কঠিন রোগের চিকিৎসায় সর্বস্বান্ত হচ্ছেন ধর্মীয় পেশাজীবীরা

রাগিব রব্বানি

বাংলাদেশে যে কোনো নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য কঠিন রোগের চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। কেননা বাংলাদেশে কঠিনরোগের চিকিৎসা অনেক খরুচে ব্যাপার। একই সাথে সবচেয়ে বেশি জালিয়াতি ও দুই নম্বরির শিকার এই খাতটি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোরও বেহাল দশা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ইউজার ফি’র নামে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চলছে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়। আর এ অর্থ কিছু চিকিৎসক ও তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন নিজেদের মধ্যে। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের বিনামূল্যের চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

তাছাড়া এসব হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সিরিয়াল দিতে হয়। ফলে গুরুতর অসুস্থরা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারছেন না। কেউ কেউ বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালের পাল্লায় পড়ে হচ্ছেন সর্বস্বান্ত। চিকিৎসকরাও বিভিন্ন কোম্পানির ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন রোগীদের। বিনিময়ে দালালরা তাদের দিচ্ছে নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন।

এদিকে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসাসেবার নামে চলছে বড় ধরনের বাণিজ্য। এতে সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো চালাচ্ছেন এর মালিকরা। আর ১৯৮২ সালের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা আইনের কার্যকারিতা না থাকায় সরকারি হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরাও সুবিধা নিচ্ছেন বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে।

এমন পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্তদের জন্য কঠিন রোগ অনেকটা অভিশাপের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের মধ্যে মাদরাসা-মসজিদ সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় পেশাজীবীদের অবস্থা আরও করুণ।

কঠিন রোগ হলে অনেক জায়গায় মাদরাসা ও মসজিদ থেকে ছাটাই করে দেওয়া হয় তাঁদেরকে। কোনো ধরনের পেনশন, চিকিৎসা-ছুটি বা ভাতার ব্যবস্থা নেই এইসব পেশায়। কোনো সমবায়ী প্রকল্পও নেই, যার মাধ্যমে ব্যয় বহনের ব্যবস্থা করা হবে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের পরিবারকে পড়তে হয় বিপদে।

রাজধানীর অনেক মাদরাসায় দেখা গেছে এমন চিত্র। মাদরাসার প্রবীণ মুহাদ্দিস, জীবনভর হাদিসের খেদমত করে এসেছেন, হঠাৎ কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, চিকিৎসা-খরচের জন্য তখন তিনি ও তাঁর পরিবারকে হিমশিম খেতে হয়। কোনো কোনো জায়গায় কঠিন রোগে আক্রান্ত হবার ফলে শিক্ষক আগের মতো আর ক্লাস নিতে না পারলে তাঁকে মাদরাসা-কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের ভাতা ছাড়াই অব্যাহতি দিয়ে দেয়।

মৌলভীবাজারের জুড়ি উপজেলার এক মাদরাসা-শিক্ষক হার্ট সমস্যায় ভুগছিলেন। ডাক্তার জানাল হার্টে রিং লাগাতে হবে দ্রুত। স্বল্প মাইনের এই শিক্ষক উপায়ান্তর না-দেখে নিজের ভিটে-বাড়ি বিক্রি করে চিকিৎসা-খরচ জোগিয়েছেন। বর্তমানে শারীরিকভাবে মোটামুটি সুস্থ হলেও পরিবারের ভবিষ্যৎ চিন্তায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি। চিকিৎসার জন্য দীর্ঘদিন মাদরাসায় গরহাজির থাকায় চাকরিটাও চলে গিয়েছিল। পরে অবশ্যি আরেক মাদরাসায় চাকরি হয়েছে, কিন্তু চারটি সন্তানের ভরণ-পোষণ ও লেখাপড়ার খরচ জোগিয়ে স্বল্প মাইনের এই পেশা থেকে বাড়তি কোনো টাকা থাকে না আর। নিজের ভিটে-বাড়ি বিক্রি করে ফেলায় পরের বাড়ি ভাড়ায় থাকতে হচ্ছে তাঁর পরিবারকে। ফলে মাস শেষে বাড়ি-ভাড়া পরিশোধ করতেও তাঁকে হিমশিম খেতে হয়। এই পরিস্থিতিতে তাঁর হতাশার অন্ত নেই।

ধর্মীয় পরিমণ্ডলে এমন হাজারও পেশাজীবী আছেন এই পরিস্থিতির শিকার। মাদরাসা ও মসজিদে জীবনভর নিজেদের সবটুকু সময়, শ্রম ও মেধা ব্যয় করলেও বার্ধক্য বা অসুস্থতায় আক্রান্ত হলে পড়তে হয় তুমুল বিপাকে। চিকিৎসা-ব্যয় সামলানোর মতো নির্দিষ্ট কোনো খাত বা সঞ্চয় তাঁদের থাকে না।

বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, ধর্মীয় পরিমণ্ডলের সম্মানিত এসব পেশাজীবীদের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আলাদা একটা ফান্ড রাখা উচিত। সেটা তাঁদের মাসিক সম্মানী থেকে নির্দিষ্ট একটা হারে নিয়মিত কর্তন করে হলেও। যাতে যেকোনো আর্থিক সঙ্কটে তাঁরা বড় অঙ্কের একটা অ্যামাউন্ট পান নিজেদের সমস্যা মুকাবিলা করার জন্য।

আগের সংবাদঐক্যফ্রন্টের ঐক্য তেল-জলের মতো : আইনমন্ত্রী
পরবর্তি সংবাদজয়পুরহাটে প্রশ্নফাঁস চক্রের ৪ সদস্য আটক