মালিবাগের শহীদি মসজিদ ও আমাদের অপরাজনীতি

হাসান আযীয ঃ 

মালিবাগ মসজিদ যখন শহিদ হয় আমার বয়স তখন ৭\৮ বছর। তখনও ঢাকা শহর দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। গ্রামে থাকতাম। তবে মালিবাগ-চৌধুরীপাড়ার সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিলো অত্যন্ত মজবুত। ছোটবেলা থেকেই তাই এই দুই জায়গার নাম অসংখ্যবার শোনা হয়েছে। মসজিদ শাহাদাতের ঘটনা জানতেও দেরী হয়নি। তাছাড়া আমাদের বাড়িতে বেশ কয়েকটা ইসলামী সাময়িকী আসতো। সেসবেও এই ঘটনা পড়েছি। মালিবাগ জামিয়ার শাইখে ছানী মাওলানা জাফর আহমদ সাহেব শনিবার দরসে হাজিরা টানার সময় শহিদ ছাত্রের নামে এসে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিলেন। এরপর কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করে বলেছিলেন, আল্লাহ শহিদদের মৃত বলতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং আমি তার নামে হাজিরা দিলাম..।এই গল্পও মাসিক পত্রিকায় পড়েছি।

হেদায়াতুন্নাহু পড়ার সময় বড় ভাই আব্দুল ওয়াদুদ বক্তৃতা মজলিশের সমাপনি অনুষ্ঠানে আবেগময় একটা বক্তৃতা করেছিলেন। শহিদ আবুল বাশার তার সহপাঠী ছিলো। যে বৃহস্পতিবার এই ঘটনা ঘটে সেদিনও ছিলো মালিবাগ জামিয়ার বক্তৃতা সমাপনি অনুষ্ঠান। আবুল বাশারের পুরষ্কার পাওয়ার কথা ছিলো..।

মালিবাগ শহিদি মসজিদ নিয়ে এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক ঘটনাই জেনেছি। যে কথা কখনও জানা হয়নি সেটা হচ্ছে সেই শহিদি ভাইদের রাজনৈতিক পরিচয়। আন্দোলনে নেতৃত্যদানকারী ‘রাজনৈতিক দল’টির নাম। আজকের দিনে এসে কিছু ভাইয়ের কর্মকান্ডে মনে হয় সব কিছু ছাপিয়ে এই প্রশ্নটাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড়। তারা শহিদ ভাইদের দলে টানায় ব্যস্ত। লাশ নিয়ে রাজনীতির এরচেয়ে জঘন্য নজির আর কি হতে পারে আমার জানা নেই।

এই ঘটনা যখন ঘটে তখন আমি অনেক ছোট। থাকতাম গ্রামে। উলামায়ে কেরামের শতধা বিভক্ত রাজনীতি সম্পর্কে জানার বয়স এবং সুযোগ কোনোটাই ছিলো না। তাই সেই আন্দোলনে কোন রাজনৈতিক দল নেতৃত্বে দিয়েছিলো, সেটা তো তখন জানার সুযোগ হয়নি। তবে বর্তমানের আলোকে ব্যাপারটাকে একটু ব্যাখ্যা করা যায়।

এদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন হয়। আমাদের ধর্মীয় রাজনৈক দলগুলির প্রায় সবাই আলাদা আলাদা কর্মসূচী দেন। কেউ বাইতুল মোকারমের উত্তর গেইটে, কেউ মুক্তাঙ্গনে, কেউ পল্টন তো কেউ জিরো পয়েন্টে। দশ হাত দূরত্বে আলাদা আলাদা দুই দলের মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ আমরা দেখেছি। প্রেসক্লাবে একই সময়ে নিচতলায় এক দল, দুতলায় আরেক দল এরকমও ঘটেছে। একটা সময় পর্যন্ত আমি এ ধরনের সব কর্মসূচীতেই শরিক থাকার চেষ্টা করতাম। আন্দোলন কে ডেকেছে তার চেয়েও আন্দোলনের বিষয়বস্তু আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। জীবনে এখনও পর্যন্ত নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জুড়তে পারিনি। এখন আমি যদি ওরকম কোনো এক আন্দোলনে শহিদ হয়ে যেতাম তাহলে কি আমি ঐ দলের কর্মী হয়ে যেতাম?

একটা দুঃখজনক এবং একই সঙ্গে লজ্জাজনক বাস্তবতা হচ্ছে, এইসব আন্দোলনে যখন নির্দলীয় নিরীহ কোনো ছাত্র আহত কিংবা বন্দি হয় তখন সে কোনো দলেরই থাকে না। কেউ হাসপাতালে কিংবা জেলে তাকে দেখতে যায় না। তার চিকিৎসা এবং মুক্তির ব্যাপারে কারও তেমন গরজ দেখা যায় না। কিন্তু মারা গেলে লাশটা হয়ে যায় দলীয় কর্মী। সেই লাশ নিয়ে কতো টানা-হেঁচড়া!

মালিবাগের শহিদদের ক্ষেত্রে এরকমই কি কিছু ঘটেছিলো? শহিদরা কি সত্যিই কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলো? তারা কি সত্যিই কোনো রাজনৈতিক দলের ডাকে সেখানে গিয়েছিলো? জানি এই টানা-হেঁচড়ায় শহিদদের আত্মা কতোটা শান্তি পায়। তবে আমরা যে নির্লজ্জতার সর্বশেষ সীমাটাও পার করে যাচ্ছি এটা বোঝার জন্য অনেক বেশি জ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।