা’দ কান্ধলভির অনুসারীদের চলমান সঙ্কট যেন ক্রমশ আরও জটিল আকার ধারণ করছে। গত ১ ডিসেম্বরের টঙ্গী-হামলার পর একদিকে সাদপন্থীদের মুরব্বি ওয়াসিফ গংদের কাকরাইল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় আনার কড়া দাবি জানিয়েছেন উলামায়ে কেরাম; অন্যদিকে সাদপন্থীরা বাংলাদেশের আলেমদের এই অবস্থানকে তাবলিগে অনধিকার চর্চা বলে দাবি করছেন। তাদের দাবি, আলেমরা ভিন্ন ময়দানের মানুষ, তাবলিগ নিয়ে তাঁরা নাক গলাবেন কেন?
কিন্তু আলেমরা বলছেন, আলেমগণ ধর্মীয় নেতা। ইসলামের ব্যাখ্যা মতে, ধর্মীয় সমস্যা-সঙ্কটে তাঁদের সিদ্ধান্ত মানা জরুরি। তাবলিগের প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস (রহ.) এর সিদ্ধান্তও তাই ছিলো। হযরত ইলিয়াস (রহ.) তো আলেমদের তাবলিগের যেকোন ক্ষেত্রে মুরব্বি মনে করতেন, এখন তাঁরা যেসব সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, সেগুলোকে আপনারা ‘হস্তক্ষেপ’ কেন মনে করছেন? আলেমদের সিদ্ধান্ত ও পরামর্শকে কি আপনারা তাবলিগের জন্য শিরোধার্য মনে করেন না?
ফাতেহ২৪-প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে সাদপন্থী তাবলিগিদের মুরব্বি জিয়া বিন কাসিম বলেন, ‘হ্যাঁ, উলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত সবক্ষেত্রেই শিরোধার্য। কিন্তু বাংলাদেশের উলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত বর্তমানে পক্ষপাতের দোষে দুষ্ট। আমরা এ জন্য দেওবন্দ, সাহারানপুর, নদওয়াতুল উলামা তথা ভারতের বড় বড় আলেমদের সিদ্ধান্ত মতে আছি। তাঁরা কেউ এ পর্যন্ত বলেননি যে, সাদ সাহেবের এতায়াত করা যাবে না। অথচ তাঁরা বাংলাদেশের আলেমদের উস্তাদ সমতুল্য।’
কিন্তু দেওবন্দ তো সা’দ সাহেবের ভ্রান্তিগুলো স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে, ভ্রান্তি স্পষ্ট করার পর সা’দ সাহেব যে রুজুনামা পাঠিয়েছেন, দেওবন্দের কাছে সেটাও মনঃপুত হয়নি। তারপরও কেন সাদ সাহেবের অনুসরণকে আপনারা এত জরুরি ভাবছেন? এই প্রশ্নের জবাবে জিয়া বিন কাসিম বলেন, ‘সাদ সাহেব রুজুনামা পাঠিয়েছেন কয়েকবার, সেটা দেওবন্দ গ্রহণ করেনি, তাতে তো তাঁর কিছু করার নেই। তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। চতুর্থ রুজুনামা আপনারা একটু খুলে দেখবেন, সেখানে সা’দ সাহেব অক্ষরে অক্ষরে দেওবন্দের প্রতিটা অভিযোগ থেকে রুজু করেছেন।’
আল্লামা আহমদ শফি, যাত্রাবাড়ির মাওলানা মাহমুদুল হাসানসহ বাংলাদেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরামকেও সাদপন্থীরা মানতে নারাজ। জিয়া বিন কাসিমের অভিযোগ, সর্বজনমান্য এসব আলেমকে কিছু সংখ্যক ‘স্বার্থান্বেষী’ আলেম—যাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ রয়েছে—দীর্ঘ একটা সময় ধরে নানাভাবে ভুল বুঝিয়ে তাবলিগ ও তাবলিগের বর্তমান আমির মাওলানা সা’দ কান্ধলভির বিরুদ্ধে নিয়ে গেছেন। তবে শীর্ষ এসব আলেমের প্রতি তাঁদের পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা আছে বলেও জানান তিনি।
কিন্তু তাবলিগের সকল সমস্যা যদি নিরসন করে দেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে আর যাতে এ রকম সমস্যার সৃষ্টি না হতে পারে সেজন্য যদি এই শীর্ষ আলেমদেরর সমন্বয়ে একটি অভিভাবক পরিষদ বানিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটা সাদপন্থীরা মানবেন কী? এ প্রশ্নের জবাবে জিয়া বিন কাসেম বেশ শক্তভাবেই না-সূচক উত্তর দেন। তিনি মনে করেন, তাবলিগের কর্মপদ্ধতি স্বতন্ত্র। বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমরা এ কাজের সবকিছু বোঝেন না।তাবলিগকে তাবলিগের মতো করে চলতে দিতে হবে। তাবলিগে সময় না লাগিয়ে কোনো আলেম এখানে কর্তৃত্ব করলে অনেক জিনিস উসুলের বিপরীত হয়ে যায়। তাঁদের দাবি হলো, আলেমরা মসজিদ-মাদরাসার খেদমত করবেন, তাবলিগ চলবে তাবলিগের উসুলে। এখানে এসে তাঁরা কেন বিশৃঙ্খলা তৈরী করবেন?
অথচ শুরু থেকেই এ দেশের উলামায়ে কেরাম তাবলিগকে হক কাজ ও নিজেদের কাজ বলে মনে করেছেন। তাবলিগের ওপর আরোপিত বিভিন্ন অভিযোগ খণ্ডন করেছেন লেখালেখি ও ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে। তাবলিগের প্রচার-প্রসারে সর্বাত্মক চেষ্টা ও ভূমিকা রেখেছেন ঐক্যবদ্ধভাবে। কিন্তু আজ সেই আলেমদেরকেই বহিরাগত হস্তক্ষেপকারী হিসেবে অভিহিত করছেন সাদপন্থীরা।
সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় সাদপন্থীদের মুরব্বিরা তাবলিগ-সঙ্কটে আলেমদের এ ভূমিকার কারণে তাঁদেরকে ‘পাকিস্তানপন্থী’ বলেও কটাক্ষ করছেন। ‘পাকিস্তানপন্থী’ বলে আসলে তাঁরা কী বোঝাতে চান, উলামায়ে কেরামকে কি তাঁরা রাজাকার বা স্বাধীনতার বিপক্ষশক্তি মনে করেন? তাছাড়া তাবলিগের চলমান সঙ্কটের সঙ্গে স্বাধীনতা-বিরোধ বা রাজাকার ইস্যুর প্রাসঙ্গিকতা কী? জানতে চাইলে জিয়া বিন কাসিম বলেন, ‘পাকিস্তানপন্থী বলতে আসলে রাজাকার বা স্বাধীনতা-বিরোধের প্রসঙ্গ উদ্দেশ্য নিই না আমরা। বরং তাবলিগে দুইটা পার্ট আছে, একটা দিল্লির নেজামুদ্দিন ভিত্তিক, আরেকটা পাকিস্তান ভিত্তিক। তো পাকিস্তানপন্থী দ্বারা আমরা মূলত সেটাই বুঝিয়ে থাকি।’
কিন্তু অনেকে তো সরাসরি বলেই ফেলেন, স্বাধীনতা-বিরোধী চক্র তাবলিগ নিয়ে সঙ্কট তৈরি করছে। তারা এমন কেন বলেন? এ অভিযোগের উত্তরে জিয়া বিন কাসেম বলেন, ‘আমি পাকিস্তানপন্থী বলতে যা বলেছি সেটাই আমরা উদ্দেশ্য নিই এবং বুঝি। অন্যরা কী বলল, কেন বলল, তা তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন।’
উলামায়ে কেরামের সংস্পর্শে না এসে দীর্ঘদিন কেবল তাবলিগে সময় লাগিয়ে ধর্মীয় ব্যাপারে আলোচনা করার মত গুরুদায়িত্ব নেওয়া কতটুকু যৌক্তিক? জানতে চাইলে জিয়া বিন কাসিম বলেন, ‘তাবলিগের ছয় সিফাতের ওপর যদি আলোচনা করে তবে তো এতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ, তাবলিগ করে করে এ ছয় সিফাতের আলোচনা সে ভালোভাবে শিখে নিয়েছে।’ এ সমস্ত লোকের জন্য সাল বা চিল্লার সাথী তাবলিগি আলেম ব্যতীত অন্য কোনো আলেমের সাহচর্য লাভ করা জরুরি নয় বলেও মনে করেন তিনি।
চলমান তাবলিগ-সঙ্কটে মূল সমস্যাটা আসলে কী বলে মনে করেন সাদপন্থীরা? জানতে চাইলে সাদপন্থীদের মুরব্বি জিয়া বিন কাসিম ফাতেহ২৪-কে জানান, ‘আমরা মনে করি সঙ্কটটা তৈরি হয়েছে অনৈক্য এবং তাবলিগের মূল মারকাজ নেজামুদ্দিনের অানুগত্য করা-না করা নিয়ে। হিংসা-বিদ্বেষ ও ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তার কারণে একপক্ষ নেজামুদ্দিনের আনুগত্য করতে পারছেন না। আমরা যদি এ হিংসা-বিদ্বেষ ছাড়তে পারি, তবে এই সঙ্কট থেকে তাবলিগের উত্তরণ সম্ভব।’
কিন্তু ১ ডিসেম্বর টঙ্গী ইজতেমার ময়দানে লাঠিসোটা নিয়ে নিরীহ মাদরাসা-ছাত্রদের ওপর সাদপন্থীদের যে হামলা, তা কি হিংসা-বিদ্বেষ কমাতে পারবে? এ প্রশ্নের জবাবে জিয়া বিন কাসেম ১ ডিসেম্বরের হামলার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, ব্যাপারটা নিতান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। এছাড়াও, তিনি টঙ্গী ময়দানে সেদিন সাদপন্থী তাবলিগিদের লাঠি নিয়ে আসার ব্যাপারটাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন এবং বলেন, ময়দানের ভেতরেই ছাত্ররা আগ থেকে লাঠি রেখেছিল সাদপন্থীদের মোকাবেলার জন্য। সাদপন্থী অনেকের সেদিন হেলমেট পরে আসার ব্যাপারটাকেও তিনি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেন। অথচ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত বিভিন্ন ভিডিওক্লিপ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনামতে সেদিন সাদপন্থীরা লাঠিসোটা নিয়েই ময়দানে এসেছিল। তাঁদের বড় একটি অংশের মাথায় আঘাত ঠেকানোর জন্য ছিল হেলমেটও। কিন্তু সাদপন্থীদের মুখপাত্র জিয়া বিন কাসিম এ প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে এর পুরো ব্যাপারটিকেই অস্বীকার করেন।
