প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রতিরোধে কতটা সচেতন মাদরাসাগুলো?

ওমর ফারুক

রাজধানী ঢাকাকে বলা হয় মসজিদের শহর। সেইসঙ্গে মাদরাসার শহর বলাটাও অতিরিক্ত কিছু হবে না। বিশেষ করে কওমি মাদরাসার প্রাণকেন্দ্র এ রাজধানী। রাজধানীর নানা জায়গায় উঁচু উঁচু ভবন ও বিশাল জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত বড় বড় কওমি মাদরাসা। লাখ লাখ শিক্ষার্থী এসব মাদরাসায় আবাসিক থেকে দ্বীনের জ্ঞান আহরণ করছেন। কোনো হোস্টেল বা অনাবাসিক পদ্ধতি নয়, যেখানে পড়ার টেবিল সেখানেই ঘুমের বিছানা। স্বল্প ব্যয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এ সকল মাদরাসায় পড়াশোনা করে দ্বীনের দাঈ, মুফতি, মুহাদ্দিস ও মুফাসিসর হয়ে বের হচ্ছেন।

রাজধানী ছাড়াও দেশের জেলা শহর ও গ্রামাঞ্চলেও বড় বড় মাদরাসা রয়েছে। গোটা দেশে কয়েক মিলিয়ন কওমি শিক্ষার্থী রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এসব মাদরাসা কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের থাকা ও খাওয়ার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা করলেও তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় মাদরাসাগুলো কতটুকু সচেতন, মাদরাসাগুলোতে ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের কেমন ব্যবস্থা রয়েছে, জানতে যোগাযোগ করা হয়েছিল রাজধানীর কয়েকটি মাদরাসার সংশ্লিষ্ট আলেম, শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে।

ফাতেহ২৪ এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় মাদরাসাগুলোর বাহ্যিক সচেতনায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। যদিও রাজধানীর কয়েকটি মাদরাসায় অতীতে অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছিল। চলতি বছরেও রাজধানীর মিরপুরের নবনির্মিত একটি মাদরাসা অগ্নিকাণ্ডে ভষ্মিভূত হয়ে যায়।  প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার কর্তৃক প্রচারিত সচেতনতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কেও তারা অনেকটা গুরুত্বহীন। এ নিয়ে তাদের বাড়তি কোন ভাবনা নেই। তবে বাহ্যিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকলেও পরোক্ষ ও আত্মিক প্রতিরোধ ব্যবস্থায় অন্য সকলের চেয়েও এগিয়ে মাদরাসাগুলো। এসব মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণ, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, নামাজে দাঁড়িয়ে যাওয়া ও মানুষকে গুনাহ পাপাচার থেকে ফিরে আসার আহ্বানের কাজটিই তারা সর্বাগ্রে করে থাকেন।

বিষয়টি অকপটে স্বীকারও করেছেন রাজধানীর তেজগাঁও রেলওয়ে জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার শাইখুল হাদীস ড. মুশতাক আহমদ। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় মাদরাসাগুলো জাগতিক কি ধরণের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে, সে বিষয়ে তেমন একটা জানা নেই। চোখেও পড়েনি। তবে ভূমিকম্প ও এ ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয় আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য সতর্কবার্তা।

‘আমরা কুরআন হাদীসে পাই, কোনো এলাকায় পাপাচার ও গুনাহ বেড়ে গেলে এসব হয়ে থাকে। তখন সর্বপ্রথম আমরা আল্লাহর স্মরণাপন্ন হই। যেসব এলাকা আল্লাহর রহমত বঞ্ছিত হয়ে যায় ওইসব এলাকায় আল্লাহ তায়ালা এ ধরণের সতর্কবার্তা পাঠিয়ে থাকেন। ফলে এসব মুহূর্তে বেশি বেশি তওবা করা চাই। আল্লাহর দিকে রুজু হতে হবে।’

‘তবে বাহ্যিক যে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল এগুলো থেকে পিছিয়ে থাকার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, স্বাভাবিকভাবেই আলেমদের ও মাদরাসাগুলোর জাগতিক বিষয়ের প্রতি নির্ভরশীলতা ও মনোযোগ কম থাকে। এসব কারণেই তারা এসব দিক থেকে পিছিয়ে থাকেন। দ্বিতীয়ত আর্থিক অস্বচ্ছলতা থাকার কারণেও অগ্নিনির্বাচক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ হয়ে উঠে না। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি ও সচেতনতা বাড়ালে হয়তো মাদরাসা কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিতে পারেন।’

