বাম জোটের প্রাসঙ্গিকতা কী?

জুনায়েদ ইশতিয়াকঃ 

বুধবার ঢাকার পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনে (সিপিবি ভবনে) এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই জোটে রয়েছে সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ (মার্কসবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন।

এই সময়ে বাম জোট গঠনের তাৎপর্য কী, এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে। অনেকেই মনে করছেন, জাতীয়পার্টির মত একটি ভূমিকায় যেতেই তাদের এই জোট। পাশাপাশি জাতীয় বেশ কিছু কারণে তারা অস্তিত্ব সঙ্কটেও ভুগছেন।

কোন রাজনৈতিক প্রস্তাব নেই

বামরা নির্দিষ্ট আদর্শ বহন করেন। সে আদর্শ বাস্তবায়নে তাদের সামগ্রিক কর্মপন্থা আছে। এই কর্মপন্থার ভিত্তিতেই  মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী অস্থির সময়ে জাসদসহ অন্যান্য উগ্রপন্থী দলের উত্থান ঘটেছে। শ্রমিক-ছাত্র কর্তাশক্তির মাধ্যমে বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন দাবী করেছেন তারা। তার জন্য সহিংস পন্থা গ্রহণ করার প্রস্তাবনাও ছিল তাদের। যার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি মালিকানা বিলোপ করা হবে।কঠোর নিরাপত্তা ও পেশি শক্তির সাহায্যে সমাজতান্ত্রিক নীতি মানুষকে মানতে বাধ্য করা হবে। এসবের প্রক্রিয়াকেই তারা বিপ্লব নামে ডেকে থাকেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গঠিত বাম জোটে এমন কোন দার্শনিক, আদর্শিক ও রাজনৈতিক প্রণোদনা ও প্রতিশ্রুতি নেই, যার মাধ্যমে তারা দেশের জনগণকে আকর্ষণ করতে পারেন। বামদের সমর্থন কোন কালেই ছিলোনা। তবে ছাত্র ও শ্রমিকদের মধ্যে একটা নীরব আকর্ষণ ছিল। অব্যাহত ইসলাম বিরোধিতার ফলে ছাত্রদের মধ্যেও তাদের আবেদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। আগের মতো আর তাদের পাঠচক্র ও আয়োজনে ছাত্ররাও যাচ্ছেন না।

দেশ বিভাগের সত্তর বছরের মতো পার হলেও তারা এখনো আটকে আছেন ধর্ম প্রশ্নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দেশে ধর্ম প্রশ্ন মোকাবিলা না করতে পারলে বামদের সম্ভাবনার শর্তই তৈরি হবেনা। অবশ্য লাতিন আমেরিকায় খৃস্টান ধর্ম ও বামপন্থার মধ্যে একটা যৌথ বোঝাপড়া করা সম্ভব হলেও কোন মুসলিম দেশে এখনো সেটা সম্ভব হয়নি। বরং বিভিন্ন দেশে বামদের মুসলিম বিদ্বেষের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে অতিক্রম করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বাম-আবেদন সৃষ্টি করা বেশ কঠিন।

নাই কোন অর্থনৈতিক প্রস্তাব 

সাংগঠনিক বিপ্লবে ব্যর্থ হয়ে পৃথিবীর অনেক দেশে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের উত্থান ঘটেছে। এবং এই প্রস্তাবনার মধ্য দিয়ে অনেক দেশে বামরা ক্ষমতাতেও এসেছে। কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণার বিস্তারসহ পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে পুঁজির লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করেছেন তারা। এই প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে  অধিকতরভাবে শরীক হতে বাধ্য হয়। যদিও এমন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রকে কবুল করে নেওয়া হয়। মার্ক্সবাদী ভাব দর্শনকে প্রয়োগ করার চেষ্টা করা হয়না। ইউরোপের অনেক দেশে এমন আন্দোলন সফল হয়েছে। সর্বশেষ মেক্সিকোতেও বাম সরকার বিজয়ী হয়েছে। সমকালীন পুঁজিবাদের রুপান্তরে সমাজতান্ত্রিক বামদের ভূমিকা কম নয়।

বাংলাদেশে বামদের কি কোন ভবিষ্যৎ আছে?

অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশে বামদের কোন ভবিষ্যৎ নেই। একদিকে তাদের পক্ষে যেমন ইসলাম প্রশ্ন মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছেনা, পাশাপাশি তারা বাংলাদেশে একটা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বোঝাপড়ায় অভ্যস্ত হয়েছেন যাতে ইসলামপন্থী ও মুসলিমদের কোন স্থান নেই। ষাট, সত্তর ও আশির দশকী বিপ্লবী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বক্তব্য এখনো পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। সাবেকি বামপন্থীদের ধারাই এখনো পর্যন্ত মিডিয়া-শিক্ষা-বুদ্ধিজীবিতায় প্রভাব জারি রেখেছে। ফলে সহসাই বামদের এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নেই।

দুই হাজার ত্রিশের পরে বামদের ঐতিহাসিক বোঝাপড়ায় অভ্যস্ত নেতৃত্ব ও বক্তব্যের প্রভাব কমে আসতে পারে। তখন তারা একটা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যেতে পারেন । তবে ইসলাম প্রশ্নের মোকাবিলা করা তখনো সম্ভব হবে কিনা সেই সংশয় থেকেই যাবে।