‘লিট ফেস্ট’ কি ‘হে ফেস্ট’-ই থেকে যাবে?

কাজী মাহবুবুর রহমান

একদিকে ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক রিচার্ড বেয়ার্ড কথা বলেছেন তার সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দ্য ডে দ্যাট ওয়েন্ট মিসিং’ নিয়ে। পাশেই ‘টেলস অব ওয়ান্ডার: মিথস অ্যান্ড ফেইরিটেইলস’ শীর্ষক সেশ‌নে আড্ডা দিচ্ছেন লেখক স্যালি পম ক্লেটন ও কবি, অধ্যাপক, নিবন্ধ রচয়িতা ও অনুবাদক কায়সার হক। আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ অডিটরিয়ামে উপচে পড়া ভীড়, সকলে দেখতে এসেছেন ‘মান্টো’। শুধু কি দেখা? ছবি শেষ হওয়ার পরেপরেই পরিচালক নন্দিতা দাসের সাথে সরাসরি আলাপ! নন্দিতার সাথে বসেই আবার ক্যান্সারজয়ের গল্প বলছেন আলোচিত বলিউড অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা, আত্মজৈবনিক বই ‘দ্য বুক অব আনটোল্ড হিস্ট্রি’ প্রকাশের ঘোষণা দিচ্ছেন! বাইরে বসেছে দেশি-বিদেশি বইয়ের মেলা, চারিদিকে কেতাদুরস্ত পোশাকে সজ্জিত সব মানুষ। কেউ কথা শুনছেন, কেউ ঘুরছেন, কেউ বই দেখছেন, কেউ খাবার খাচ্ছেন। আমাদের চেনা প্রতিদিনের ঢাকার বাইরে এ যেন এক অচেনা নগরীর দৃশ্য!

বলছিলাম ‘লিট ফেস্ট’র কথা। গত ৮ই নভেম্বর বাঙলা অ্যাকাডেমিতে পর্দা নামে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-র অষ্টম আসরের। ২০১১ সালে প্রথম শুরু হয় এই ফেস্টিভ্যাল। তখন এর নাম ছিলো ‘হে লিটার‍্যারি ফেস্টিভ্যাল’। প্রথম আসরেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে হে ফেস্ট। দেশের অনেক লেখক-বুদ্ধিজীবী এই ফেস্টের নাম ও উদ্দেশ্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তারপরে, নাম পাল্টে, ২০১৫ সাল থেকে এটি ‘ঢাকা লিটার‍্যারি ফেস্টিভ্যাল’, সংক্ষেপে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ নামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাঙলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এর পৃষ্ঠপোষকতা করছে। শুরু থেকেই আয়োজকের দায়িত্বে আছেন আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তা সাদাফ সায সিদ্দিকী, লেখক ও রয়েল ফিমেল স্কুল অব আর্ট-র পরিচালক আহসান আকবর এবং ইউল্যাব ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিষ্ঠাতা কাজী আনিস আহমেদ। বলা হয়ে থাকে, দেশ-বিদেশের বিখ্যাত লেখক, কবি, সাংবাদিক, সমাজতাত্ত্বিক, অভিনেতা, পরিচালক-দের সাথে বাঙলাদেশের মানুষের মেলবন্ধনই এই ফেস্টের উদ্দেশ্য। কিন্তু, আসলে মেলবন্ধনটা কার সাথে কার হচ্ছে, তা নিয়ে শুরু থেকেই তুমুল বিতর্কের মুখে পড়ে এই ফেস্ট। সেই বিতর্ক প্রতিটি আসর ঘিরেই চলমান।

এবারের লিট ফেস্টে অংশগ্রহণ করেন দেশ-বিদেশের প্রায় দুই শতাধিক কবি, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক এবং শিল্প-সাহিত্য-বিনোদন জগতের সাথে যুক্ত মানুষ। ৮, ৯ ও ১০ নভেম্বর—তিনদিন চলে এই অনুষ্ঠান।

