সরকারি স্বীকৃতি নিয়ে কী ভাবছেন কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা?

ওমর ফারুক:

ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে কওমি মাদরাসার সরকারি সনদের কার্যক্রম। আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমীয়ার অধীনে সনদ বাস্তবায়ন কমিটি দ্রুতই কওমি স্বীকৃতি বাস্তবায়ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রণালয় দাওরা হাদীসকে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্সের সমমান দেওয়ার প্রস্তাবিত খসড়াও চূড়ান্ত করেছে। আর কয়েকটি ধাপ পেরোলেই জাতীয় সংসদে বিলটি পাস করার জন্য উথ্যাপিত হবে। ফলে এ সরকারের আমলেই কওমি স্বীকৃতির বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এ নিয়ে কী ভাবছেন কওমি শিক্ষার্থীরা? জানতে যোগাযোগ করা হয় ঢাকা বিভাগের বড় বড় কয়েকটি মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে।

তাদের অধিকাংশই কওমি স্বীকৃতি দ্রুত বাস্তবায়ন হোক বলে দাবি জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে সরকার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন বলেও তারা আশা প্রকাশ করেছেন। রাজনীতির মারপ্যাঁচ আর অনৈক্যের পরিণতিতে যেন কওমি শিক্ষার্থীরা স্বীকৃতি থেকে বঞ্ছিত না হন, তারা এই আহ্বান জানান।

তাদেরই একজন ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ মাদরাসা থেকে সদ্য ফারেগ শিক্ষার্থী মাওলানা নাজমুল ইসলাম কাসিমী। বর্তমানে তিনি রাজধানীর মারকাযুত তাকওয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারে শিক্ষকতার দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি ফাতেহ২৪ কে বলেন, ‘কওমি সনদ’ শব্দটা ভোটের রাজনীতির প্যাঁচে পড়ে হয়তো বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সরকার বছর খানিক হয়ে গেল এ স্বীকৃতির ঘোষণা দিয়েছে। দুঃখজনক! সরকার নির্দেশিত একই বোর্ডের অধীনে এ পর্যন্ত দাওরা হাদীসের দু’টো পরীক্ষা শেষ হলেও স্বীকৃতি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। জানি না, কতোদিন পেরোলে তা বাস্তবায়ন হয়ে পরম ডানা মেলে, অপেক্ষিত হাজারো কওমি পড়ুয়ার চোখেমুখে সুখের হাসি ফুটাবে। তবুও আমরা হতাশ হলেও নিরাশ না। অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো উদাসীন না। ক্ষমতাসীন সরকারের কাছে চাওয়া থাকবে, অন্তত কওম ও কওমির এ অধিকার নিয়ে আর রাজনীতির টোপখেলা না হয়। আমরা প্রতীক্ষায় বসে আছি। শিক্ষার স্বীকৃতির জন্য, চাকরির জন্য নয়।

শাইখুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত জামিয়ার রাহমানিয়া আরাবিয়ার সাবেক শিক্ষার্থী মাওলানা জাহিদুজ্জামান ফাতেহ২৪ কে বলেন, কওমি সনদের স্বীকৃতি হাজারো ছাত্র জনতার প্রাণের দাবি এবং যে প্রক্রিয়ায় তা চাওয়া হয়েছিল বড়দের মাধ্যমে তার প্রাথমিক ঘোষণা সরকার থেকে আমরা আদায় করতে পেরেছি। সম্মিলিত বোর্ডে হাইয়াতুল উলয়ার মাধ্যমে ইতোমধ্যেই দাওরায়ে হাদীসের দুটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু স্বীকৃতির ঘোষণা বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এতে নানারকম সন্দেহ, অবিশ্বাস ও সরকারের প্রতি অনাস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। দায়িত্বশীল মহলের উচিৎ বিষয়টা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে চাপ সৃষ্টি করা। এমনিভাবে ঘোষণা বাস্তবায়নে যে ধোয়াশা সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করে অগ্রগতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রকাশ করা। অন্যথায় শিক্ষাক্ষেত্রে যে ঐক্যবদ্ধতা তৈরি হয়েছে তা টিকিয়ে রাখা জটিল হবে বলে মনে হচ্ছে।

জামিয়া ইসলামিয়া রসুলপুর মাদরাসার সদ্য নিয়োজিত শিক্ষক ও ফাযেলে দারুল উলুম দেওবন্দ আহমদ আবদুল্লাহ বলেন, কওমি স্বীকৃতি পর্যালোচনা সম্প্রতি অনেকটা নিভু নিভু, কিন্তু এর প্রভাব কওমি পরিসরের মধ্যে চোখে পড়ার মতো। ক্ষেত্রবিশেষ এর কার্যকারিতা কিংবা উপকারিতা শুভনীয় হলেও ক্ষতির দিক বিবেচনা করাও জরুরী। একজন সচেতন আলেমের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো, সমাজের সকল ফেৎনাকে চিহ্নিত করে তা মূলোৎপাটন করা। সুন্দর ও সচেতন মূলক সমাজ উপহার দেয়া। একজন আলেমের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কি? তার কথাবার্তা, চলাফেরা, আচার-আচরণ, পরস্পর মুয়ামালা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরর ইত্যাদি চিন্তাকুল হবে তো কেবল মহান রাব্বুল আলামিনকে ঘিরে। কিন্তু আমরা আজ লক্ষ্যহীন হয়ে ঘুরছি, ঘুরছি সার্টিফিকেট নামক বিষফোঁড়ার পেছনে। স্বীকৃতি নামক ক্যান্সার আজ আমাদের দেওবন্দের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে  সরিয়ে দিচ্ছে। দরকারি আলেম থেকে বানাচ্ছে সরকারি আলেম। একজন নবী ওয়ারিশের শান কখনই এমন হতে পারে না। তিনি তো হবেন পরিপূর্ণ ও পরিশুদ্ধ জ্ঞানের কেন্দ্র আল কুরআনের ধারক-বাহক, হবেন সত্যের দিশারী। আল্লাহ আমাদের সুবুদ্ধি উদয় করুন।

জামিয়া ইকরা বাংলাদেশ থেকে আল হাইয়াতুল উলইয়ার অধীনে ২০১৮ সালে দাওরায়ে হাদীসের পরীক্ষা দিয়েছেন কাউসার মাহমুদ। তিনি বলেন, একজন কওমী শিক্ষার্থী হিসেবে আমি বড্ড ব্যথিত হই যখন সার্টিফিকেট ইস্যুতে আমাকে পিছিয়ে পড়তে হয়। প্রচণ্ড অপমান বোধ করি যখন আমার ওপর ঘুরতে থাকে বিভিন্ন মহলের আধা শিক্ষিত নাগরিক সমাজের আড়চোখ । বোধকরি নিজ শিক্ষার স্বীকৃতির  না নেয়ার ব্যাপারে  এ কঠিন সিদ্ধান্ত আমাদের দেশেই প্রথম। সরকার যেখানে একটা সমঝোতায় এসে আমাদের স্বীকৃতি দিতে চেয়েছে সেখানে শুধু শুধু ব্যক্তিগত রাগ দেখিয়ে এটিকে এড়িয়ে যাওয়ার মতো  সিদ্ধান্ত পুরো কওমী শিক্ষার্থীদের একটি স্বীকৃতিহীন ভবিষ্যতে ঠেলে দেয়া ছাড়া আর কিছুই না।

 

