লোকাল বাস : প্রেম ও ভীতি

কাজী মাহবুবুর রহমানঃ 

ঢাকার জনজীবনে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য লোকাল বাস একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিদিন সকাল হতেই শহরের নানা প্রান্ত থেকে কর্মজীবিরা কর্মক্ষেত্রে ছুটে যাচ্ছেন এবং দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে আবার সেই লোকালবাসের সিটে বসে অথবা দরজার হাতল ধরে ঝুলে ঘরে ফিরছেন, এই দৃশ্য ছাড়া ঢাকা শহরকে কল্পনাই করা যায় না। এই লোকাল বাসের সঙ্গে শহুরে জীবনের অনেক গল্প জমে থাকে। প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে বাসে ওঠা, কন্ডাক্টরের সঙ্গে ভাড়া নিয়া বচসা করা, ভাঙা জানালায় আকাশ দেখা, কখনো দূরে সরে গেলে এই গল্পগুলিই স্মৃতিবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু সম্প্রতি এই যানবহনের সঙ্গেই জড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের কিছু দুঃসহ স্মৃতি। যেই যানবাহন আমরা নিজেদের স্বার্থে রাস্তায় নামিয়েছি, তার গায়েই লেগে যাচ্ছে রক্তের দাগ। গত এপ্রিল মাসের তিন তারিখ। সময় দুপুর তিনটা। তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজিব একটি দোতলা বিআরটিসি বাসের দরজার দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন। পাশ দিয়ে  অতিক্রম করার সময় একটি দানব বাস তার একটি হাত কেড়ে নেয়। দুই বাসের মাঝখানে ঝুলন্ত রাজীবের খন্ডিত হাতের ছবি দেখে সারাদেশ কেঁপে ওঠে। শুধু হাত হারিয়েই শেষ রক্ষা হয়নি রাজিবের। ১৩ এপ্রিল ২০১৮ রাত বারটা চল্লিশ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজে রাজীব মারা যান।

রাজীবের এই নির্মম মৃত্যুর দায় প্রথমেই নিতে হবে রাষ্ট্রকে। স্বাধীনতার প্রায় পাঁচদশক পরেও দৈনন্দিন পথঘাটে সাধারণ জনজীবনের নিশ্চয়তা দিতে না পারা রাষ্ট্রের বৃহৎ ব্যর্থতাই বটে। গাড়ির চালক ও স্টাফদের উগ্র মানসিকতার পেছনেও দায়ী অনিয়ম, শিথিলতা এবং দূর্নীতি। টাকার বিনিময়ে কিংবা ক্ষমতার দৌরাত্ম্যে অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ আছে বলেই গাড়ির চালক এমন বেপরোয়া হতে সাহস পায়।

একটি টিভি সাক্ষাৎকারে একজন ট্রাফিক পুলিশ অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান, কোনো প্রকার সংকেতে চালকরা গাড়ি থামাতে চান না। যতক্ষণ পর্যন্ত ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় নেমে না আসেন ততক্ষণ পর্যন্ত রাস্তায় কোনো ট্রাফিক আইন কার্যকর হয় না।

এমন চলতে থাকলে আমরা প্রতিদিন ঘুমুতে যাবার আগে শুনতে পাব, আজও কোনো রাজীব হাত হারিয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর কাছে বসে ধুঁকছেন। আগামীকাল অন্য কোনো রাজীব হারাবেন পা। এই পরিস্থিতির নিরসনের জন্য চাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। ড্রাইভারদের জন্য বিশেষ শিক্ষা এবং আইন। এবং জনসচেতনতা। যাতে করে কেউ অনিয়ম করে বাসের দরজায় ঝুলে ঝুঁকিপূর্ণভাবে আরোহন না করেন। সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার্থে রাষ্ট্র এই উদ্যোগ করবে বলে আমরা আশাবাদী।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পরবর্তি সংবাদলেখকের প্রশ্নবিদ্ধ আদর্শ নয়, ভাষাটা গ্রহণ করতে হবে: শরীফ মুহাম্মদ