প্রথম দিন গিয়েছিলাম একা। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ফিতা কেটে ফেস্টের উদ্বোধন করেন। চারিদিকে রঙিন, ঝলমলে সব মানুষের ভীড়। ইংরেজি বই-পুস্তকের একটা বিশাল সংগ্রহ ফেস্টের ঠিক মাঝামাঝি। সেটি ঘিরেই বেশিরভাগ লোকের উৎসাহ। আমি ঢুকে বই দেখছিলাম, হঠাৎ শুনি, দুটি ছেলে-মেয়ে ইংরাজিতে অনর্গল কথাবার্তা বলছে। প্রথমে ভেবেছিলাম, তারা বাঙলা পারে না। কিন্তু তবু, চেহারা দেখা খটকা লাগছিলো। একটু পরে যখন তারা সেই স্টল থেকে বেরিয়ে গেলো, কৌতূহলবশত তাদের পিছু নিলাম। এবং বুঝলাম, তারা দুজনেই আসলে খাঁটি বাঙালি। মনে মনে একচোট হাসলাম। আবার ফিরে এলাম স্টলে।

এবার আর আগের স্টলে না। গেলাম দেশি প্রকাশনীগুলোর স্টলের দিকে। যেহেতু বাঙলাদেশের সাথে বিশ্বের মিতালি গড়ার প্রয়াস এই ফেস্টের আয়োজকদের, সেই হিশাবে বাঙলা বই-পুস্তকের স্টলগুলিও একটু আকর্ষণীয় আর জমজমাট করা উচিত ছিলো। কিন্তু বিদেশি বইয়ের স্টলটার তুলনায় দেশি প্রকাশনীগুলোর স্টল ছিলো নিতান্তই মলিন, সেফুদার ভাষায় বলতে গেলে, ‘গরীব’। দেখেই মনে হয় একটা অভিজাত, আরেকটা গরীব। অবশ্য এসব ভেবে লাভ নাই। আমার উদ্দেশ্য ‘মান্টো’ দেখা। কিন্তু কাজের চাপ থাকায় সেদিন ‘মান্টো’ না দেখেই ফিরতে হলো।

প্রথম দিন অনুষ্ঠানের আরেকটি অন্যতম আকর্ষণ ছিলো ‘জেমকন পুরষ্কার’। জেমকন গ্রুপ থেকে প্রতিবছর লিট ফেস্টে এই পুরষ্কার দেওয়া হয়। এবার জেকমন সাহিত্য পুরষ্কার পান কথাসাহিত্যিক প্রশান্ত মৃধা। এছাড়া জেকমন তরুণ কথাসাহিত্য পুরষ্কার পান কথাসাহিত্যিক হামিম কামাল এবং জেমকন তরুণ কবিতা পুরষ্কার পান কবি হাসান নাঈম। জেমকন পুরষ্কারের পাশাপাশি, ক্যান্সার থেকে ফিরে আসা বলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী মনীষা কৈরালাও ছিলেন এদিনের বিশেষ আকর্ষণ!

তিনদিনে পঞ্চাশটিরও বেশি সেশনে অংশ নেন প্রায় দুই শতাধিক লেখক-এক্টিভিস্ট-বুদ্ধিজীবী। নানারকম ইভেন্টে জমজমাট এই ফেস্টের পর্দা নামে ১০ নভেম্বর। এবারের লিট ফেস্টের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন পরিচালক নন্দিতা দাস, অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা ও টিলডা সুইন্টন এবং লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তবে, সূচনাকাল থেকে শুরু হওয়া সেই সমালোচনা আর বিতর্ক এখনও পিছু ছাড়েনি ফেস্টটির। সেই বিতর্কে এবার যোগ হয়েছে আরো নতুন নতুন মাত্রা।

শুরু থেকেই দেশের তরুণ লেখক-বুদ্ধিজীবীরা এই ফেস্টটিকে একটি ‘প্রজেক্ট’ হিশেবে দেখেছেন। তাদের মতে এটি একটি নব্য-উপনিবেশবাদী প্রচেষ্টা। ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করতে জাতীয়স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বাংলাদেশের বুকে তারা উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রভাব বইয়ে দিতে চায়। এবারের লিটফেস্টে শুরু থেকেই নানা নেতিবাচক লেখালেখি হয়। ‘লিটার‍্যারি ফেস্টে মনীষা কৈরালা কী শেখাবেন’, বা ‘হিরো আলমকেও দাওয়াত দেওয়া হোক’-ধরণের অনেক সমালোচনা সোশাল মিডিয়ায় দেখা যায়। মুরাদুল ইসলাম, মৃদুল মাহবুব, ব্রাত্য রাইসু, তুহিন খানসহ আরো অনেকেই কঠোর ভাষায় লিটফেস্ট এবং এখানে উৎসাহের সাথে যোগ দেওয়া কবি-সাহিত্যিকদের সমালোচনা করেন। মূলত লিটফেস্টের ‘এলিটিস্ট এটিচ্যুড’ এবং এক ধরণের বিচ্ছিন্নতাবাদী কালচারাল এলিটিজম চর্চার সমালোচনায়ই সোশাল মিডিয়া উত্তপ্ত ছিলো পুরো তিনদিন। এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালে শেষদিনের একটি ঘটনা।

