মুষ্টিচাল : দ্বীনি কোরবানি না ভিক্ষাবৃত্তি

কাজী মাহবুবুর রহমান

গ্রামটির নাম বালুচড়া। পথঘাটে মানুষের আনাগোনা বিশেষ নেই। রাস্তার একপাশে বাড়ি-ঘর, অন্য পাশে ফসলি জমি। অন্য দশটি নদীর তীরবর্তী গ্রামের মতোই এই গ্রাম। গ্রামের ভেতরে একটি হাফেজিয়া মাদরাসা আছে। ছারছিনা তরিকার এক পির সাহেব মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে তার খেলাফতপ্রাপ্ত এক ছেলের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।

দিনটি ছিল শুক্রবার। সকাল এবং দুপুরের মাঝামাঝি সময়। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চারজন হাফেজিয়া মাদরাসার ছাত্রের একটি ছোট দল দেখা গেল। ওদের হাতে বাজারের ব্যাগের মতো কাপড়ের ব্যাগ। ওরা প্রতি বাড়িতেই ঢুকছে এবং কিছুক্ষণ পর বের হয়ে আসছে। শুরুতেই মনে হল, মাদরাসা-সংক্রান্ত কোনো দাওয়াত অথবা চাঁদা কালেকশন। এর বাইরে আসলে কিছু হওয়ার মতো নেইও। কিন্তু কাছাকাছি আসতেই বড় রকমের একটা চমক দেখতে পেলাম। ছেলেগুলি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুষ্টি মুষ্টি করে চাল নিয়ে হাতের ব্যাগগুলিতে রাখছে। প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতে কিছুটা সময় লাগল। চাঁদা কালেকশনের অনেক ধরন দেখেছি। এই ধরনটির সঙ্গে আগে পরিচিত ছিলাম না । ছেলেগুলির সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বললাম। কার কী নাম? কেমন পড়াশোনা করছে? বাড়ি কত দূরে? এসব কথা।

ছেলেগুলির পরনের কাপড় ছিল নিতান্তই সাদামাটা। চেহারাও মলিন। বোঝা যাচ্ছে, এই কাজটি ওরা করছে অত্যন্ত অনাগ্রহের সঙ্গে। জিজ্ঞাসা করলাম, চাঁদা নিতে কে পাঠায় তোমাদের?

—বড় হুজুর

—বড় হুজুর কে?

—পির সাহেব হুজুর ।

—চাঁদা নিতে আসতে হয় কত দিন পরপর?

—প্রতি শুক্রবার। জুমার নামাজের আগ পর্যন্ত।

চাঁদা কালেকশনের কত পদ্ধতিই তো দেখেছি। কিন্তু এই পদ্ধতিটা একেবারে অপমানজনক ঠেকল। অনেকটা সাধারণ ভিক্ষাবৃত্তির মতোই। সেটাও তুলে দেওয়া হয়েছে এমন সব ছেলেদের হাতে, যাদের বয়স দশের আশেপাশে। এই চাঁদার আগে-পিছে কী হবে, তা তারা কিছুই জানে না; তারা শুধু জানে, এক গৃহস্থের ঘরের দরজায় হাতের থলেটি পেতে দিতে হবে। সমাজ এবং আইন সব দৃষ্টিতেই এমন একটি বিষয় বিতর্কিত ।

এই চাঁদাটি মুলত তোলা হয় বাড়ির ভেতরের মহিলাদের কাছে। তারা এখানে নিয়মিত মুঠি ভরে চাল দেন। কখনে মানতের টাকা, নতুন গাছের ফল, পালের হাঁস মুরগিও তারা দিয়ে দেন।

অনেকবার ভেবে দেখলাম, এভাবে বাড়ি বাড়ি থলে-হাতে যাওয়ার প্রয়োজন; কারণ, সামাজিক বাস্তবতা ও ইতিহাস—সব কিছু ছাপিয়ে আমার কেবলই মনে হতে লাগল ছেলেগুলির কথা। এরা এই বয়সে এমন কাজকে কীভাবে নিচ্ছে? ওরা কি নিজেদের নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে? ওদের কি কখনো এমন মনে হচ্ছে, মাদরাসায় আসার ফলেই আমাকে এই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে…?