অনেকটা একই ভাষায় কথা বলেছেন জামিয়া মাহমুদিয়া ইসহাকিয়া, মানিকনগর মাদরাসার প্রধান মুফতি ও সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি ইমরানুল বারি সিরাজী। তিনি বলেন, ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রতিরোধে আমাদের প্রথমত দোয়ার ব্যবস্থা হয়ে থাকে। এটাই প্রধান প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এমনকি মহিলা মাদরাসাগুলোতেও এ চর্চাটি হয়ে থাকে। আমার জানা মতে, একটি মহিলা মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ভূমিকম্পের সময় ছোটাছুটি না করে বরং বেপর্দায় মরার চেয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে থেকে মৃত্যু বরণকেই তারা প্রাধান্য দিয়েছেন। যদিও বাংলাদেশে এ ধরণের ভূমিকম্প এখনো ঘটেনি। এটা তাদের ঈমানি শক্তি।

মুফতি ইমরানুল বারি সিরাজী বলেন, তবে বাহ্যিক যে উপকরণ বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল তা হয়তো আর্থিক সঙ্কটের কারণে হয়ে উঠে না। অনেক সময় শিক্ষকদের বেতন ভাতা ও শিক্ষার্থীদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতেও তাদের হিমশিম খেতে হয়। তবে ব্যাপকভাবে না হলেও কিছু কিছু মাদরাসার অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। পত্র পত্রিকা পড়েও শিক্ষার্থীরা নিজেদের মাঝে সচেতনতা তৈরি করে থাকে। তবে এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো উদ্যোগ তেমন একটা নেওয়া হয় না।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় মাদরাসাগুলো আত্মিক বিষয়টিকে প্রাধান্য দিলেও সরকার কর্তৃক প্রচারিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও সচেতনাগুলোর প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন ড. মুশতাক আহমদ। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে মাদরাসাগুলোতে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভূমিকম্প মোকাবেলায় দুর্যোগ প্রতিরোধ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের সময় নিজ নিজ বাড়িতে নিরাপদ স্থান যেমন বিম ও পিলার, শক্ত টেবিল, খাট, দেয়ালের কোণ ইত্যাদি চিহ্নিত করে রাখতে হবে এবং সেগুলো পরিবারের সকলকে জানাতে হবে। ভারী জিনিসপত্র উঁচু জায়গা ও শেলফ থেকে নিরাপদ স্থানে বা নিচে নামিয়ে রাখা ভালো। আসবাবপত্র দেয়ালের সাথে ভালো করে আটকে রাখতে হবে। জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান যেমন হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ স্টেশন, অ্যাম্বুলেন্স, রেড ক্রিসেন্ট ইত্যাদির ফোন নাম্বারগুলোও লিখে রাখতে হবে। এছাড়া অগ্নিকান্ড প্রতিরোধে আগুন নেভানোর যন্ত্রের (ফায়ার এ্যাক্সটেংগুইশার)ব্যবহার জেনে নিতে হবে। বাড়িতে বা প্রতিষ্ঠানে সেসব যন্ত্র রাখতে হবে।

পরিবারের সদস্যদের সাথে বা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভূমিকম্প বিষয়ে, ভূমিকম্পে হলে কী করণীয়, সেসব বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা করতে হবে। এছাড়াও ভূমিকম্প চলাকালীন সময়ে ঘরে থাকলে ঘরের বিমের নিচে ও কলামের পাশে বা দেয়ালের কোণে, মজবুত টেবিল বা খাটের নিচে অবস্থান নিতে হবে। কম্পন না থামা পর্যন্ত মাথা হাত দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। বাড়ির বাইরে থাকলে উঁচু দালান, গাছ, বিলবোর্ড থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে। গাড়ি চলন্ত অবস্থায় থাকলে গাড়ি থামিয়ে দিতে হবে। কম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ি থেকে নামা যাবে না।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় মাদরাসাগুলো বা শিক্ষার্থীদের করণীয় কি জানতে চাইলে উত্তরার বাইতুল মুমিন মাদরাসার প্রিন্সিপার মুফতি নেয়ামতুল্লাহ আমিন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে শুধু নিজেদের সচেতনতা নয়, সমাজে সচেতনতা তৈরি করতেও মাদরাসার ছাত্র শিক্ষকরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেন।নিজেদের পাশাপাশি পাড়া মহল্লায় মানুষের মাঝে সচেতনতা জাগ্রত করার উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্যোগ কবলিত এলাকাগুলোতে মাদরাসাগুলো হতে পারে আশ্রয়স্থল। এছাড়াও ভূমিকম্প প্রতিরোধে মানুষকে গুনাহমুক্ত জীবন যাপন ও আল্লাহর বিধান পালনে সতর্ক করা। যেসব কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হয়ে থাকে এসব কারণগুলো থেকে বেঁচে থাকার আহ্বান জানানো। প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রতিরোধে ইসলামের সঠিক বার্তাটি মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারলেও আসমানি বিপদ আপদ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব হবে।’