যাত্রাবাড়ীর জামিয়া ইদ্রিসিয়া তাখাসুস একাডেমির ইফতা বিভাগের শিক্ষার্থী তামীম হুসাইন শাওন বলেন, কওমি মাদরাসার সরকারি এ স্বীকৃতির জন্য যারা প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন তাদের ধন্যবাদ না দিলেই নয়। কিন্তু জানার বিষয় থেকে যায় স্বীকৃতির কার্যকারিতা সম্পর্কে। কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শ্রেণি দাওরায়ে হাদীস (তাকমিল) কে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স সমমান স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশের কোনো কর্মসংস্থানে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্সের কোনো কার্যকারী গুরুত্ব নেই। এক জরিপ অনুযায়ী দেশের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১ লক্ষাধিক শিক্ষক পদ ফাঁকা রয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইসলাম ধর্ম শিক্ষা দিচ্ছেন বিধর্মী বা অন্য বিষয়ের শিক্ষক। অন্তঃপক্ষে এসব পদে কওমি মাদ্রাসা থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য হলেও দ্রুত সরকারি স্বীকৃতি বাস্তবায়িত হোক।

সাভার জামিয়া বলিয়ারপুর মাদরাসার তাকমীল শিক্ষার্থী সুফিয়ান ফারাবী বলেন, স্বীকৃতি না থাকার কারণে আমরা উচ্চ শিক্ষার জন্য বাহিরের কোন দেশে যেতে পারছি না। যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও আমরা আমাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি বরাবর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য সরকার ঘোষণা দিলেও আমরা এখনো আমাদের অধিকার থেকে অনেক দূরে। যতটুকু জানি সরকার বা মন্ত্রণালয়ের এ ক্ষেত্রে কোন অবহেলা নেই। অবহেলা আমাদের মুরব্বিদের। বড়দের অনৈক্যের কারণে আজ পর্যন্ত তা ঝুলে আছে। দারুল উলুম দেওবন্দের তাকমীল পড়ুয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মোবাশ্বির আহমদ বলেন, শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. সহ অন্যান্য মুরুব্বিরা স্বকীয়তা বজায় রেখে যে স্বীকৃতি চেয়েছেন সেটাই আমরা চাই। কোন জালিম শাহির টোপে পড়ে ধোঁকাবাজদের ধোপে গুলিয়ে ফেলা স্বীকৃতি চাই না। তবে বর্তমান সরকার যেভাবে দিয়েছে বা দিতে চাচ্ছে তাতে কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তা ধ্বংসের মুখের পড়বে যার প্রমাণ ইতিমধ্যে স্পষ্ট হতে চলছে।

ফরিদাবাদ মাদরাসার তাকমীল শিক্ষার্থী মুনশি মুহাম্মদ আরমান বলেন, কওমী মাদরাসার একজন ছাত্র হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি কওমী স্বীকৃতি এটা আমাদের মৌলিক অধিকার। চারদিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় বাংলাদেশের প্রতিটা শিক্ষা ব্যবস্থারই একটা স্বীকৃতি রয়েছে। সরকারি স্বীকৃতি। শুধু আমাদের কওমী অঙ্গনটাই বাকি ছিলো। আমরা অবশ্যই একমাত্র আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল (সা.) জন্য কওমিতে পড়াশোনা করি। তথাপি পার্থিব জীবনে পথচলার জন্য, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য হলেও স্বীকৃতিটা আমাদের আবশ্যকীয় ছিলো। সুতরাং আমাদের প্রাপ্য আমাদেরকে দেওয়া হোক।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল গণভবনে শীর্ষ আলেমদের উপস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কওমী মাদরাসার দাওরায়ে হাদীসকে মাস্টার্স (আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ) সমমান ঘোষনা করেন। এরপর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এ বিষয়ে কোনও আইন না থাকায় ‘সনদের মান’ দেওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘দাওরায়ে হাদিস’কে মাস্টার্স সমমান ঘোষণার পর ছয়টি আঞ্চলিক কওমি শিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়ে গঠিত আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ এর অধীনে গত বছর ১৫ মে প্রথমবারের মতো এবং এবছর দ্বিতীয়বারের মতো সমন্বিতভাবে অনুষ্ঠিত হয় দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষা।