অনলাইনে কী করছেন কওমি মাদরাসার ছাত্ররা?

হামমাদ রাগিব

আমাদের জীবন হয়ে গেছে এখন অনেকটাই অনলাইন কেন্দ্রিক। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে, ফেসবুককে কেন্দ্র করেই অনেকের ব্যয় হয় দিন-রাতের বড় একটা অংশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের জীবনযাত্রায় বড় একটা প্রভাব ফেলছে প্রতিনিয়ত। দুঃখের বিষয়, প্রভাবটা ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচকই বেশি। অতিরিক্ত ফেসবুকাসক্তি একদিকে যেমন কর্মঠ মানুষকে অলস করে দিচ্ছে, অপরদিকে ছাত্রদের পড়াশোনায়ও সৃষ্টি করছে বড় রকমের ব্যাঘাত।

কওমি ঘরানার ছাত্রদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগের জন্য ফেসবুক ব্যবহার করেন। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এদের অধিকাংশেরই ফেসবুক ব্যবহার তাদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কেউ কেউ তো অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা ফাঁকি দিয়ে দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করছেন ফেসবুকে। রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদরাসার এমন এক ছাত্রের সঙ্গে কথা হয়েছিল ফাতেহ২৪-এর এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফাতেহ২৪-কে তিনি জানিয়েছেন, প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা তিনি ফেসবুকে সক্রিয় থাকেন। যার কারণে পড়াশোনায় তাঁর ব্যাপক অবনতি ঘটছে। দীর্ঘ এই সময়টা প্রতিদিন ফেসবুকে কী কাজে ব্যয় করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তেমন কিছুই না৷ মাঝে মাঝে লম্বা পোস্ট করি। টাইমলাইন, নিউজফিডে ঘুরি।’

লেখালেখির জন্য পড়তে হয় প্রচুর, ফেসবুকে এত সময় কাটালে আপনি পড়েন কখন? প্রতিবেদকের এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘একটা নেশা হয়ে গেছে ফেসবুকে, পড়াশোনায় তাই আর মন বসে না।’ খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে এমন আরও অসংখ্য তরুণ শিক্ষার্থী কোনো কারণ ছাড়াই ফেসবুকে নষ্ট করছেন তাঁদের মূল্যবান সময়।

এদের কেউ কেউ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে নিজেদের মতামত প্রকাশের জন্য স্ট্যাটাস আপডেট এবং কমেন্ট করেন। এসবকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ জড়িয়ে পড়েন তর্কে। আবার কেউ কেউ নিজেদের মুরব্বি ও উসতাদ সমতুল্য আলেমদের ব্যাপারে কটূক্তি করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। সম্প্রতি আল-হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কাওমিয়ার আয়োজনে অনুষ্ঠিত শোকরিয়া মাহফিলকে কেন্দ্র করে অনেকে দেশের বড় বড় আলেমকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেও ছাড়ছেন না। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জাতীয় ইস্যু নিয়ে কথা-বার্তা বলা এবং মুরব্বি আলেমদের ব্যাপারে কটাক্ষকারী অনেকেই মাদ্রাসার নিয়ম-কানুন ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না। এ রকম কয়েকজনের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে গেলে তারা উল্টো রিয়েক্ট দেখিয়েছেন এই প্রতিবেদককে।

সিলেটের ইসলামিক ফিকহ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মুফতি জিয়াউর রহমানের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, মাদরাসা ছাত্ররা এই যে বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁদের মুরব্বিতুল্য আলেম-উলামাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছেন, এটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন? উত্তরে তিনি ফাতেহ২৪-কে বলেন, ‘আমার মতামত একটু ভিন্ন ধাঁচের হবে৷ আমি শুরুতেই ছোটদের দোষারোপ করার পক্ষে নই৷ কথা হলো, মুরব্বিদেরকে আগে ইস্যু তৈরির প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে৷ অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, বড়রা চলনে-বলনে, নানামুখী তৎপরতা ও কার্যক্রম দ্বারা ছোটদের সামনে ইস্যুর পর ইস্যু তৈরি করে দিচ্ছেন৷ ছোটরাও অপরিণামদর্শীর মতো লুফে নিচ্ছে৷ কথা বলছে মুরব্বিয়ানা তরিকায়৷ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে ইচ্ছেমতো।’

‘মাদরাসা-ছাত্রদের চেইন অব কমান্ড বিষয়ক একটা ঐতিহ্য আবহমান কাল থেকে প্রচলিত। ছোটরা বড়দের অসম্ভব শ্রদ্ধা করত৷ বড়দের ভুল ধরাকে নিজের ভুল মনে করত৷ সেই ঐতিহ্য আজ ভূলুণ্ঠিত৷ ছোটদের মাঝে বড়দের প্রতি সেই শ্রদ্ধা আর নেই৷ সমস্যা আমার কাছে একটাই—বড়রা ছোটদের মনের ভাষা বুঝেন না বা বুঝতে চান না৷ আর ছোটরা বড়দের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা আঁচ করতে পারে না৷’

ইস্যু ভিত্তিক তর্ক-বিতর্কের বাইরে কওমি মাদরাসাভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ছাত্র-কর্মীদের মধ্যে হরহামেশাই লেগে থাকে নানা রকমের বিরোধ-বিতর্ক। এবং সেটা কখনও কখনও গালাগালি পর্যন্ত গড়ায়। অনলাইনে মাদরাসা ঘরানার মানুষের মধ্যে এ রকম নানাবিধ কাদা ছোড়াছুড়ি এবং অমার্জিত ক্রিয়া-প্রতিক্রয়া সাধারণ জনগণকে তাঁদের প্রতি অনেকটা বীতশ্রদ্ধ করে তুলছে।

মাদরাসা-শিক্ষার্থীদে­র অনলাইন ব্যবহারের ইতিবাচক দিকও আছে প্রচুর। ফেসবুক প্লাটফর্ম থেকে আর্তমানবতার সেবায় নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তাঁদের অনেকে। গত বছর রোহিঙ্গা মুহাজিরদের সহায়তায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন মাদরাসা ঘরানার লোকেরাই। অনলাইনের কল্যাণে তাঁরা নানাভাবে আর্থিক ফান্ড তৈরি করে সেটা পৌঁছিয়ে দিয়েছেন রোহিঙ্গা মুসলিমদের হাতে। তাছাড়া অনেকে ব্যক্তিগতভাবে বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা করে অনলাইনে ইসলামের কুৎসা রটনাকারীদেরও মুকাবেলা করছেন।
কিন্তু এসব ইতিবাচক দিকের চেয়ে নেতিবাচক দিকটাই এখানে বেশি। এবং নেতিবাচক দিকের প্রভাব ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এখনই সময় মুরব্বি, নেতৃস্থানীয় লোক এবং খোদ ছাত্রদের এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার।