মাদরাসা বোর্ডিংয়ের খাবার কতটা পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত?

ওমর ফারুক

গত সপ্তাহের মঙ্গলবার। ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার বালিয়া আশরাফুল উলুম মাদরাসায় বোর্ডিংয়ের খাবারের বিষক্রিয়ায় এক মারা যায় এক শিক্ষার্থী । অসুস্থ হয়ে পড়ে প্রায় দেড় শতাধিক ছাত্র। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে খাবারের তালিকায় ছিল মুরগির মাংস ও ডাল। প্রায় ২০০ ছাত্র ও কয়েকজন শিক্ষক রাতের খাবার খান। খাবার খাওয়ার পর পরই কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ডায়রিয়া শুরু হয়। তাদের একজন তাদাখুল ক্লাসের ছাত্র রিয়াদের (১৮) অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে প্রথমে ফুলপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে তার অবস্থার আরও অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ময়মনসিংহ এসকে হাসপাতালে প্রেরণ করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার সকাল ৯টায় তার মৃত্যু হয়।

বালিয়া মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষক মোখলেছুর রহমান মণ্ডল জানান, ডালের ভেতর কোনো রাসায়নিক দ্রব্য থাকার কারণে এই দু:খজনক ঘটনা ঘটেছে।

মাদরাসার বোর্ডিং-এর খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়া বা মারা যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিককবার এ ধরণের ঘটনা পত্রপত্রিকায় এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে মাদরাসার বোর্ডিং-এর পরিবেশ, খাবারের মান ও আনুষাঙ্গিক নানা বিষয় নিয়ে। একাধিক কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছু কিছু মাদরাসার খাবারের মান ভালো হলেও অধিকাংশ মাদরাসায় ডাল আর ভর্তাই নিত্যদিনের খাবার। আবার অনেক মাদরাসায় খাবারের মেনু উন্নত হলেও, সেই মেনু অনুযায়ী খাবার দেওয়া হয় না বললেই চলে। খাবারের মান ও পরিবেশ নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলেন। এসব খাবার খাওয়ার ফলে মাদরাসার ছাত্রদের পুষ্টিগুণের যথেষ্ট ঘাটতি থেকে যায়, যার প্রভাব পড়ে তাদের পড়াশোনায়ও।

তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে। রাজধানীর বেশ কিছু মাদরাসার খাবারের মান বেশ ভালো বলে জানা যায়। কোনো কোনো মাদরাসার স্পেশাল ও নরমাল নামে দু ধরণের খাবার চালু রয়েছে। সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার বিনিময়ে এসব খাবার পেয়ে থাকেন। তবে যারা মাদরাসায় ফ্রি কিংবা সামান্য টাকা দিয়ে খাবার খান তাদের ভাগ্যে অধিকাংশ সময় ডাল ভর্তা ছাড়া কিছুই জোটে না।

মাওলানা মাহফুজুল হক পরিচালিত রাজধানীর জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার শিক্ষার্থী রেজাউল করীম ফাতেহ২৪-কে জানান, আমাদের এখানে দুই রকম খাবারই চালু রয়েছে। স্পেশাল ও নরমাল। স্পেশালের মান ভালো হলেও নরমাল খাবারের মানে যথেষ্ট কমতি রয়েছে। তবে আমাদের এখানে বোডিং এর পরিবেশ যথেষ্ট রুচিসম্মত।

মাওলানা মাহমুদুল হাসান পরিচালিত রাজধানীর যাত্রাবাড়ি মাদরাসার শিক্ষার্থী আবুল বাশার জানান, দ্বীনি ইলম শিক্ষা করতে হলে কিছুটা কষ্ট করতে হবে এটাই স্বাভাবিক। মাদরাসাগুলো সামান্য টাকার বিনিময়ে হাজার হাজার ছাত্রের খাবার জোগান দিয়ে থাকে। এতে খাবারের মান না থাকাটা স্বাভাবিক। আমাদের মাদরাসার এ ক্ষেত্রে বদনামও রয়েছে। তবে আমি মনে করি এগুলো কর্তৃপক্ষের অপারগতা। এর সমালোচনা না করাই ভালো।

তবে রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদরাসার শিক্ষার্থী আবু বকর বলেন, কর্তৃপক্ষ খাবারের প্রতি আরেকটু নজর দিলেই শিক্ষার্থীরা একটু ভালো খাবার পেতে পারে। ডাল-ভাত-ভর্তা খেয়ে পড়াশোনা করা কঠিন। আমাদের অধিকাংশ সময় দোকান থেকে অতিরিক্ত তরকারি কিনে এনে খেতে হয়।

শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগ নিয়ে কথা হয়েছিল কওমি মাদরাসার কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষকদের সঙ্গে। তারা ফাতেহ২৪-কে জানান, আমাদের মাদরাসাগুলোর বাৎসরিক খরচ জোগান দিতেই হিমশিম খেতে হয়। শিক্ষকদের বেতন ভাতাও প্রায় সময় বকেয়া পড়ে যায়। সারা বছর টানাহেচড়ার মাঝেই কাটে। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীদের খাবার মান সর্বোচ্চ উন্নত করা অনেকটাই অসম্ভব। তবে শিক্ষার্থীরা যদি খাবারের টাকা বাড়িয়ে দেন তাহলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে তারা মনে করেন। তারা মাদরাসার বোর্ডিং-এর পরিবেশও তুলনামূলক ভালো বলে মনে করছেন।

এ বিষয়ে রাজধানীর ইসলামবাগ মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মনজুরুল ইসলাম আফেন্দি ফাতেহ২৪-কে বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সকল মাদরাসারই খাবারের মান ভালো করা উচিত। কারণ, খাবার ভালো না পেলে শিক্ষার্থীদের পড়ার মানও বাড়বে না। পড়াশোনার জন্য শারীরিক পুষ্টিগুণও প্রয়োজন। সব মাদরাসার কর্তৃপক্ষকেই এ বিষয়ে নজর দিতে হবে।

তবে মাদরাসাগুলোর সঙ্কটের বিষয়টিও তুলে ধরেন মাওলানা মনজুরুল ইসলাম আফেন্দি। তিনি বলেন, মাদরাসাগুলোর বোর্ডিং-এর বিশাল একটি অংশ আয় হয় কুরবানির চামড়া থেকে। চামড়ার দরপতনের কারণে মাদরাসাগুলোও সঙ্কটে পড়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে বোর্ডিংয়ের খাবারের মান বৃদ্ধি করা কষ্টসাধ্যই বটে। তবে সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য বিত্তবান পরিবারের শিক্ষার্থীদের খাবারের যথাযথ টাকা দেওয়া উচিত। আর মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীদের খাবারের টাকাটা আরেকটু বাড়িয়ে দিলেই এ সঙ্কট কেটে যাবে।

এদিকে রাজধানীর বড় বড় মাদরাসাগুলোর খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বর্তমানে প্রাইভেট মাদরাসাগুলোর খাবারের মান যথেষ্ট পরিমাণ ভালো রয়েছে বলে ফাতেহ২৪-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। রাজধানী মিরপুরের ঢাকা আইডিয়াল ক্যাডেট মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহমুদুল হাসান জানান, আমরা প্রতি বেলায় শিক্ষার্থীদের মোটামুটি ভালো খাবার দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের খাবারের মানে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা সন্তুষ্ট।

এদিকে বড় বড় মাদরাসাগুলোর খাবারের মানের বিষয়টি তার কাছে তুলে ধরা হলে তিনি বলেন, আমাদের কাছে খবর রয়েছে প্রায় প্রতিটি বড় মাদরাসারই ইনকাম সোর্স অনেক ভালো। তাদের অর্থ মাদরাসার কাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা আনুষাঙ্গিক কাজেই ব্যয় হয়। অথবা ব্যাংকে পড়ে থাকে। ইচ্ছে করলেই সকল মাদরাসা বোর্ডিং-এর খাবারের মান উন্নত করতে পারে। অন্তত কোনো না কোনো বেলায় শাক বা ভাজি দিয়েও শিক্ষার্থীদের পুষ্টিগুণ পূরণ করা যায়। শিক্ষার্থীরা ফ্রি খাবার খাওয়ায় বা লিল্লাহ বোর্ডিং-টাইপের কালচারের কারণে কর্তৃপক্ষের এ বিষয়গুলোর প্রতি তেমন মনোযোগ থাকে না।

রাজধানীর মাদরাসাগুলোর খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, অপরদিকে গ্রামগঞ্জের প্রায় মাদরাসারই খাবারের মান যথেষ্ট পরিমাণ পুষ্টিসম্মত ও ভালো বলে মনে করছেন সেসব মাদরাসার শিক্ষকরা। সাধারণ মানুষ তাদের ফসল, ফলফলাদি বা খামারের মাছ, মুরগি, ডিম মাদরাসায় দান করার কারণে এসব মাদরাসাও শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো খাবারের আয়োজন সম্ভব হয়ে বলেও তারা জানান। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের আল জামিয়াতুল ইসলামি কাশিপুর মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা মুনীর হুসাইন বলেন, ‘শহরের মাদরাসাগুলোর তুলনায় আমাদের খাবারের মান যথেষ্ট ভালো বলে মনে করি। সপ্তাহের প্রায় দিনই মাংস কিংবা মাছ, ডিম দেওয়া হয়। শাক-সবজি তো নিত্য দিনের রুটিন। সব মিলিয়ে গ্রাম বা মফস্বলের মাদরাসাগুলোয় খাবারের মান শহরের তুলনায় ভালো বলেই মনে হয়।’