ওদের মুহতামিমের সঙ্গে কথা বলা দরকার মনে হল। তিনি ব্যস্ত ছিলেন। তার নাম মাওলানা নেছার আহমদ আন-নাছিরী। তিনি ছারছিনা তরিকায় খেলাফতপ্রাপ্ত। তার পিতা দীর্ঘদিন এই এলাকার প্রভাবশালী পির ছিলেন। তিনিই এই মাদরাসা, মসজিদ, কবরস্থানসহ একটি কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান পির মাওলানা নেছার আহমদের সঙ্গে কথা বললাম। মাদরাসার ইতিহাস, বিভিন্ন উত্থান-পতন, ব্যয়নির্বাহ নানা বিষয়ে কথা হল। তাদের তরিকার নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি খানকার সঙ্গে একটি করে হেফজখানা থাকা বাধ্যতামূলক। সেই লক্ষ্যেই তারা এই মাদরাসাটি স্থাপন করেছেন। গ্রামের মানুষের অনুদান ও ছাত্রদের যৎসামান্য প্রদেয় থেকে অনেক বছর যাবতই মাদরাসাটি চলে যাচ্ছে ।

জানতে চাইলাম, এভাবে মুষ্টিভিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কেন?

তিনি বললেন , তার বাবার সময় থেকেই এমন চলে আসছে। এটা কোনো খারাপ বিষয় নয়। এতে করে ছাত্রদের বারো মাসের চালের একটা বড় অংশের ব্যবস্থা হয়ে যায়। ছাত্ররাও এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করে থাকে। তারা এভাবেই অভ্যস্ত।

পদ্ধতিটা পরিবর্তন করা যায় কি না, এতে করে ইসলামি শিক্ষার ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে, এমন অভিযোগ তিনি স্বীকার করতে রাজি হলেন না। দ্বীনের জন্য অনেকেই অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। সেই তুলনায় এতটুকু কখনোই বড় কিছু নয়।

মাওলানা নেছার আহমদ এক সময় ব্যস্ততার কথা বলে একটা মোটরসাইকেলের পেছনের সিটে উঠে বসলেন।

মাওলানা নেছার আহমদের পির-পরিবার সম্পর্কে যতটা জানা গেল, তার বাবা যুবক বয়সে এই গ্রামের একটি মসজিদে ইমাম হিসেবে আসেন। তাদের আদি ঠিকানা বরিশাল জেলায়। তিনি খুব ভাল মানুষ ছিলেন। তাকে সবাই ভালবাসত। একসময় তিনি খেলাফতপ্রাপ্ত হয়ে পির হন। তাদের এখানে প্রতিবছর বাৎসরিক ওয়াজ-মাহফিলে অনেক দূর দূর থেকে মানুষ আসতে শুরু করে। প্রতি বছরের বাৎসরিক ওয়াজ-মাহফিলে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় হয়। সেই তুলনায় এই শীর্ণ হেফজখানার ব্যয় অত্যন্ত কম। একই কমপ্লেক্সের খানকা ও মাদরাসা দুটোর ক্ষেত্রে দুইরকম দৃশ্য চোখে পড়ে। খানকায় প্রতি বছর বিভিন্ন উৎসবে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় হলে অপরটির কেন এমন অবস্থা হবে? ব্যক্তিস্বার্থের সামনে দ্বীনি চেতনা কি তবে ছোট হয়ে আসছে?

মুষ্টিভিক্ষায় দারিদ্র্য দূর হয় না। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কিংবা পরিবহনে চাঁদা কালেকশন করাটাও কোনো স্থায়ী সমাধান না। এসব থেকেই সামাজিক নিগৃহ সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা তৈরি হয় । দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য মানুষের কাছে হাত পাতা অনেক মহৎ কাজ। সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় এই মহত্ত্ব লজ্জায় পর্যবসিত হওয়া থেকে বেচে থাকুক।