তাবলীগ সঙ্কট : যেভাবে হবে জোড় ও বিশ্ব ইজতেমা

ওমর ফারুক

তাবলীগ জামায়াতের চলমান সঙ্কটের মাঝে বিশ্ব ইজতেমা ও জোড় নিয়ে আবারও শুরু হয়েছে শঙ্কা ও উত্তেজনা। গত বছর তাবলীগের আলমি শুরার সদস্য মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেওয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশি আলেম-ওলামারা জোরদার আন্দোলন করেছিলেন। এবার আরও আগে ভাগেই শুরু হয়েছে এতায়াতি গ্রুপ ও আলেমদের মাঝে বিশ্ব ইজতেমার মাঠ দখলের তৎপরতা। সা’দপন্থীরা এগুচ্ছেন ভিন্ন কৌশলে। জোড় ও বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে কাকরাইলের শুরা সদস্যদের নির্ধারিত সময়সূচিকে চ্যালেঞ্জ করে আগে ভাগেই বিশ্ব ইজতেমা করার উদ্যোগ নিয়েছে সা’দপন্থীরা। এ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে আলেম ওলামা ও মাদরাসার ছাত্ররা।

তাবলীগ-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ দিনের জোড় এবং ১১-১৩ জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত তিন দিনের বিশ্ব ইজতেমা করার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের তাবলীগ জামাতের মুরুব্বি সা’দ কান্ধলভীর অনুসারীরা। অপরদিকে কাকরাইল মসজিদের মুরুব্বিরাসহ আলেম ওলামারা ডিসেম্বরের ৭ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত জোড় এবং প্রথম ধাপে আগামী জানুয়ারির ১৮ থেকে ২০ তারিখ ও দ্বিতীয় ধাপে ২৫-২৭ তারিখ পর্যন্ত তিন দিন ইজতেমার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সা’দপন্থিদের এ ঘোষণা বুধবার প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বানচাল হয়ে যায়। ফলে বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে প্রাথমিক সঙ্কট কেটে গেছে বলে মনে করছেন আলেমরা। এবং বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে চিন্তিত ও বিচলিত হওয়ার কিছু নেই বলেও তারা মনে করছেন। যথা সময়ে শুরা সদস্যদের নির্ধারিত সময়ে ইজতেমা হবে বলে তারা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে ওলামাদের মাঠ দখলের অভিযোগটিও উড়িয়ে দিয়েছেন তারা।

মূলত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে সা’দপন্থীরা তাদের ঘোষিত তারিখে জোড় ও ইজতেমা করার জন্য উলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। নতুবা ইজতেমার মাঠ দখলে সংঘাত ও সংঘর্ষের হুমকিও দিয়েছে তারা। এ সময় তারা অভিযোগ করে বলেন, প্রশাসনের ছত্রছায়ায় হেফাজতপন্থীরা মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার মাঠ দখল করে রেখেছে। সংবাদ সম্মেলনে তারা আগামী ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত জোড় এবং ১১ থেকে ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ইজতেমার করার ঘোষণা দেয়। এ সময় ৬ লাখ মানুষ জমায়েত করা হবে বলেও তারা দাবি করেন।

এদিকে, ‘টঙ্গীর তুরাগ নদীর পাড়ে বিশ্ব ইজতেমা মাঠের সব কটি ফটকে কড়া পাহারা বসিয়েছে তাবলিগ জামাতের এক পক্ষ’—বুধবার এমন সংবাদ প্রকাশ হয় জাতীয় কয়েকটি গণমাধ্যমে। প্রতিবেদনে বলা হয় সেখানে কে আসছেন, কেন আসছেন, কোথায় যাবেন খুঁটিনাটি নানা বিষয় তদারক করছেন তারা। কারও কথায় অমিল পেলে ফিরিয়ে দিচ্ছেন গেট থেকে। এ পক্ষটি আলেম ওলামাদের পক্ষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজাহাতি জোড়ের অন্যতম আয়োজক ও বিশ্ব ইজতেমার টঙ্গী পয়েন্টের জিম্মাদার মাওলানা কেফায়েতুল্লাহ আযহারী। তিনি বলেন, এতায়াতিদের প্রতিহত করার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই। আমাদের মুরুব্বিরা বলে থাকেন, তাদের বুঝানোর চেষ্টা করা হবে। তাদের নিয়ে আলেমরা ও মুরুব্বিরা কিছু ভাবছেনও না। আলেম ওলামারা মাঠ দখল নয়, বিশ্ব ইজতেমার মাঠ প্রস্তুত করার জন্য সেখানে সেবায় নিয়োজিত আছেন। এ বছর বর্ষা ও ঝড় ঝাপটার কারণে আগে ভাগে মাঠ প্রস্তুত করা সম্পন্ন হয়নি। এ কারণেই বিপুল সংখ্যক মাদরাসার ছাত্র ও সাথীরা মিলে দ্রুত এ কাজ করে যাচ্ছেন। কাকরাইলের উলামা শূরার অধীনেই এ কাজ হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশ্ব ইজতেমা আমাদের দেশের গর্ব। এর মাধ্যমে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। ফলে প্রশাসনও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক রয়েছে যেন কোনো ধরণের সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি না হয়। আলহামদুলিল্লাহ, প্রশাসন মাওলানা সা’দপন্থীদের জোড়ের ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে। আমাদের এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।

এদিকে এবারের বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সা’দ কান্ধলভী আসতে পারবেন কীনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তিনি যতোক্ষণ রুজু না করবেন এবং তাবলীগের আলমি শুরা সদস্যরা তাকে বরণ না করবেন ততোক্ষণ তিনি বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিতে পারবেন না এটাই তাবলীগের মুরুব্বিদের সিদ্ধান্ত। বাকি ফায়সালা আল্লাহর হাতে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আলেম-ওলামাদের একটি প্রতিনিধি দল যে ভারত সফর করার কথা ছিল বিষয়টির কতোটুকু অগ্রগতি হয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আসলে এ সিদ্ধান্তে আমাদের আলেমদের ও তাবলীগের মূল মুরুব্বিদের কোনো ভূমিকা ছিল না। তারা সেখানে উপস্থিতও ছিলেন না। শুধুমাত্র যাত্রাবাড়ির হযরত (মাওলানা মাহমুদুল হাসান) ব্যতীত। অতএব, বিষয়টি নিয়ে আলেমদের তেমন কোনো তৎপরতা নেই।

মাওলানা কেফাতুল্লাহ আযহারী আরও বলেন, তাবলীগ জামায়াতের মূল মারকায পাকিস্তানে স্থানান্তরের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে এটাও বিভ্রান্তিকর ও ভিত্তিহীন। সা’দপন্থীদের সঙ্গে আলেমদের দ্বন্দ্বের বিষয়ে এটার কোনো যোগসূত্র নেই। মাওলানা সা’দ সাহেব তাঁর ভুল স্বীকার করলে ও আলেমরাও তাকে বরণ করে নিলে আর কোনো সমস্যা নেই। তারা কী করবেন এটা তাদেরই সিদ্ধান্ত।