লিটফেস্টের এলিটিস্ট এটিচ্যুডের বিরোধিতা করার জন্য কয়েকজন তরুণ কবি ও লেখক লুঙ্গি পরে লিট ফেস্টে ঢুকতে চান। তাদের মধ্যে দুইজন—কে এম এ রাকিব এবং আমাদের সিনিয়র ভাই তুহিন খানের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী, সময় শেষ হওয়ার আগেই ‘ঢোকার সময় শেষ’ অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ফেসবুকে তারা দুজন বিষয়টার প্রতিবাদ জানিয়ে পোস্ট দিলে ব্যাপারটা সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। পক্ষে-বিপক্ষে অনেক ধরণের কথাবার্তা শুরু হয়। লিটফেস্টের সাথে সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ তাদের অভিযোগ অস্বীকার করলেও, শেষদিনের এই ঘটনাটি লিটফেস্টের এবারের আসরের একটি কলঙ্কদাগ হিশাবে থেকে যায়। ফেস্ট শেষ হওয়ার পরেও চলে তুমুল বাদ-প্রতিবাদ।

বলা হয়, লিট ফেস্টের অন্যতম উদ্দেশ্য বাঙলাদেশ ও বিশ্বের মাঝে সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরি করা৷ কিন্তু এই ফেস্টে আমন্ত্রিত লোকজন, তাদের সেশন, আয়োজন—সবকিছুতেই এক ধরণের বিচ্ছিন্নতাবাদী কালচারাল এলিটিজমের ছাপ। এটি বাঙলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রকৃত রুপটিকে ফুটিয়ে তুলতে আদৌ কি পারছে? বাঙলাদেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সংস্কৃতি কি লিটফেস্টে ফুটে উঠছে? মনে হয় না। বরং, ঢাকা লিট ফেস্টকে অনেকেই ঠাট্টা করে বলছেন, ‘ঢাকা (এ)লিট ফেস্ট!’

ভেতরে চলছে লালনের গান, বাইরে লুঙ্গি পরে আসায় কিছু তরুণকে ফেস্টে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না—এমন চিত্রের কথাই লিখেছেন কে এম রাকিব। এরকম ডাবল স্টান্ডার্ডের কারণে, আমাদের এই শঙ্কা আরো পোক্ত হয় যে, ঢাকা লিট ফেস্ট আসলে কাদের? এই ফেস্টের অভ্যন্তরে এখনও কি সেই ‘হে ফেস্ট’র মানসিকতাই রয়ে গেছে, নাকি এটি কেবলই ঢাকাকেন্দ্রিক কিছু উপরতলার লোকদের উদ্দেশ্যপূর্ণ আনাগোনার জায়গা? অথচ এটি ‘হে’ বা কেবল ঢাকার না, হওয়া উচিত ছিলো পুরো বাঙলাদেশের। লিট ফেস্ট কি গণমানুষের সেই চরিত্রকে কখনও ধারণ করতে পারবে? তারা কি পারবে এক প্ল্যাটফর্মে দেশের সব পর্যায়ের মানুষের মেলবন্ধন ঘটাতে? আন্তর্জাতিক ঐক্য আর বোঝাপড়ার আগে জরুরি জাতীয় ঐক্য ও বোঝাপড়া। পৃথিবীর সাথে যোগ তখনই সফল হয়, যখন নিজেদের পরস্পরের মাঝে যোগাযোগ মজবুত হয়। লিট ফেস্ট কি পারবে, এই বাস্তবতাটি উপলব্ধি করে তাকে বাস্তবায়িত করতে? আমরা আশায় থাকব।