জাতীয় নির্বাচন : কী কৌশলে এগুচ্ছে কওমিভিত্তিক প্রধান চার ইসলামি দল?

ওমর ফারুক
 

বাংলাদেশে শ’খানিকের ওপরে ইসলামি দল থাকলেও সব দলই ব্যাপক জনসমর্থিত নয়। কিছু নামসর্বস্ব ইসলামি দলও রয়েছে। তবে কওমি মাদরাসা ও আলেম উলামাভিত্তিক বর্তমানে প্রধান চারটি ইসলামি দল রয়েছে যেগুলো ভোটের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে আছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এসব দলের ব্যাপক প্রস্তুতি ও জোটবদ্ধ রাজনীতিতে শামিল হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

আলেম উলামাদের নেতৃত্বে পরিচালিত প্রধান চারটি ইসলামি দলের মধ্যে দুটি জোট শরিক রাজনীতির সঙ্গে রয়েছে। এর মধ্যে ইসলামি আন্দোলন ও ইসলামি ঐক্যজোট তিনশ’ আসনে প্রার্থী দিচ্ছে বলে ফাতেহ২৪ কে জানিয়েছে দলটির নেতৃবৃন্দ। অপর দুটি দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ জোট শরিক দল হওয়ায় তাদের প্রার্থী সংখ্যাও ২০ থেকে ৫০ এর ভেতরেই রয়েছে। প্রার্থী সংখ্যা যাই হোক নির্বাচনি লড়াইয়ে কতোটা প্রস্তুত এসব দলগুলো এটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। ভোটের রাজনীতিতে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে কি তারা জাতীয় সংসদে যেতে পারবেন? কী কৌশলে এগোচ্ছে দলগুলি? এসব বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে প্রতিটি দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে।

এসব দলের নেতৃবৃন্দ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের জয়ের ব্যাপারে অনেকটাই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। জোটবদ্ধ না হয়েও ইসলামি আন্দোলন মনে করছে তারা তিনশ’ আসনেই যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করেছে এবং তিনশ আসনেই তাদের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনে করছে তাদের জাতীয় সম্মিলিত জোট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সঙ্গে মিলে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবে। ফলে তাদেরও বেশ কিছু আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামি নেতৃত্বাধীন জোট ইসলামি ঐক্যজোট নির্বাচনি কোনো জোটে যাবে কিনা এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে যেতে পারেনি। দলটির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘আমরা নিজেরাই একটি জোট। তবে অন্য কোনো জোটের সঙ্গে নির্বাচনি জোটে যাবো কিনা সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমাদের তিনশ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে।’

ইসলামি ঐক্যজোট জোটে না গেলেও এবারের নির্বাচনে তারা আওয়ামী লীগের প্রতিশ্রুতি পেয়ে নির্বাচনে লড়তে যাচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। যদিও পরবর্তীতে দলটির একাধিক নেতা বিষয়টি অস্বীকার করেন। কিন্তু মনে করা হচ্ছে, ইসলামি ঐক্যজোট ভিন্ন কোনো জোটে না যাওয়াটাই আওয়ামী লীগের জন্য লাভজনক। একইভাবে ইসলামি আন্দোলনের জোটে না যাওয়া থেকেও আওয়ামী লীগ উপকৃত হবে। কারণ এ দুটি দলের আদর্শ ও নীতি আওয়ামী লীগ বিরোধী হওয়ার কারণে ভোটগুলো বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেই পাওয়ার কথা ছিল। জোটবদ্ধতা থেকে বিরত থাকার কারণে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বিষয়টিকে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের সঙ্গে এ দুটি দলের গোপন আঁতাতের ফল বলেও মনে করছেন। তবে বরাবরই তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

ইসলামী আন্দোলনের একজন যুগ্ম মহাসচিব এ প্রতিবেদককে জানান, আমরা ক্ষমতার রাজনীতি করি না। আমরা মানবতা ও ইসলামের রাজনীতি করি। এ কারণে জোটে যেয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার লোভ ও লালসা আমাদের নেই। অতীতের জোটবদ্ধ কোনো ক্ষমতাসীন দলই দেশে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ উপহার দিতে পারেনি। আমরা দুর্নীতিমুক্ত ইনসাফপূর্ণ দেশ গড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আশা করি মানুষ আমাদের এ সুযোগ করে দিবে। আমরা তিনশ আসনেই বিজয়ী হওয়ার আশা রাখি।

ইসলামি আন্দোলন তিনশ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেও এদিকে মুফতি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বাধীন জোটবদ্ধ দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এখনো তাদের প্রার্থী সংখ্যা চূড়ান্ত করেনি বলে জানিয়েছে। বিষয়টি তাদের শরীক ২০ দলের সিদ্ধান্তের ওপর ঝুলে আছে বলে তারা মনে করছেন। তারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন সে অনুযায়ী তারা প্রার্থী দেবেন বলে জানিয়েছেন দলটির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তবে আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমীর নেতৃত্বাধীন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ২০ দলের সঙ্গে শরিক থাকলেও তারা মনে করছেন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বা একক নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলে তারা ৫০ আসনে প্রার্থী দিবেন। আর জোট শরিক হয়ে নির্বাচনে গেলে ১৫-২০ জন প্রার্থী দিবেন। সে লক্ষ্যে তাদের প্রার্থীরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগের কাজ করে যাচ্ছে বলেও জমিয়তের একজন নেতা জানান।

জোট ছেড়ে এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার সম্ভাবনা কেন দেখছে জমিয়ত এমন প্রশ্নে দলটির নেতা জানান, শেষ পর্যন্ত আশাহত হলে বা কাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তি জোটের পক্ষ থেকে না পেলে এমনটা হতেই পারে। তবে এর জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।

দেশে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে রয়েছে খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। তবে আন্তঃকোন্দলে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এখন দু’ভাগ। এই দুটি দলেরই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হবে জোটের মধ্যে আসনবণ্টনের পর। যদিও দুটি দল নিজেদের মতো নির্বাচনি প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিএনপি-আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক জোটের বাইরে ছিল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। তবে গত ১১ আগস্ট নির্বাচনি সমঝোতায় জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। দলটির নেতারা বলেন, ‘জাতীয় পার্টির সঙ্গে আমাদের জোট নির্বাচনকেন্দ্রিক। ইসলামী দলগুলো নিয়ে জোট গঠনের জন্য অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু সম্ভব হয়নি। জোটের শরিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই নির্বাচনের সবকিছু চূড়ান্ত করা হবে।’

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী ইসলামী ঐক্যজোটও। দলটি দুই যুগ ধরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে ছিল। ২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ছেড়ে ‘ইসলামী ঐক্য’ গড়ার কথা বললেও তা গড়তে পারেনি তারা।

তবে সব ইসলামি দলগুলের নেতারা মনে করেন, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। বর্তমান সংসদ বহাল থাকলে নির্বাচন প্রভাবমুক্ত হবে না।